শেষ তিন সপ্তাহ কি অভাবনীয় ফুটবল বিস্ময় নিয়েই না হাজির হল! আক্রমণ, উত্তেজনা, রোমাঞ্চের রসদ কি ছিল না তাতে। এতোটা উত্কণ্ঠা, এতোটা স্নায়ুচাপ কি কল্পনাতেও ছিল? অনেক রাজা-মহারাজাদের বিদায় ঘটেছে। স্রেফ অংশগ্রহণ করতে এসে অনেক দল চমকে দিয়েছে, বড় দলগুলোর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর নামই তো বিশ্বকাপ ফুটবল!
সেই লড়াইটা এখন আট দলে এসে ঠেকেছে। আজ থেকে শুরু আট দলের কোয়ার্টার ফাইনাল। এতো অর্জনের মাঝে হতাশ করেছে কেবল এশিয়ান দেশগুলো। চারটি দলের কেউই কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডিও পার করতে পারেনি। আফ্রিকান দু’টি দল দ্বিতীয় পর্বে উঠলেও তাদের বীরত্ব ওখানেই শেষ।
এর বাদে বিশ্বকাপ এসে দাঁড়িয়েছে আশ্চর্য রকমের সমতায়। আটটি দলের মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে চমত্কার এক ধরনের ভারসাম্য। দু’টি অঞ্চল থেকেই কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছে চারটি করে দল। আগামী ১৩ জুন রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে পর্দা ওঠার আগে তাই লড়াইটা হবে মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে। আসল শক্তির লড়াই এখনই! আমেরিকা অঞ্চলে এবারের আসর বাদ দিলে অনুষ্ঠিত হয়েছে মোট সাতটি বিশ্বকাপ। এর মধ্যে কোনবারই কোন ইউরোপিয়ান দল শেষ হাসি হাসতে পারেনি। কন্ডিশনের সুবিধা পেয়েছে আমেরিকানরাই। এবারও তাই সেই সুযোগ থাকছে। এর বিপরীতে ইউরোপিয়ান দেশে আয়োজিত বিশ্বকাপ থেকে একবারই কেবল ট্রফি নিয়ে ফিরতে পেরেছে আমেরিকানরা। তাও সেটা ৫৬ বছর আগের কথা। স্বাগতিক সুইডেনকে সেবার ফাইনালে ৫-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয় করে ব্রাজিল।
তাই, নেদারল্যান্ডসের লুই ফন গাল, ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম, জার্মানির জোয়াকিম লো ও বেলজিয়ামের মার্ক উইলমটসরা দাঁড়িয়ে আছেন দ্বৈত অর্জনের সামনে। বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তাদের সামনে আমেরিকান মাটিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সুযোগ থাকছে। ব্রাজিলের লুই ফিলিপ স্কোলারি কিংবা আর্জেন্টিনার আলেসান্দে া সাবেলাও হাত গুটিয়ে বসে নেই, ইউরোপকে খালি হাতে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছক এঁকে নিচ্ছেন তারা।
এবারের ব্যতিক্রম বাদ দিলে, বরাবরই শেষ আটে ইউরোপিয়ানদেরই প্রাধান্য থাকে। চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ছিল চারটি আমেরিকান প্রতিনিধি দেশ — আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে। কিন্তু সেটা ছিল ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মত এতোগুলো আমেরিকান দলের শেষ আটে জায়গা করে নেয়া। আমেরিকানদের জন্য অন্ধকার সময় ছিল নব্বইয়ের দশক। ১৯৯০ ও ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুযোগ পেয়েছিল মাত্র একটি আমেরিকান দল। যদিও একমাত্র দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেও ১৯৯৪ সালে ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ট্রফি নিয়েই ফিরেছিল। আবার ১৯৯০-এ ডিয়েগো ম্যারাডোনার দাপটে ইতালিতে ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৬ সালে শেষ আটে আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্ব একটু হলেও বেড়েছে। এই তিনটি আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে অঞ্চলটি থেকে সুযোগ পেয়েছিল দুটি করে দল। এতো পরিসংখ্যান কি প্রমাণ করছে? শক্তি দিয়েই আবারও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করলো আমেরিকানরা? নাকি স্রেফ ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগালো?
