জীবন-অভিজ্ঞতার নির্যাসই কবিতা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ১৯:৫৯
জুনান নাশিত : শিল্পের অন্যান্য শাখাকে বাদ দিয়ে কবিতা চর্চাকে বেছে নিলেন কেন? আবুল হোসেন : প্রথম যৌবনে গদ্য পদ্য দুইই তো দু’হাতে লিখেছি। ছোটগল্প লিখেছি। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে সাহিত্য সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছি। বহু কবিতার বইয়ের আলোচনা করেছি। এইসব গদ্য লেখার বেশ কিছুটা স্বীকৃতি পেয়েছিলাম বিদগ্ধ সমাজে। এসব লিখতে লিখতে একসময়ে মনে হলো, আমার মনের কথাটা যেভাবে কবিতায় খুব সহজে বলতে পারি গদ্যে সেটা করতে অনেক সময় লাগে। কবিতাকে বেছে নেওয়ার সেটাই একটা মূল কারণ। জু. না. : কবিতা লিখছেন দীর্ঘসময় ধরে। আপনার বিকাশের সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সাহিত্যচর্চার মধ্যে কালগত ও মানগত পার্থক্য কতটুকু? এ পার্থক্য কি ইতিবাচক? আ. হো. : তিরিশের দশকের শেষে আমি যখন লিখতে শুরু করি তখন আমাদের সাহিত্য-সমাজের চেহারাটা যেমন ছিল তার সঙ্গে এ সময়ের কোনো তুলনা হয় না। সে সময়ে আমাদের সমাজে লেখকের সংখ্যা ছিল সীমিত এবং যারা লিখেছিলেন তাদের লেখার মান বিশেষ করে হিন্দু-সমাজের সঙ্গে তুলনায় অনেকটা খাটো ছিল। তখন বাংলা সাহিত্যের সাধারণ যে মান ছিল তা থেকে আমাদের সমাজের লেখকদের মান তুলনীয় ছিল না। আমার মনে হয়েছিল আমরা প্রায় ২৫-৩০ বছর পিছিয়ে আছি। পার্থক্যটা বেশি ছিল মনন ও রুচিগত। এই পঞ্চাশ বছরে যে পরিবর্তন হয়েছে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক। আমাদের লেখকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। লেখার মান অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা কোনো কোনো দিকে সমগ্র বাংলা সাহিত্যের আধুনিক মান ধরতে পেরেছি। যেমন—আমাদের প্রবন্ধ। বিশেষ করে গবেষণামূলক প্রবন্ধ বেশ ভালো লেখা হয়েছে। কবিতায় আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। কিছু ভালো উপন্যাসও লেখা হয়েছে। জু. না. :আপনার গদ্য লেখার হাত ভালো। কিন্তু আর এগোলেন না কেন? আ. হো. : প্রথম প্রশ্নেই তার জবাব দিয়েছি। তবে এটুকু বলতে পারি, গদ্য লেখা একেবারেই ছেড়ে দিইনি। মাঝে মধ্যে লিখেছি। আবার কিছুটা এখন লিখতে শুরু করেছি। জু.না. : ভালো কবি হওয়া কি বড়ো বিষয়? নাকি একজন ভালো মানুষ হওয়া? আ. হো. : আমি মনে করি, এ দুটোর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। তবে খারাপ মানুষ যে ভালো কবি হবে না তা তো নয়। ভালো মানুষ আর ভালো কবির মধ্যে যদি কাউকে বেছে নিতে হয় তাহলে আমি ভালো মানুষকেই বেছে নেবো। ভালো মানুষ হওয়া ভালো কবি হওয়ার চেয়ে বড়ো ব্যাপার। সব মানুষ তো কবি হতে পারে না বা হবে না। কেউ কেউ কবি হয়। কিন্তু আরো অনেক বেশি মানুষ ভালো মানুষ হতে পারে। জু. না. : কবিতা কি সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে? আ. হো. : অবশ্যই পারে। সমাজের মনন, রুচি, রসবোধ কবিতা বদলে দিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন, নজরুল দিয়েছেন। তাঁরা সমাজকে বদলে দিয়েছেন। কবিতা বিপ্লবের জন্মও দিয়েছে কোনো কোনো দেশে। জু. না. : আপনাকে বলা হয় চল্লিশের আধুনিক কবি। কবিতায় আধুনিকতার উপলব্ধি আপনার কী করে এলো? সভ্যতা কিংবা ইতিহাসের আধুনিকতা আর কবিতার আধুনিকতা কী এক? আ. হো. : আধুনিকতা একটা মতবাদের বিষয়। এটা একটা তত্ত্ব। আধুনিকতা সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, স্থাপত্য সবকিছুতেই থাকতে পারে। এই তত্ত্বটা তো পশ্চিম থেকে এসেছে। আসলে আধুনিকতা এসেছিল পনের শতকে। পেগানিজমকে বাদ দিয়ে খ্রিস্টিয় মূল্যবোধের মধ্যদিয়ে। পরে আধুনিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এইসব বিষয়। কিন্তু আমরা যখন আধুনিকতার কথা বলি তখন সাহিত্যের আধুনিকতার কথা ভাবি। তাও শুধু কবিতার ক্ষেত্রে। একটা বিশেষ সময়ের কবিতাকে আমরা নাম দিয়েছি আধুনিক কবিতা। সময়টা হচ্ছে তিরিশের দশক। সেইদিনের আধুনিকতার প্রধান বিষয়টা ছিল রবীন্দ্র-বিরোধিতা। রবীন্দ্রনাথ যা কিছু করেছেন তা থেকে ভিন্নভাবে কবিতা লেখা। যিনি আধুনিক কবিতার প্রথম সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন তিনি আর কোনো নাম না পেয়ে আধুনিকতা শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলা কবিতায় আধুনিকতা আরো অনেক আগে এসেছে। যদি আধুনিকতার কথা বলতে হয়, তবে আমি বলব, মাইকেলই প্রথম আধুনিক কবি এবং বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার শুরু মাইকেলের হাত দিয়েই। আমি তো আধুনিক কবিতার সঙ্গে একসঙ্গে বড়ো হয়েছি। ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিকতার সঙ্গে যাদের যোগ সবচে বেশি, সেই এজরা পাউন্ড, টি এস এলিয়ট, ডব্লিউ বি ইয়েটস, ডব্লিউ এইচ অডেন ও ম্যাকনিসের কবিতা পড়তে পড়তে আধুনিকতা আমার রক্তে মাংসে ঢুকে যায়। জু. না. : আপনাকে বুদ্ধিবাদী কবি বলা হয়। কবিতায় বুদ্ধি, আবেগ, অভিজ্ঞতা কার স্থান কতটুকু হওয়া প্রয়োজন? আ.হো. : শুধু বুদ্ধি দিয়ে কবিতা হয় না। ভালো কবিতা লিখতে হলে আবেগসমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা সবচে বেশি প্রয়োজন। জীবন-অভিজ্ঞতার নির্যাসই কবিতা। জু. না. : কোনো কোনো সমালোচক আপনাকে রুঠা ভাষার কবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ দেশীয় কাব্যপাঠক আবেগসংযমী কবিতার ভালো সমঝদার নয়, তা জেনেও মেদমজ্জাহীন কবিতা চর্চায় আগ্রহী হলেন কেন? আ. হো. : আমি মনে করি কথাটা ভুল। কথাটা উঠেছে এ জন্যে যে আমি কবিতাকে গদ্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে চেয়েছি। গদ্য ও পদ্যের ব্যবধানটা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মানুষের শরীরে যেমন, কবিতার ক্ষেত্রেও মেদ কোনো কাজে আসে না। অতিরিক্ত মেদ অসুস্থতার লক্ষণ। কিন্তু মজ্জা শরীরের জন্যে যেমন প্রয়োজন, কবিতাতেও মজ্জা থাকতে হয়। মজ্জা বুদ্ধি, মনন ও পেশির কাজ করে। কবিতায় ভাবালুতা বর্জন করে তার পেশির অংশটা বাড়াতে পারলে কবিতা ভালো হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। জু. না. : আপনার রাজনীতি প্রভাবিত কবিতা আছে বেশ কয়েকটি। কিন্তু সেভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক মতবাদের ছাপ নেই। তবে কি আপনি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী নন? একজন কবির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার আদৌ কি প্রয়োজন আছে? আ. হো. : কয়েকটি নয়। আমার রাজনীতি সম্পর্কে কবিতা প্রচুর। কিন্তু সেগুলোতে শ্লোগান নেই বলে লোকে বুঝতে পারে না যে এগুলো আসলেই রাজনীতি-সচেতনতার কবিতা। কড়া মতবাদ নয়, তবে রাজনৈতিক মতবাদের ছাপ যে একেবারেই নেই তা নয়। বামপন্থায় আমার বিশ্বাস কোনোদিনই পুরোপুরি শিথিল হয়নি। কবিকে সমাজ-সচেতন হতেই হয়। সমাজ-সচেতন হতে হলে রাজনৈতিক সচেতনতাও অপরিহার্য।