অধ্যাপক মবিন খান
রমজান মাসের রোজাকে আমাদের স্রষ্টা আমাদের জন্য ফরজ করেছেন। অতএব আলস্য করে, রোগের অযুহাত দিয়ে রোজা না রাখার চেষ্টা করা উচিত্ নয়। যারা জটিল রোগে ভুগছেন তারা ডাক্তারের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ সেবন করে রোজা রাখতে পারেন। যাদের একান্তই রোজা রাখার অবস্থা নেই তাদের জন্য আল্লাহ হুকুম শিথিল করেছেন। তারা রোজার কাফফারা দিয়ে দিলে দায়মু্ক্ত হবেন। আল্লাহ রমজান মাসকে আমাদের আত্মার পরিশুদ্ধির উপায় ও নাজাতের পথ করে দিয়েছেন। অতএব, চলুন আমরা এ সুযোগ গ্রহণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন, আমীন। এখানে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় কিভাবে রোজা রাখবেন তা নিয়ে আলোচনা করা হলো। এসব পরামর্শ মেনে চললে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অসুস্থ ব্যক্তিরাও রোজা রাখতে পারবেন।
লিভারের অসুখ
লিভারের রোগ বিভিন্ন ধরণের তাই রোজার হুকুমও রোগী ভেদে ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। লিভারের রোগগুলোকে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী এ দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তন্মধ্যে একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিস স্বল্পমেয়াদে জণ্ডিস হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ভাইরাল হেপাটাইটিসের রোগীর ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। একেবারেই খেতে অক্ষম হলে রক্তনালীতে সেলাইন দেয়ারও প্রয়োজন হতে পারে। সে হিসেবে ভাইরাল হেপাটাইটিসে রোজা রাখা উচিত্ নয়।
অন্যদিকে, যে দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহে আমাদের দেশের রোগীরা বেশী ভুগেন তার মধ্যে আছে সিরোসিস, যা দু ধরণের হতে পারে- কমপেনসেটেড ও ডিকমপেনসেটেড। কমপেনসেটেড সিরোসিস রোগীর খাওয়ার প্রতি অনীহা, পেটের পীঁড়া, আমাশয় বা ডায়রিয়া থাকতে পারে। এই সময় রোগীর উপসর্গের মাত্রা কম থাকলে এবং রোগী সাধ্যমত খেতে সক্ষম হলে রোজা রাখতে পারে। ডিকমপেনসেটেড সিরোসিস রোগী অনেক বেশী অসুস্থ থাকে, পেটে পানি চলে আসে, চোখ হলুদ হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়। সুতরাং এ সময় রোজা রাখা যাবে না। এছাড়া, লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর পক্ষে রোজা রাখা অসম্ভব ।
ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীর জন্য রোজা রাখার ব্যাপারে কোন বাধা তো নেই-ই, বরং রোজা তার লিভারের ফ্যাট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পেপটিক আলসার
আমাদের দেশের মানুষের সাধারণ সমস্যাগুলোর অন্যতম হল- বদহজম, বুকে জ্বালাপোড়া, মুখে তিতা পানি আসা। এই লক্ষণগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ হল, নন-আলসার ডিসপেপসিয়া। এক্ষেত্রে পাকস্থলীতে ঘা থাকে না। কিন্তু রোগীর বুক জ্বালাপোড়া করে, পেটে গ্যাস হয়, মুখ দিয়ে তিতা পানি আসে।
সাধারণত রেনিটিডিন বা ওমিপ্রাজল জাতীয় ওষুধ খেলে সমস্যা দূরীভূত হয়। সুতরাং এ সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা ইফতারের সময় এবং সেহরীর আগে নিয়মিত ওষুধ সেবন করে নিশ্চিন্তে রোজা রাখতে পারেন। অন্যদিকে যাদের পেপটিক আলসার ধরা পড়েছে, তাদের যদি রক্তবমি হওয়ার বা আলকাতরার মত কালো পায়খানা হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাদের উচিত্ হবে রমজান মাস আসার আগেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া।
উচ্চরক্তচাপ ও হূদরোগে
