ইন্টারনেট থেকে ইন্ডিয়ান কিংবা পাকিস্তানি পোশাকের ডিজাইন ডাউনলোড করে এনে দেখিয়ে বলেন ‘ঠিক এভাবেই বানিয়ে দিতে হবে’। ডিজিটাল যুগের তরুণীদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের কারিগরদেরও রীতিমত প্রশিক্ষণ দিয়ে তবেই তাদের দোকানে বসাতে হচ্ছে। তাছাড়া ঈদের পোশাক বলে কথা, কোনভাবেই এদিক-সেদিক হওয়া যাবে না। কথাগুলো বলছিলেন লালমাটিয়া মোহনা টেইলারের কর্ণধার ওমর ফারুক।
রমজানের শুরুতে ক্রেতারা ছুটছেন খানকাপড় আর দর্জির দোকানে। মাকের্টগুলোতে কেবল নারী ক্রেতাদের ভিড়ই এখন লক্ষণীয়। নারীরা তাদের পছন্দের ডিজাইনের পোশাকটি তৈরি করতে ছুটছেন, গজ কাপড়, লেইসের দোকান আর দর্জি বাড়িতে। দর্জির মজুরি অনেক বেশি বলে অনেকে আবার তৈরি পোশাক কিনতেই আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু তারপরেও ভিড় এখন থান কাপড় আর দর্জি বাড়িতেই।
ঈদের পোশাক তৈরি করতে আসা তাহিরা সুচি ও সুরাইয়া মিথুন বলেন, রেডিমেড পোশাক কিনলে অনেক সময়ই মাপে ঠিক থাকে না। কখনো আবার মাপ মত ফিটিং করতে গিয়ে জামার ডিজাইনটাই কেটে ফেলতে হয়। আবার দর্জিরা রেডিমেট জামা কেটে ছেঁটে ঠিক করে দিতেও চায় না। যার কারণে নিজের মনের মতো কাপড় কিনে পোশাক তৈরি করে নেয়াই ভালো। সুচি মিথুনের মতো অনেক তরুণীই ঈদের পোশাক বানিয়ে পরতে পছন্দ করেন। এ ক্ষেত্রে একদিকে যেমন ফিটিংসটা ভালো হয়, অন্যদিকে ইচ্ছামতো লেইস-এমব্রয়ডারি করে ভিন্ন ডিজাইন করে নেয়ারও সুযোগ থাকে। তবে এই দুই তরুণী পোশাকের মজুরি অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেন।
ঈদের প্রথম বাজার শুরু হয় থান কাপড়ের দোকানে। এর সাথে ব্যস্ততা বাড়ে পোশাক কারিগরদের। লালমাটিয়া, ধানমন্ডি, নিউমাকের্টের দর্জির দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায় তাদের ব্যস্ততা। মীম টেইলারের স্বত্বাধিকারী মনোয়ার হোসেন বলেন, আগে দর্জির দোকান যেমন-তেমন হলেই চলতো; কিন্তু এখন দর্জির দোকানও হতে হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও চাকচিক্যপূর্ণ, নয়তো কাস্টমার আসেন না। প্রশিক্ষিত কারিগরকে মজুরি দিতে হয় বেশি। এসব কারণে পোশাকের মজুরিটা এখন অনেক বেশি নিতে হচ্ছে।
চাঁদনী চক, নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া ঘুরে জানা যায়, এখানে থ্রি-পিস তৈরির মজুরি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। লং ফ্রক স্টাইলের পোশাক তৈরিতে খরচ পড়বে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে ডিজাইনের ওপর ও মজুরি অনেকটা বাড়া কমা নির্ভর করে। ব্লাউজ বানাতে লাগবে ডিজাইনভেদে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকা।
পান্থপথের বসুন্ধরা, ধানমন্ডির রাপা প্লাজা, সানরাইজ প্লাজা, মেট্রো শপিং মল, প্রবর্তনা, জেনিটিক প্লাজা, আড়ং এসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে এন্ডি কটন, এন্ডি সিল্ক, ভেজিটেবল ডাইং, বাপড়া খাদি, ফাইন খাদি, জুট কটন, বিভিন্ন ধরনের সিল্ক, কটনের নানান জাতের গজ কাপড় পাওয়া যাচ্ছে। কাতান সিল্ক পাওয়া যাচ্ছে ১৫শ’ টাকা গজে। এছাড়া অন্য কাপড়ে থ্রি-পিস বানাতে মানসম্মত কাপড়ের মধ্যে সর্বনিম্ন ১৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকায় বানানো যাবে থ্রি-পিস। তবে এসব কাপড় নারী ও পুরুষ সবার জন্য উপযোগী বলে জানান দোকানিরা।
বিক্রেতারা জানান, ছেলেরা এসব কাপড় দিয়ে অনায়াসে ফতুয়া, পাঞ্জাবী শার্ট বানাতে পারেন। মেয়েরা কামিজ-সালোয়ার বানাতে পারেন; জরি চুমকি ছাড়া হলেও এসব কাপড়ে অভিজাত্যের কোন কমতি হবে না। মোহাম্মদপুর মিরপুর রোডে মোল্লা সিল্কের শো-রুমে বলাকা সিল্ক, ধুপিয়ান সিল্ক, এন্ডি সিল্ক, কটন মিক্সড, স্ট্রাইপ, মসলিন, চেকসহ রাজশাহী সিল্কের বিভিন্ন কালেকশন পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।
কাশফিয়া উপমা বলেন, এবার দর্জিরা সবাই বেশি মজুরি দাবি করছেন। অর্থাত্ সিল্ক, জর্জেট, কাতান এসব কাপড়ের মজুরি অনেক বেশি। এক সেট জামা বানাতে মজুরি লাগছে ৬০০ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত। বিভিন্ন মার্কেট ও স্থান ভেদে এসব দর্জির মজুরি নির্ধারণ হয়েছে। ধানমন্ডি, কলাবাগান, পান্থপথ এসব জায়গায় অবস্থিত দর্জির দোকানে প্রায় সবগুলোতেই অর্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। যদিওবা কোন কোন দর্জি অর্ডার নিচ্ছেন; তারা অত্যন্ত চড়া মজুরিতে অর্ডার নিচ্ছেন বলে জানান দর্জির মাষ্টাররা।
তবে রাজধানীর বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতা সমাগম অনেক বেড়েছে। চাঁদনী চক, নিউ মার্কেট, গাউসিয়া, ধানমন্ডি হকার্স, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক, পিঙ্কসিটি সবগুলো মার্কেটে ঈদের কেনাকাটা করা মানুষের আনাগোনা। তবে তরুণীরা দলবেঁধে ইফতারের আগে ও পরে মার্কেট ঘুরে-ফিরে দেখছেন।
দোকনি ও বুটিক হাউস মালিকরা বলছেন, এবার শাড়ি-পোশাক তৈরিতে সুতা, রং ও আনুসঙ্গিক উপাদানের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে কাপড় দোকানে উঠাতে পারেনি। যার কারণে ১৫ রমজানের পরেই হয়তো নতুন ডিজাইনের কাপড় আর মার্কেটে পাওয়া যাবে না। বিক্রেতারা বলছেন, ১০ রমজান থেকে ২০ রমজানের মধ্যেই বেশি বেচাকেনাটা হবে বলে আশাবাদী তারা।
মেয়েদের পাশাপাশি হাল ফ্যাসানের তরুণরাও এখন তৈরি করে পোশাক পরছেন। ঈদের পাঞ্জাবীর পাশাপাশি অনেকেই শার্ট-প্যান্ট বানাতে ছুটছেন টেইলার্সগুলোতে। টপ-টেইন দোকানের সাইফুল আলম বলেন, যেহেতু সময়টা গরম, তাই সবাই শার্টের জন্য সুতি কাপড়টাই বেশি পছন্দ করছে। সুতির মধ্যে অরবিন্দ, রেমন্ড, টিসুটি কটন ইত্যাদি শার্ট পিস বেশি চলছে। রং-এর ক্ষেত্রে চলছে গাঢ় নীল, আকাশি, মেরুন, ক্রিম, অলিভ, অফ হোয়াইট, পিংক, টিয়া বিভিন্ন স্টাইপ সবুজ সর্বোপরি উজ্জ্বল রঙগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। বর্ষা ঋতু শেষে, শরতে এবার ঈদ পড়ায় পোশাকে রঙের এই বৈচিত্র্য এসেছে।
