দ্বিতীয় রাউন্ডে গত রবিবার ঘটলো অভাবনীয় এক ঘটনা। নেদারল্যান্ডস-মেক্সিকো ম্যাচে নতুন এক ঘটনা দেখল বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবল ম্যাচে দেয়া হলো পানি পানের বিরতি, যার পোশাকি নাম ‘কুলিং ব্রেক’।
ম্যাচের ৩২তম মিনিটে রেফারি তিন মিনিটের পানি পানের বিরতি দেন। দুই দলের ঘর্মাক্ত খেলোয়াড়রা পানীয় খাওয়ার পাশাপাশি ভেজা ঠাণ্ডা তোয়ালে দিয়ে তাদের ঘাড় আর মাথা পেঁচিয়ে নিজেদের আরাম দেয়ার চেষ্টা করেন।
এই সময় দুই দেশের কোচও খেলোয়াড়দের নতুন করে নির্দেশনা দেয়ার সুযোগ পেয়ে যান।
বিরতির পর খেলার ৩০ মিনিট পার হওয়ার পর দেয়া হয় দ্বিতীয়ার্ধ্বের কুলিং ব্রেক। নেদারল্যান্ডস-মেক্সিকোর ম্যাচ শুরুর সময় ভেন্যু ফরতালেজায় তাপমাত্রা ছিল ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতা ছিল ৬৮ শতাংশ। পরে তাপমাত্র ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছলে খেলোয়াড়দের ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য বিরতি দেন রেফারি।
তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে ম্যাচের ৩০তম ও ৭৫তম মিনিটের কাছাকাছি সময়ে এই তিন মিনিটের বিরতি দিতে পারবেন রেফারি। ম্যাচের ঘড়ির কাটা কিন্তু চলতেই থাকবে। পরে এই তিন মিনিট যোগ হবে ইনজুরি সময়ের সঙ্গে।
হারতেই বসেছিল নেদারল্যান্ডস কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভেসলি স্নেইডারের দুর্দান্ত হাফ ভলি আর ইয়ান-ক্লাস হান্টেলারের সফল পেনাল্টিতে শেষ আটে উঠেছে ডাচরা। তবে উত্তেজনায় ঠাসা ম্যাচটি জেতার পর দুই গোলদাতার কাউকে নয়, ডাচ কোচ লুইস ফন গাল যেন ধন্যবাদ দিতে চাইলেন ফুটবল ম্যাচে প্রথমবারের মতো দেয়া পানি পানের বিরতিকে।
শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় মেক্সিকো। গত রোববার ফরতালেজার অসহ্য গরমের কারণে এই ম্যাচের দুই অর্ধে একবার করে পানি পানের বিরতি দেয় কর্তৃপক্ষ।
আর ওই পানি পানের বিরতিতেই নাকি খেলার কৌশল পাল্টে সফল হয়েছে ডাচরা। কোচ লুই ফন গাল এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রথমে আমি ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলা পাল্টাই, তারপর আমরা অনেকগুলো সুযোগ তৈরি করি, একটা শট গোল পোস্টে লাগে এবং আরেকটা দারুণ সেভ করে মেক্সিকোর গোলরক্ষক। তারপর আমি দ্বিতীয় পরিকল্পনায় যাই। সিদ্ধান্তটা আমি কুলিং ব্রেকের সময় নেই।’
কৌশল বদলটাই তার দলকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করেন ডাচ এই কোচ। দ্বিতীয়ার্ধ্বের শুরুতে জিওভানি দস সান্তোসের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর জয়টা প্রায় হাতের মুঠোয় পুড়ে ফেলেছিল মেক্সিকো। কিন্তু শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় সব ভেস্তে যায়।
৮৮তম মিনিটে স্নেইডারের বুলেট শটে সমতায় ফেরে নেদারল্যান্ডস। আর যোগ করা সময়ে রাফায়েল মার্কেস ডি বক্সে রবেনকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় নেদারল্যান্ডস। ফন পের্সির বদলি নামা ক্লাস-ইয়ান হুন্টেলারের সফল পেনাল্টিতে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় মেক্সিকোর। আর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের পথে আরেক ধাপ এগোয় গতবারের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ম্যাচ চলার সময় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে দেয়া হবে এ বিরতি। প্রথমার্ধ্বের ৩২ মিনিটের মাথায় তিন মিনিটের বিরতি দেন পর্তুগিজ রেফারি। এরপর দ্বিতীয়ার্ধ্বে ৭৬ মিনিট পরে দেয়া হয় আরেকটি কুলিং ব্রেক।
এদিকে, শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি দেয়া নিয়েও যথেষ্ট জল ঘোলা হচ্ছে। ৮৭ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচে ১-০ গোলে এড়িয়ে ছিল নেদারল্যান্ডস। এরপর সাত মিনিটের ঝড়। মুহূর্তেই এলোমেলো মেক্সিকোর বিশ্বকাপ স্বপ্ন। ম্যাচের স্কোরলাইন পাল্টে গেল এক নিমিষে! দ্বিতীয় রাউন্ডেই থেমে যেতে হল মেক্সিকানদের। মেক্সিকান সমর্থকেরা এখন তাঁদের স্বপ্ন-খুনের দায়ভার চাপাচ্ছেন ডাচ ফরোয়ার্ড আরিয়েন রোবেনের ওপরই।
৯৩ মিনিটে পেনাল্টি বক্সে রাফায়েল মার্কাজের ট্যাকলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে গেলেন রোবেন। সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি। পেনাল্টি থেকে গোল আদায় করলেন ক্লাস-ইয়ান হান্টেলার। তাতেই নিশ্চিত হলো হল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল। কিন্তু এর পরেও কথা থেকে যায়। মেক্সিকোর বিপক্ষে রোবেনের আদায় করা পেনাল্টিটি কী সঠিক ছিল? রোবেন কি সত্যিই মার্কাজের ফাউলের শিকার হয়েছিলেন? নাকি ঝাঁপ দিয়ে প্রদর্শন ঘটিয়েছিলেন তাঁর নিপুণ ‘অভিনয়শৈলী!’ পুরো বিষয়টিই বিতর্কের ঝড় তুলেছে গোটা ফুটবল দুনিয়ায়।
মেক্সিকোর কোচ মিগুয়েল হেরেরা ঝাল ঝাড়লেন পর্তুগিজ রেফারি পেদ্রো প্রোয়েনকার ওপর, ‘আমাদের হারার জন্য দায়ী রেফারিই। তিনিই আমাদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দিয়েছেন। ফাউল না হলেও ফাউল ধরলে তো বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতেই হবে। আপাতত কিছুই করার নেই। আমরা আশা করব, রেফারি কমিটি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে এবং ওই ভদ্রলোক (রেফারি) আমাদের মতোই বাড়ি ফিরে যাবেন।’
যাঁকে নিয়ে এত বিতর্ক, সেই রোবেন কী বলেন? রোবেন অবশ্য ক্ষমা চাইলেন ঝাঁপ দেয়ার জন্য। তবে ৯৩ মিনিটের ফাউলের জন্য নয়। ম্যাচে আরও দুবার ডাইভ দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ডাচ ফরোয়ার্ড। ক্ষমা চাইলেন সেগুলোর একটির জন্য। রোবেন বললেন, ‘সত্যি বলতে কি, প্রথমার্ধ্বে আমি দু’বার ভুয়া ডাইভ দিয়েছি। আমি এ জন্য ক্ষমা চাইছি। ওটা করা উচিত হয়নি। তবে এটা ঠিক যে পেনাল্টিটা ঠিকই ছিল।’