উচ্চ রক্তচাপ ও হূদরোগ যদি ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে রোজা রাখতে কোন নিষেধ নেই। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রোজার সময় ওষুধ এডজাস্ট করে নেয়া জরুরী।
অন্যদিকে যে সকল রোগীর হৃদপিণ্ডের রক্তনালী বন্ধ হয়ে (তথা একিউট এম আই হয়ে) বা রক্তশূন্যতার কারণে বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ-রক্তচাপের কারণে বা হার্ট ব্লক হয়ে হার্ট ফেইল করেছে তথা হূদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা হঠাত্ কমে গেছে, ফলে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে, তাদের জন্য চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রোজা রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
অ্যাজমা ও হাঁপানীর সমস্যা
যারা অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত তাদের সমস্যা যদি রাতে একবার বা দুইবার ইনহেলার ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণে থাকে, তারা নিশ্চিন্তে রোজা রাখতে পারেন। যাদের রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে তিন থেকে চারবার ইনহেলার ব্যবহার করতে হয় তারা উপরে প্রদত্ত ফিকহ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোজা রেখেও ইনহেলার ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু যারা এই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চান, তারা একজন ফকীহ ও চিকিত্সকের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্তে আসতে পারেন। উপরোক্ত উপায়েও যাদের হাঁপানীর সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তারা রোজা রাখবেন না বরং কাফফারা আদায় করে নেবেন।
ডায়াবেটিস
অনেকের ধারণা, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী রোজা রাখতে পারবেন না। এটি একটি ভুল ধারণা। ডায়াবেটিস রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে রোজা রাখতে কোন সমস্যা নেই। যাদের ডায়াবেটিস শুধুমাত্র ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন দ্ব্বারাই নিয়ন্ত্রণে আছে, তারা অনায়াসেই রোজা রাখতে পারেন। যারা মেটফরমিন ও ভিলডাগ্লিপটিন জাতীয় ওষুধ সেবন করছেন তাদেরও রোজা রাখলে অসুবিধে নেই। তবে যারা গ্লিমেপিরাইড, গ্লাইবেনক্ল্যামাইড, গ্লিকাজাইড ও গ্লিপিজাইড জাতীয় মুখে খাওয়ার ওষুধ অথবা ইনসুলিন ব্যবহার করছেন তাদের রোজা রাখার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। কেননা ইনসুলিন একদিকে কোষে গ্লুকোজ ঢুকায়, অন্যদিকে চর্বি ভেঙ্গে গ্লুকোজে পরিণত হতে দেয় না। ফলে রক্তে গ্লুকোজ কমে হাইপোগ্লাইসিমা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই উপরোক্ত ওষুধগুলো এবং ইনসুলিনের ডোজ ও সময় এডজাস্ট করে নিলে এই ঝুঁকি দূর করা যায়। প্রসঙ্গত, ইফতার খাওয়ার আগে চামড়ার নিচে ইনসুলিন নিলে রোজা ভঙ্গ হয় না।
ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস ও হাইপোগ্লাইসামিয়া হলে রোজা রাখা যাবে না। যাদের সমপ্রতি ঘনঘন হাইপোগ্লাইসেমিয়া হচ্ছে, তারাও রোজা রাখতে পারবেন না। রোগীদের কারও রোজা রাখা অবস্থায় মাথা ঝিমিয়ে আসলে, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেলে এবং ঘাম হলে দ্রুত রোজা ভেঙ্গে চিনির শরবত খেয়ে নেবেন। ডায়াবেটিস রোগী ইফতারের সময় অবশ্যই সহজে গ্লুকোজ শরীরের প্রবেশ করে এমন একটি খাবার (যেমন: ফলের জুস, শরবত, খেজুর) ইফতারের শুরুতেই সেবন করবেন যেন রক্তের আপাত গ্লুকোজ ঘাটতি দ্রুত পূরণ হয়ে যায়। এছাড়াও ইফতারে পর্যাপ্ত পরিমাণে সালাদ, ইসুবগুলের ভূসি, সবজি ইত্যাদি খাবেন।
লেখক:পরিচালক
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
ধানমন্ডি, ঢাকা
