বিশ্বকাপের পরিধি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ইতোমধ্যে গ্রুপ আর প্রিকোয়ার্টার ফাইনাল পর্ব মিলিয়ে বিদায় নিয়েছে ২৪ দল। এখন অপেক্ষায় অবশিষ্ট আট দল। সেরা আট দল এবার আরো কঠিন লড়াইয়ে নামছে। আজ ব্রাজিল খেলবে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে, ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে। আগামীকাল নেদারল্যান্ডস খেলবে কোষ্টারিকার বিরুদ্ধে এবং শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম।
বিশ্বকাপ জিততে হলে এখন কেবল তিন ম্যাচ জিতলেই হবে। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। কে জিতবে এই তিন ম্যাচ তা নিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় চলছে জল্পনা-কল্পনা। আট দেশের মধ্যে চারটি ল্যাটিন অ্যামেরিকান। চারটি ইউরোপের। দারুণ লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবলামোদীরা। ফুটবল দুনিয়ায় ল্যাটিন এবং ইউরোপীয় ফুটবল দেশগুলোর মধ্যে মানসিক লড়াইটা নতুন কিছু নয়। ফুটবলামোদীরা দুই ঘরানার এ লড়াই দেখে আসছেন শত বছরের বেশি সময় ধরে। কেউ বলেন পাওয়ার ফুটবলের কদরটা বেশি। আবার কারো কারো কাছে ধ্রুপদী ফুটবলের। বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকরা রাত জেগে পাওয়ার ফুটবল দেখলেও ধ্রুপদী ঘরানারই কদর বেশি।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন, ৬৬’র চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, পতুর্গাল এবং ১৯৩৪, ৩৮, ৮২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইতালির মতো দেশ গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে। ফুটবল অনুরাগীরা হতবাক হয়েছেন দলগুলোর বিদায়ে। এশিয়ার দেশ জাপান, কোরিয়া, ইরান, এশিয়ার হয়ে খেলা অস্ট্রেলিয়া পাত্তাই পায়নি। চিলি, মেক্সিকো, ১৯৩০ প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে, গ্রীস, নাইজেরিয়া, সুইজারল্যান্ড, আলজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র শেষ ষোল পর্যন্তই টিকলো। এই দলগুলো মরণপণ লড়াই করেও কঠিন বাঁধাটা পেরিয়ে আসতে পারল না। বাস্তবতার কাছে হার মানতে বাধ্য হলো।
দারুণ খেলেছিল আলজেরিয়া। কিন্তু জার্মানির বিরুদ্ধে ভাগ্যের কাছে হেরে গেলো। কোষ্টারিকা গ্রীসের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ঝরে গেলো গ্রীস। চমক দেখিয়েছে বেলজিয়াম। আলোচনায় না থাকা বেলজিয়াম, ফুটবল বিশ্বকে আবার জানিয়ে দিয়েছে তারা নতুন চেহারা নিয়ে উঠে আসছে। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর প্রাক্কালে ‘ডার্ক হর্স’ আখ্যা পাওয়া বেলজিয়াম গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিকোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ম্যাচে ২-১ গোলে জিতে বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে। বাংলাদেশের সময় গভীর রাতে অনুষ্ঠিত খেলাটিতে দারুণ লড়াই হয়েছে। যে কোনো দল জিতে যাবে এমন পরিস্থিতিতে পেন্ডুলামের মতো দুলছিল বেলজিয়াম এবং ক্লিন্সম্যানের যুক্তরাষ্ট্র। দুই দল গোলের পর গোল মিস করেছে। এক কথায় গোল মিসের মহড়া গেছে ম্যাচটিতে। গোল লাইন থেকে বল ফিরে এসেছে অসংখ্যবার। চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গোলকিপার। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে খেলায় ২-১ গোলে জিতলো বেলজিয়াম।
প্রিকোয়ার্টার ফাইনালের আট ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটি, কলম্বিয়া-উরুগুয়ে, নেদারল্যান্ডস-মেক্সিকো এবং ফ্রান্স-নাইজেরিয়া ম্যাচটি ৯০ মিনিটে শেষ হয়। ব্রাজিল চিলির ম্যাচে ১২০ মিনিটেও গোল হয়নি, টাইব্রেকারে ব্রাজিল জিতেছে। কোষ্টারিকা গ্রীসের ম্যাচও গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। আর প্রিকোয়ার্টার ফাইনালের শেষ তিন ম্যাচ ১২০ মিনিটে শেষ হয়। পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে কতটা কঠিন লড়াই হয়েছে।
গতবার দক্ষিণ আফ্রিকায় কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে বিদায় নেয়া ১৯৫৮, ৬২, ৭০, ৯৪ ও ২০০২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিদায় নিয়েছিল। এই দুই দেশ আবার উঠেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া এবারই প্রথম এতো দূর এসেছে। কলম্বিয়া এ নিয়ে (৬২, ৯০, ৯৪, ৯৮) পাঁচবার বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে খেলছে।
১৯৯৮’র চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স পরের আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও জার্মানিতে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলেছিল ইতালির বিরুদ্ধে। রানার্সআপ হয় মিশেল প্লাতিনির দেশ ফ্রান্স। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ফুটবলে পতন হয়েছিল প্লাতিনির উত্তরসূরীদের। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়। পরিসংখ্যানে এগিয়ে আছে বেকেন বাওয়ারের জার্মানি। এই দেশটির বিশ্বকাপ ফুটবলের পরিসংখ্যানটি দারুণ। ১৯৫৪, ৭৪, ৯০ তিনবার শিরোপা পাওয়া জার্মানি সাত বার ফাইনাল খেলছে। গত দুটি আসরসহ পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলেছে। ২০০২ বিশ্বকাপের রানার্সআপ জার্মানি গত দুটি আসরে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয়। এবার তারা মরিয়া চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য।
আগামীকাল শনিবার প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে গতবারের ফাইনালিষ্ট নেদারল্যান্ডসের প্রতিপক্ষ কোষ্টারিকা। অনেকে কোষ্টারিকাকে গোণায় ধরেনি। সেই কোষ্টারিকা গ্রুপ পর্বে উরুগুয়ে এবং ইতালিকে হারায় এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল শূন্য ড্র করে। ফলে দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ইতালিকে বাদ পড়তে হয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের রেকর্ড বইয়ে কোষ্টারিকার ইতিহাস খুব সমৃদ্ধ নয়। সর্বোচ্চ অর্জন ৯০ ইতালি বিশ্বকাপের প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে খেলা। এবার আরেক ধাপ উপরে উঠে কোষ্টারিকা সবাইকে চমক দিয়েছে। এখন কতোটা ধারাবাহিকতা রাখতে পারে সেটাই দেখার ব্যাপার।
আগামীকালকের দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বেলজিয়ামের লড়াই দারুণ উপভোগ্য হবে বলে আশা করছেন ফুটবলামোদীরা। আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ দলের মুখোমুখি হবে বেলজিয়ামের তারুণ্য নির্ভর ফুটবলাররা। অভিজ্ঞতার সামনে তারুণ্যের ঝলকানি কতোটা টিকবে সেটা অবশ্য বলা কঠিন। বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ অর্জন ১৯৮৬’র মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলা।
সব মিলিয়ে আট দলের কঠিন লড়াই দেখতে যাচ্ছে দর্শকরা। এখন মাঠের লড়াই দেখলেই পরিষ্কার হবে ৮ ও ৯ জুলাই কোন চার দল খেলবে সেমিফাইনাল।
