নরেন্দ্র মোদী এমন একটা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসেছেন, যখন ভারতীয় অর্থনীতির অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। বিচক্ষণ নতুন প্রধানমন্ত্রী খু্ব ভাল করেই জানেন যে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থনীতিকে অন্তত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে না পারলে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তায় ভাটার টান ধরতে খুব বেশিদিন লাগবে না
যাকে বলে ‘ভূমিধস’ বিজয়। ভারতের গত নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী, বিজেপি এবং তাদের জোটের পাওয়া সাফল্য প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে— এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। উন্নয়ন ও সুশাসনের যে প্রতিশ্রুতি নরেন্দ্র মোদী দিয়েছিলেন, তাতে বিশ্বের সববৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশের ভোটাররা সাড়া দিয়েছে যেনো চোখ-কান বুঁজে। নামের পাশে সাম্প্রদায়িক শব্দটি জুড়ে দিয়েও প্রতিপক্ষরা ভোটের মাঠে তাঁকে ঘায়েল করতে পারেনি। উল্টো তাঁদেরই বরণ করতে হয়েছে শোচনীয় পরিণতি। মোদীর সাফল্যের পেছনে সবচে’ বেশি ভূমিকা রেখেছে তাঁর গুজরাট উন্নয়ন মডেল। অন্যান্য রাজ্যের লোকজনও আশা করছে, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে গোটা ভারতই অদূর ভবিষ্যতে গুজরাটের পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। বলার প্রয়োজন পড়ে না, তবুও বলা- আরব সাগর তীরবর্তী গুজরাট মোদীর হাত ধরেই এগিয়ে গেছে অনেক দূর। অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে এ রাজ্যের পার্থক্যটা চোখে পড়ে খুব সহজেই।
নরেন্দ্র মোদী এমন একটা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসেছেন, যখন ভারতীয় অর্থনীতির অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। বিচক্ষণ নতুন প্রধানমন্ত্রী খু্ব ভাল করেই জানেন যে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থনীতিকে অন্তত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে না পারলে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তায় ভাটার টান ধরতে খুব বেশিদিন লাগবে না। মন্ত্রিপরিষদের সবচে’ জটিল পদটিতে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন ৬১ বছর বয়স্ক আইনজীবী অরুন জেটলিকে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজটিই হবে প্রবৃদ্ধির আগের গতি ফিরিয়ে আনা। সেইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে রাখতে হবে। সে লক্ষ্যে আসছে বাজেটেই আমরা অনেক দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। যার সুফল খুব দ্রুতই পেতে শুরু করবে ভারতের লোকজন।’
মোদীর প্রশাসন উত্তরাধিকারসূত্রে এমন এক অর্থনীতি পেয়েছে, যা বর্ধিত হচ্ছে এক দশকের সর্বনিম্ন গতিতে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হার বর্তমানে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে; অথচ কয়েক বছর আগেও এ হার ছিল দুই অংকের কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ভারতীয় অর্থনীতি এখন স্থবিরতায় ভুগছে। নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের সম্মিলন ঘটায় নতুন সরকারকে আহামরি চমক দেখাতে বেগ পেতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি ঘুরপাক খাচ্ছে ৯ শতাংশের আশেপাশে, যা কি-না এ অঞ্চলের সর্বোচ্চ। জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হচ্ছে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখতে। এ অবস্থায় মোদী সরকার পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেন, তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক এসওয়ার প্রাসাদের অভিমত, উচ্চ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারই হবে এ সরকারের সবচে’ বড় চ্যালেঞ্জ। সেজন্য অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন ও অনেক নতুন নীতি গ্রহণের প্রয়োজন হবে এবং এর বিকল্প নেই। কিন্তু সমস্যাটা হলো, ব্যাপক অবকাঠামোগত চাহিদা, শ্রমবাজার ও জমি অধিগ্রহণ নীতিকে ট্যাকল করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হবে নতুন সরকারকে। এমনিতেই এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে সরকারি অর্থায়ন খুব বাজে অবস্থায় রয়েছে । ভারতে রয়েছে উচ্চ আর্থিক ঘাটতি, যা কি-না জিডিপির ৪.১ শতাংশ। আহরিত রাজস্বের চেয়ে সরকারের ব্যয় অনেক বেশি। ভর্তুকি ও পাওনা পরিশোধ করতে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে সরকার, বিশেষত তেল ও সার বাবদ। এ অবস্থায় ভর্তুকি কমিয়ে দিলেও জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে মোদী সরকারকে। অপরিশোধিত তেলের মোট চাহিদার তিন-চতুর্থাংশ আমদানি করতে হয় ভারতেকে। সোনা আমদানিতেও ভারত থাকে এক-দুই নম্বরে। এটিও চলতি হিসাব ঘাটতির বড় একটি কারণ। অনেকে এমনও আশা করছেন যে, মোদী বাজেটকে তেমন প্রভাবিত না করেই প্রবৃদ্ধির আগের অবস্থান ফিরিয়ে আনবেন এবং প্রচুর নতুন চাকরি সৃষ্টি করবেন। যাকে এককথায় দিবাস্বপ্ন বলা যেতে পারে। এসওয়ার প্রাসাদ মনে করেন, দেশের তরুণদের জন্য চাকরি সৃষ্টি এবং উচ্চ ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে ভারতের উচিত চীন ও অন্যান্য পূর্ব-এশীয় দেশগুলোকে অনুসরণ করা। তারা সাফল্য পেয়েছে শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের উপর অধিক গুরুত্ব দেয়ার সুবাদে। প্রধানত গ্রামীণ ও কৃষি সমাজ থেকে ভারতেকে রূপান্তরিত হতে হবে শহুরে ও শিল্পায়িত সমাজে। দারিদ্র্য প্রশমন এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে হলে মাঝামাঝি কোনো রাস্তায় হাঁটা ঠিক হবেন না। দ্রুত রপ্তানি বাড়াতে না পারলে রুপির মানের উপর চাপ বাড়তেই থাকবে।
ভারতের মোট অর্থনৈতিক আউটপুটে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অবদান মাত্র ১৫ শতাংশের মতো এবং তা ক্রমশ কমছে। কিন্তু গুজরাটের এ হারটা ২০ শতাংশেরও বেশি (যা কি-না পূর্ব-এশীয় দেশগুলোর সমপর্যায়ে)। নির্বাচনী প্রচারাভিযানে নরেন্দ্র মোদী সুযোগ পেলেই গুজরাটের সাফল্য তুলে ধরতেন; বর্ণনা করতেন সেখানকার উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ ও দুর্নীতি-মুক্ত প্রশাসনের কাহিনী। সেইসঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ‘গুজরাট মডেল’ সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক কারনেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশাল পিস-এর বিশ্লেষক মিলন বৈষ্ণব মনে করেন, সারা ভারতে গুজরাট মডেল বাস্তবায়ন করা হবে খুবই কঠিন কাজ। কারণ রাজ্যগুলোর উপর নয়াদিল্লির নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজ্যগুলোরই বেশি।
—আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে
