অবিকল তেমনটাই আছেন তিনি। ন্যাড়া মাথা। গায়ে ছাই রংয়ের পোলো টি-শার্ট। তার উপর জড়িয়ে রাখা নেভি ব্লু সোয়েটার। পরনে জিন্স প্যান্ট। পায়ে মোজাবিহীন কেডস। চোখে লাল ফ্রেমের সাদা রংয়ের রিমলেস গ্লাস। এই বেশে সাও পাওলোর অ্যারিনা কোরিয়ান্থন্সের মাঠে ঢোকার আগে ক্যাফেটেরিয়ায় কফি হাতে আড্ডায় মেতে ছিলেন রবার্তো কার্লোস। ব্রাজিল ফুটবলের রত্নই বলা হয় যাকে। সবচেয়ে আক্রমণাত্মক লেফটব্যাক। ফ্রিকিক মাস্টার। বুলেটের মতো বল মারতেন। ১৬৯ কিলোমিটার স্পিডে ফ্রিকিক করার ক্ষমতা ছিল তার। প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ংকর ছিলো এসব শট। এমন অনেক সময় গেছে যখন গোলকিপারও আড়ালে থাকতেন। সেই রবার্তো কার্লোস এখন ফুটবল মাস্টার। তুরস্কে একটি ফুটবল ক্লাবে খেলা শেখান বলে জানালেন তার বন্ধুরা। আর বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় তিনি এখন ব্রাজিলের গ্লোব টিভির দর্শকদের জন্য বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছেন।
ক্যাফেটেরিয়াতে কথা বলতে গেলে হেসে দিলেন ফ্রিকিক মাস্টার। যেখানে কথা বলাটাই কঠিন। সেখানে ঘটলো উল্টো। সাংবাদিকদের কফি অফার করলেন। ধন্যবাদ জানিয়ে কথা বলতে চাইলে রবার্তো কার্লোস বললেন, ‘আই ক্যান নট স্পিক গুড ইংলিশ।’ ব্রাজিলের পথে চলতে গিয়ে পর্তুগীজ ভাষা না জানার কারণে যেখানে প্রতি পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছে। সেই দেশের একজন মানুষ যখন ইংরেজিতেই বলছেন, ‘আমি ইংরেজিতে কথা বলতে পারি না।’ তখন ধরে নিতেই হবে উনি তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো বলতে পারেন। সুযোগ পেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে কার্লোসকে প্রশ্ন করে ফেললেন ঢাকার সাংবাদিকরা। বাংলাদেশের পরিচয় দেবার পর ৬ নম্বর জার্সির এই সাবেক তারকা বললেন, আমি বাংলাদেশের নাম শুনেছি যখন আর্জেন্টিনা তোমাদের দেশে খেলতে গিয়েছিল।’ প্রশ্ন উঠল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কেমন করবে? এই উইংব্যাক বললেন, আর্জেন্টিনার কোনো চান্স নেই। (আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ড ম্যাচ তখন শুরুই হয়নি, তবে আর্জেন্টিনাই জিতেছে) খুব শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে।’ তাহলে ফেভারটি কে? চটজলদি উত্তর রবার্তো কার্লোসের, ‘ব্রাজিল। এখানে ব্রাজিল ফেভারিট। ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হবে।’ ১৯৯২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ব্রাজিলের জার্সি গায়ে খেলেছেন কার্লোস। ২০০২ সালে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ এনে দেন এই গুণি ফুটবলার। প্রশ্ন করেছিলাম ইংল্যান্ড, ইটালি, স্পেন এভাবে বিদায় নিল কেন? রবার্তো কার্লোস বললেন, এটাই ফুটবল। এটা বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এখানে যেনতেনভাবে এলে নাকানি-চুবানি খেয়ে বাড়ি যেতে হবে। আপনি বলুন না চ্যাম্পিয়ন স্পেন ব্রাজিলে আসার আগে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে তারা কতটা কাজ করেছে। বুঝতে হবে এটার নামই ফুটবল। এটা অন্য কোনো খেলা নয়।’ কার্লোস কথা বলছিলেন মিডিয়া সেন্টারের ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলে। তাকে পেয়ে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরাও ছবি তুলেছেন। কথা বলছিলেন আর কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলেন কার্লোস। কার্লোস যে বড় মাপের ফুটবলার তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ কথা বলতে চাইলে উত্সাহ দেখিয়েছেন। রবার্তো কার্লোস খুব ভালো ইংরেজি জানেন না। তবে পর্তুগীজ ভাষার অনেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের চেয়েও ভালো বলতে পারেন। কথাটা গুছিয়ে বুঝানোর ক্ষমতা আছে। তারপরও বারবার বলছেন, ‘আমি ভাই ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি বলতে পারি।’
নেইমার ছাড়া ব্রাজিল অচল। যদি নেইমার না থাকে ব্রাজিলের খেলাই থাকবে না। আপনি কী মনে করেন? ‘কথাটা ঠিক না। নেইমার ছাড়াও ব্রাজিল ফুটবল খেলতে পারে। নেইমার ভালো খেলোয়াড়। ব্রাজিলের যেমন নেইমারকে দরকার আছে। তেমনি নেইমারেরও ব্রাজিলের প্রয়োজন আছে-বললেন রাবার্তো কার্লোস। বিদায় নিয়ে অন্যান্য টিভি সাংবাদিকদের সাথে সামনের পথে এগুতে থাকলেন কার্লোস। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলাম, আপনার সময়ে ব্রাজিলের সেরা ডিফেন্স ছিল যে কারণে আপনারা চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন। আর এখন ম্যাচ জিতলেও বার বার ডিফেন্স নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন কার্লোস, বলেন, ‘না না এখনকার ডিফেন্স অনেক ভালো। আপনি কাউকে ফেলে দিতে পারবেন না।’ হাতের আঙ্গুল দেখিয়ে কার্লোস বললেন, ‘আলভেস এক নম্বর, থিয়েগো সিলভা এক নম্বর। ডেভিড লু্ইস এক নম্বর। আছে মার্সেলো। তারা সবাই ভালোমানের ফুটবলার। আপনি কি ব্রাজিলের সমর্থক? তাহলে ব্রাজিলের ডিফেন্স নিয়ে এতো চিন্তা করছেন কেন? আপনার বাংলাদেশের সমর্থকদের বলে দিন ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হবে।’
