ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে খেলেছিল দুটি এশিয়ান দল — দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দুটি দলই বাদ পড়ে যায় প্রথম রাউন্ড থেকে। এরপর একটু একটু করে সমৃদ্ধ হতে থাকে এই অঞ্চলের ফুটবল সংস্কৃতি। সেই এগিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত মঞ্চায়ন হয় ২০০২ সালে। নিজেদের দেশে আয়োজিত বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া সেমিফাইনালে উঠে যায়।
কিন্তু, সকল অর্জন ব্যর্থ হয়ে গেল এই বিশ্বকাপে এসে। এশিয়ার চারটি দলই বিদায় নিল প্রথম রাউন্ড থেকে। ২৪ বছরের মধ্যে এশিয়ার দলগুলোর এমন ব্যর্থতা দেখেনি বিশ্বকাপ। শুধু বাদপড়াই নয়, একটি ম্যাচও জিততে পারেনি এশিয়ার কোন দল।
ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ হল গত বৃহস্পতিবার। দশ জনের বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে বিদায় ঘটলো দক্ষিণ কোরিয়ার। এর আগেই বাদ পড়ে গেছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইরান। ২০১০ বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় পর্বে উঠেছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। তাহলে কেন এমন ছন্দপতন? এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) ব্যর্থতাকে একটি ‘আকস্মিক সমাপ্তি’ হিসেবে দেখছে। সংস্থাটির সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহীম আল খালিফা প্রচণ্ড হতাশা সত্ত্বেও টুর্নামেন্টটিকে একটি শিক্ষা হিসেবে দেখছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বকাপটি এশিয়ান দলগুলোর জন্য বড় একটা শিক্ষা হয়ে এসেছে। গড়পরতায় এশিয়ান দলগুলো তুলনামূলক ভাবে তারুণ্য নির্ভর। তাই এখনও দলগুলোর ভাল করার সুযোগ আছে। এর জন্য আমাদের সবাইকে এক হয়ে চলতে হবে। একটা টুর্নামেন্ট দিয়ে আসল শক্তির ব্যাপারে ধারণা করে নেয়ার ব্যাপারে আমি বিশ্বাসী নই। আমাদের নিজেদের যোগ্যতার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এক ধরনের খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। দ্রুতই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য এএফসি কাজ করে যাচ্ছে।’
চারটি দল মিলে এবারের বিশ্বকাপে খেলেছে মোট ১২ টি ম্যাচ। এর মধ্যে নয়টি গোল করার বিপরীতে হজম করেছে ২৫টি! আশা ছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে। কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে। জাপানের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা জাপান টাইমস লিখেছে, ‘জাপানের খেলাটা ছিল বেশ খানিকটা খাপছাড়া।’
রাগে ফুঁসছে দক্ষিণ কোরিয়ান গণমাধ্যমগুলোও। দেশটির সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ নিউজ এজেন্সি লিখেছে, ‘বেলজিয়ামের সাথে ১-০ গোলে হারের ম্যাচের সব সময়ই বেশ আক্রমণাত্মক খেলেছে দক্ষিণ কোরিয়া, শুধু যেন গোল করতেই ভুলে গিয়েছিল।’
সেদিক থেকে বরং কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও ইরান। কঠিন গ্রুপে সকারুজরা নেদারল্যান্ড, চিলি ও স্পেনের বিপক্ষে লড়াকু মনোভাব দেখিয়েছে। অন্যদিকে ইরান নাইজেরিয়ার সাথে গোলশূন্য ড্র করেছে। আর শেষ মুহূর্তে লিওনেল মেসি অতিমানবীয় এক গোল না করলে হয়তো আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের ফলাফলটাও একই রকম হতে পারতো। ইরানের পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়েছে ইরানের গণমাধ্যমগুলোতেও। ডেইলি ইরান লিখেছে, ‘দলের বীরত্ব উদযাপন করতে রাজপথে নেমে এসেছে ইরানের সাধারণ মানুষ। রাত ভর চলে উত্সব। তেহরানের রাস্তায় তাই যানবাহনের জ্যাম লেগে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়।’
সামান্য কিছু ইতিবাচকতা বাদ দিলে এই বিশ্বকাপটা এশিয়ান দলগুলো ভুলে যেতেই চাইবে। দুঃখ ভুলে এবার তারা সামনের দিকে চোখ রাখছে। এএফসি সভাপতিও তেমনই ঘোষণা দিলেন, ‘আমাদের এই অবস্থায় খেলার মান বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এক মুহূর্ত নষ্ট করার কোন সময় নেই। বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়ার এটাই সময়।’
