অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৪, ২১:২৮
“অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় উচ্চশিক্ষা” এই শ্লোগানকে ধারণ করে মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, কেক কাটা, গবেষণা ও আবিষ্কার বিষয়ক প্রদর্শনী, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার ৯৩ বছর পূর্তি উত্সব উদযাপন করল বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। দিবসটি পালন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও হল আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের করিডোর বেলুন, ফেস্টুন আর আল্পনার ছোঁয়ায় বর্ণিল রূপ ধারণ করে। নবীন-প্রবীণ শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। গতকাল সকাল সোয়া ১০টায় প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন মলে জাতীয় পতাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহের পতাকা উত্তোলন এবং উদ্বোধনী সংগীতের মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এর আগে সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন হল থেকে শোভাযাত্রাসহ প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন মলে জমায়েত হন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য, কর্মকর্তা, কর্মচারী, অভ্যাগত অতিথি, ছাত্র-ছাত্রী, বিএনসিসি, রোভারস্ ও রেঞ্জারস ইউনিটের সদস্যরা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে আলোচনা সভায় জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে গেলে এই দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের সামাজিক উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে পারে না। এক্ষেত্রে ধনী-গরীব, উঁচ-ুনিচু ও নারী-পুরুষের বৈষম্য নিরসন করতে হবে। উন্নয়নের মূলধারায় সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সাফল্য অর্জন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আমাদের পুষ্টি সমস্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় কাজ করতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং এ অঞ্চলের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ৪র্থ শ্রেণি কর্মচারীদের পক্ষে আন্দোলন করায় তত্কালীন প্রশাসন তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছিল। এরপর ক্যাম্পাসে তাঁর আর ফেরা হয়নি। স্বাধীনতা অর্জনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে যোগ দিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ক্যাম্পাসে আগমনের কথা ছিল। সে সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকদের নিষ্ঠুর বুলেটে ঐ রাতেই তিনি স্বপরিবারে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন। আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ও জাতীয় পে-কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। শিক্ষাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের বাহন হিসাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ১৯৭২ সালের তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বেড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী-পুরুষ বৈষম্য নিরসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। ফরাসউদ্দিন বলেন, মানুষের আত্মার সুপ্ত কল্যাণময় বাসনা ও মানবিক গুণাবলীকে শিক্ষার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই ইহজাগতিক হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ও রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে পারে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও টেকসই মানবসম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও সময়োপযোগী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক সহিদ আকতার হুসাইন ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো: কামাল উদ্দীন, এমিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ, অফিসার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আলী আকবর, তৃতীয় শ্রেণি কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো: রেজাউল ইসলাম, কারিগরি কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো: জামালউদ্দিন, ৪র্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির সভাপতি শাহজাহান মিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান আলোচনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে ছিল- টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, সৈয়দ রেজাউর রহমান নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি আয়োজিত প্রীতি বিতর্ক, বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগে বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠান, বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ আয়োজিত গবেষণা ও আবিষ্কার বিষয়ক প্রদর্শনী, চারুকলা অনুষদ আয়োজিত শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ বিভাগ আয়োজিত ‘ভূমিকম্প সচেতনতামূলক মহড়া’, চারুকলা অনুষদের গ্যালারিতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল শিল্পকর্ম প্রদর্শনী এবং নাটমণ্ডল মিলনায়তনে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার রচিত নাটক ‘হ্যামলেট’ প্রদর্শনী।