এখনই শেষ নয় টিকি-টাকা?

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৪, ২১:১৪
বিশ্বকাপ থেকে স্পেনের লজ্জাজনক বিদায়ে টিকি-টাকারও শেষ দেখতে শুরু করেছেন অনেকে। টিকি-টাকার দুই ধারক বাহক বার্সেলোনা এবং স্পেন জাতীয় দলের সামপ্রতিক সাফল্যহীনতাই সমালোচকদের এমন দাবীকে জোড়ালো করে তুলেছে। তবে, স্পেনের পুরো বিশ্বকাপ মিশনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে তাদের ব্যর্থতার পেছনে আরো কয়েকটি কারণ পরিষ্কার হয়ে যায়। খেলার স্টাইলের পাশাপাশি দল নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত, মূল খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত বয়সের মতো কারণগুলোও চলে আসে সামনে। ফলে, শিরোপাধারীদের প্রথম রাউন্ড বিদায়ের পেছনে কেবল টিকি-টাকাকে দায়ী করা চলে না। বরং, তরুণ কিছু খেলোয়াড় এবং কৌশলে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে ছোট ছোট পাসে খেলার এই কার্যকর কৌশলটি আবারো স্পেনকে সাফল্য এনে দিতে পারে। বিশ্বকাপে স্পেনের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণগুলো খুঁজলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে সবকিছু। ২০০৮ সালের ইউরো, এরপর ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ সালে ইউরোর সর্বশেষ আসর; প্রতিটি টুর্নামেন্টেই শিরোপাজয়ী দলটির নাম স্পেন। বল নিজেদের আয়ত্তে রাখার পাশাপাশি ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলা। স্প্যানিয়ার্ডদের খেলার কৌশলটা ছিল এমনই। আর এই সহজ কৌশলেই আসে তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো। জাভি-ইনিয়েস্তা-ভিয়াদের পায়ে টিকি-টাকার সাফল্যে উত্সাহিত হয়ে এই কৌশলে খেলতে শুরু করে স্পেনের বেশ কয়েকটি ক্লাব। অথচ, একমাত্র বার্সেলোনা বাদে লা লিগার বাকি প্রায় সবগুলোই খেলতো পাল্টা আক্রমণ নির্ভর কৌশলে। যে কোন বড় ধরনের প্রতিযোগিতায় ছয় বছরের এই টানা সাফল্যে, বিশ্বকাপের চলতি আসরেও অন্যতম ফেভারিট হিসাবে ধরা হচ্ছিল স্পেনকে। এই অতিরিক্ত নির্ভরতাকেই স্পেনের প্রথম রাউন্ড বিদায়ের পেছনের অন্যতম কারণ হিসাবে এখন দায়ী করছে স্প্যানিশ গণমাধ্যম। এরপরে আসছে দল নির্বাচনের বিষয়টি। গত বিশ্বকাপে স্পেনের শিরোপা জয়ের নায়ক ডেভিড ভিয়াকে দলে রেখেও প্রথম দুই ম্যাচে নামাননি কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক। বিশ্বকাপ জয়ী এই কোচ ভিয়ার বদলে আস্থা রাখেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানো দিয়েগো কস্তার উপরে। বস্কের এই কস্তা নির্ভরতা এতটাই বেশী ছিল সদ্যই চেলসিতে নাম লেখানো এই স্ট্রাইকারের চোট সমস্যা নিয়েও মোটেই মাথা ঘামাননি তিনি। অথচ, চোটের কারণে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিমূলক ম্যাচগুলো খেলতে পারেননি কস্তা। একই কারণে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে মাত্র নয় মিনিটেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এই আনফিট স্ট্রাইকারকে খেলানোর মাশুলও হাতে নাতেই গুণতে হয় স্পেনকে। প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি থেকে একটি গোল পেলেও দ্বিতীয় ম্যাচে কোন গোলই করতে ব্যর্থ হয় তারা। তৃতীয় এবং অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে বলতে হচ্ছে খেলোয়াড়দের বয়সের কথা। সেই ২০০৬-০৭ মৌসুম থেকে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গাগুলোকে প্রায় নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা জাভি-ইনিয়েস্তা-ক্যাসিয়াসদের বয়সের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। বার্সেলোনা এবং স্পেন দলের মাঝমাঠের দুই প্রাণপুরুষ জাভি এবং ইনিয়েস্তার বয়স যথাক্রমে ৩৪ ও ৩০। আর গত বিশ্বকাপে সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার জেতা ক্যাসিয়াসের ৩৩। নি:সন্দেহে নিজেদের সেরা সময়টা আগেই পেছনে ফেলে এসেছেন স্পেনের সর্বশেষ তিনটি বড় সাফল্যের কারিগর এই তারকারা। এই কারণগুলো বিশ্লেষণেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে বিশ্বকাপ থেকে স্পেনের বিদায়ের পেছনে কেবল টিকি-টাকার ব্যর্থতা খোঁজাটা অর্থহীন। ‘রিপ টিকি-টাকা’ বা ‘টিকি-টাকার মৃত্যু’ জাতীয় লেখায় তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ছেয়ে গেলেও তাই একটি বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স দিয়েই তাই শেষ বলা যাচ্ছে না টিকি-টাকার। টিকি-টাকার এই ‘অকাল মৃত্যু’ ঠেকাতে বড় ভূমিকা হয়তো পালন করতে পারে বার্সেলোনাই। কারণ, এই বার্সেলোনাতেই তো সৃষ্টি টোটাল ফুটবলের এই পরিবর্তিত ধারার। ১৯৮৮ সালে জোহান ক্রুইফ বার্সেলোনার দায়িত্ব নেয়ার পরই একটু্ একটু করে কাতালানদের এই পদ্ধতির সাথে অভ্যস্ত করে তুলতে থাকেন। খেলোয়াড়ি জীবনে রাইনাস মিলেশসের টোটাল ফুটবল কৌশলের সফল বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা এই কিংবদন্তির ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিষ্কের ছোঁয়ায় সাধারণ এক ক্লাব থেকে রীতিমতো ইউরোপীয়ান পরাশক্তিতে পরিণত হয় বার্সেলোনা। বার্সেলোনায় টিকি-টাকার শ্রেষ্ঠতম রূপটি অবশ্য দেখা হয়নি ক্রুইফের। ক্রুইফের দলের দুই খেলোয়াড় ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড আর পেপ গার্দিওলার হাত ধরেই আসে সেই সাফল্য। তরুণ খেলোয়াড় সৃষ্টিতে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বার্সেলোনার ইয়ুথ অ্যাকাডেমী লা মেসিয়াও অবদানও কম নয় টিকি-টাকার সাফল্য নির্মাণে। লিওনেল মেসি, সেস ফ্যাব্রিগাস, সার্জিও বুসকেটসদের মতো একের পর এক তারকা খেলোয়াড় নির্মাণ করার পাশাপাশি লা মেসিয়া একই সঙ্গে তাদের ছোট ছোট পাসে খেলার সেই কৌশলের সঙ্গেও অভ্যস্ত করে তুলেছে। সুতরাং, তরুণ কিছু খেলোয়াড় এবং নতুন কোন নির্দেশকের সুযোগ্য নেতৃত্ব পেলে এই কৌশলের নতুন কোন রূপ হয়তো দেখা যেতে পারে শীঘ্রই। সেটা হয়তো বার্সেলোনা কিংবা স্পেন জাতীয় দলের সাফল্যেও রাখবে বড় ভূমিকা।