জার্মান কোচ জোয়াকিম লো’র মতে বিশ্বকাপ আমেরিকানদের জন্য সৌভাগ্যের বার্তাই বয়ে নিয়ে এসেছে। দলগুলোর সাফল্যে কোন বিস্ময়ও দেখছেন না অভিজ্ঞ এই কোচ, ‘দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, কোস্টারিকা — সবগুলো দেশই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছে। তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে চায় যে, এখানেই তারা খেলে, এটা তাদের এলাকা। দেশ ও সমর্থকদের সন্তুষ্ট করা জন্য তাদের মধ্যে এক ধরনের মরিয়া ভাব কাজ করছে। তাই তাদের পারফরম্যান্সে বিস্ময় প্রকাশ করার কোন সুযোগ নেই। তারা যথেষ্ট শক্তিশালী, পরিচিত মাটিতে খেলারও আলাদা একটা শক্তি যে আছে, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে।’
আমেরিকানদের সাফল্যের পিছনে আরেকটা কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইউরোপে খেলার সুযোগকে। নব্বইয়ের দশক থেকে ইউরোপের বাজারে আমেরিকানদের কদর বাড়তে থাকে। ফলে ইউরোপিয়ান কৌশলটা তাদের আয়ত্তে চলে আসে। বর্তমান বিশ্বকাপে আমেরিকার তিন সুপারস্টারও খেলেন ইউরোপিয়ান ক্লাবেই — লিওনেল মেসি ও নেইমার (বার্সেলোনা), জেমস রড্রিগেজ (মোনাকো)।
দক্ষিণ আমেরিকান ক্রীড়া লেখক টিম ভিকারির মতে, অঞ্চলটির সাফল্যের আসল কারণ হলো বাছাইপর্বের ধরন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার তথাকথিত দুর্বল দলগুলোর ফুটবলে হঠাত্ জোয়ার আসার কারণ হলো ১৯৯৬ সালে আসা বাছাইপর্বের ফরম্যাটের পরিবর্তন। এর ফলে তারা নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। ভাল কোচরা এখানে আসতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ভাল একটা অবকাঠামোও দাঁড়িয়ে যায়।’
দক্ষিণ, মধ্য ও উত্তর আমেরিকার দলগুলোর আধিপত্য এবারের বিশ্বকাপে আলাদা রঙই যুক্ত করলো। একইভাবে দু’টি আফ্রিকান দেশ — নাইজেরিয়া ও আলজেরিয়াও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।
কোচ ভাহিদ হালিলহোডিচের দল আলজেরিয়া শেষ ষোলোর ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে দারুণ লড়াই করেছিল। তিনিও সাফল্যের পিছনে ইউরোপিয়ান লীগগুলোর ভূমিকা দেখছেন, তবে সেটা একটু ভিন্নভাবে, ‘যদিও ইংল্যান্ডের বাদ পড়া আমার কাছে বড় কোন আপসেট নয়। তারপরও ইতালি, ইংল্যান্ড ও স্পেনের খেলোয়াড়দের আমার অনেক ক্লান্ত মনে হয়েছে। তাদের নিজেদের কঠিন ঘরোয়া লিগ খেলে এখানে আসতে হয়েছে। সেখানে অনেকগুলো ম্যাচ খেলতে হয়, চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি। কয়েকদিন বিশ্রামের সুযোগ পেলেও সেটা কোনভাবেই যথেষ্ট নয়। শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক সঙ্গের অভাবেই তারা ব্যর্থ হয়েছে। এর বাইরে কয়েকজন খেলোয়াড়ের মধ্যে আমি দলের প্রতি খুব একটা একাগ্রতা দেখতে পাইনি। ক্লাবপর্যায়ে তারা অনেক কিছু জিতে ফেলেছে। তারা ফুটবল থেকে আর চায় না, আর খুব বেশি অর্থও উপার্জন করতে চায় না। বিশ্বকাপও জিততে চায় না।’
স্পেনের গ্রুপ পর্যায় থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার পিছনেও তিনি এই আকাঙ্ক্ষার অভাবকেই দায়ী করেন, ‘স্পেনের আরেকবার বিশ্বকাপ জয়ের তীব্র বাসনা ছিল না। অথচ টুর্নামেন্ট শুরু হবার আগে অনেকের মতেই তারা ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। গত একদশকে যা কিছু জয় করা সম্ভব তার সবকিছুই ওরা পেয়ে গেছে, ওদের খেলা দেখে মনে হয়েছে ওরা আর লড়াই করতে চায় না।’ ইউরোপিয়ানদের বাজে পারফরম্যান্সের আরেকটা কারণ হল ব্রাজিলের জলবায়ু। তাপমাত্রা এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রেখেছে; যেমনটা হয়েছিল, মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত দুটি আসরে।
ইংল্যান্ডের সাবেক উইঙ্গার ক্রিস ওয়াডেল বলেন, ‘এই জলবায়ুতে যারা বেড়ে উঠেছে তারা অবশ্যই অন্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। তবে দলগুলোর প্রস্তুতির কৌশল আর আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানের বদৌলতে এটা বড় কোন সমস্যা হতে পারে না। আমি মেক্সিকোতে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ খেলেছি। সেটা কঠিন এক সময় ছিল। তাপমাত্রা ছিল ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তখন আমাদের সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া লেগেছে ফুটবলে। এখন খেলোয়াড়রা কিভাবে নিজেদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখাতে পারে, তার জন্য অনেক গবেষণা করা হয়। সব মিলিয়ে তাই ব্রাজিলে ইউরোপিয়ানদের খুব সমস্যা হবার কথা নয়। আমেরিকান কিংবা ইউরোপিয়ান — সব দলই এখানে সমান।’
কোন সমস্যা যে হয়নি সেটা কোয়ার্টার ফাইনালের লাইন আপ দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। কি দারুণ এক সমতা থেকে শুরু হতে যাচ্ছে শেষ আটের লড়াই। শেষ পর্যন্ত আধিপত্য দেখাবে কারা? সেটা যাই হোক না কেন, যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক না কেন বিজয় হবে ফুটবলেরই!
শেষ আটে ইউরোপ-আমেরিকা লড়াই
(১৯৯০ সাল থেকে)
বিশ্বকাপ ইউরোপিয়ান দেশ আমেরিকান দেশ
১৯৯০ ৬ ১
১৯৯৪ ৭ ১
১৯৯৮ ৬ ২
২০০২ ৪ ২
২০০৬ ৬ ২
২০১০ ৩ ৪
২০১৪ ৪ ৪
