গোল করতেই হবে, না হয় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতা হবে না। বিশ্বকাপ জিততেই হবে, না জিতলে আবারও রাস্তায় বিক্ষোভে ফেটে পড়বে গোটা দেশ। এতো চাপ নিয়ে আগে কেউ কোনদিন বিশ্বকাপ খেলেছেন? পেলে, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান —কেউই এতো প্রত্যাশা নিয়ে কোনদিন মাঠে নামেননি। আর ২২ বছর বয়সে তো সেটা ছিল তাদের কল্পনারও বাইরে।
কাজটা বেশ ভালভাবেই করে যাচ্ছিলেন নেইমার দ্য সিলভা স্যান্তোস জুনিয়র। প্রথম ম্যাচে দুই গোল দিয়েই কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ। বিদেশি গণমাধ্যমগুলো তাকে স্থান দিয়ে দিয়েছিল পেলেরও উপরে। দলের সবচেয়ে বড় ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, দেশ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছিল কেবল এক নেইমারকে ঘিরেই।
কিন্তু সকল আয়োজন ব্যর্থ হয়ে গেল। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৮৮ মিনিটেই শেষ হয়ে গেল নেইমারের বিশ্বকাপ। প্রতিপক্ষের হুয়ান সুনিগারের হাঁটু নেইমারের পিঠে লাগে। স্ট্রেচারে করে বার্সেলোনার এই তারকাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও ইনজুরিটা কতটা গুরুতর হতে পারে সেটা অনুমান করা যাচ্ছিল না। বোঝা গেল ম্যাচ শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেক পর, যখন দলের ডাক্তার রড্রিগো লাসমার চূড়ান্ত দুঃসংবাদটা জানালেন ব্রাজিলের স্পোর্টস টিভিকে, ‘দুর্ভাগ্যবশত নেইমার আর বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন না।’
ঠিক, এই একটা কথাই বদলে দিল ব্রাজিলের জনজীবন। কলম্বিয়াকে হারিয়ে কিছুক্ষণ আগেই যেখানে কোপাকাবানা বিচে চলছিল বিজয় উত্সব, সেখানে চলে আসলো স্বজন হারানোর বেদনা। বিশ্বকাপের স্বপ্নটা কি সেমিফাইনালে এসেই থেমে যাবে? ভার্টেব্রার ইনজুরি নিয়ে নেইমারকে বাইরে থাকতে হবে চার থেকে ছয় সপ্তাহ। পাঁচ ম্যাচে চার গোল আর এক অ্যাসিস্ট করা খেলোয়াড়কে ছাড়া কি আদৌ ব্রাজিলের পক্ষে বিশ্বকাপ জয় সম্ভব? কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারি অবশ্য নেতিবাচক কিছু চিন্তা করতে চাইছেন না, ‘এখনও আমি ভাল কিছুর জন্যই প্রার্থনা করছি। হাঁটু দিয়ে তার পিঠের নিচের অংশে গুঁতো দেয়া হয়েছে এবং ব্যথায় সে কাদছিল। চিকিত্সক আমাদের যা বলেছেন, তাতে আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, তার সুস্থ হয়ে ওঠাটা সহজ হবে না।’
এই কুকীর্তির নায়ক যিনি, সেই সুনিগা অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনই করছেন, ‘আমি আমার সাধারণ কাজটাই করেছি। কাউকে আঘাত করার কোন ইচ্ছা আমার ছিল না।’
ঘটনার পরই নেইমারকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় সাও কার্লোস হাসপাতালে। ভক্তরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। শুরু হয় তাকে নিয়ে প্রার্থনা। কিন্তু সকল প্রার্থনা শেষ পর্যন্ত কোন কাজেই আসে না। গোটা ব্রাজিলকে কাদিয়ে বিশ্বকাপ থেকে চলে গেলেন নেইমার।
১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে ইনজুরিতে পড়ে প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে। বড় তারকার বিদায়ে বিধ্বস্ত ব্রাজিলকে ভরসা যুগিয়েছিলেন গারিঞ্চা। এবার কি তেমন একটা কিছুই অপেক্ষা করছে ব্রাজিলের সামনে?
দলের ভিতরের খবর জানা না গেলেও সমর্থকরা চাইছেন তেমন কিছুই। সাও পাওলোর একটি রেস্টুরেন্টে বসে খেলা দেখছিলেন ২৭ বছর বয়সী মনিকা ফেরেইরা। এক যুগ পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার আনন্দে উদ্বেলিত ছিলেন তিনি। কিন্তু যখন শুনলেন নেইমারের বিশ্বকাপ শেষ সেই আনন্দ পরিণত হলো বিষাদে। তিনি জানালেন, ‘ও আমাদের সেরা খেলোয়াড়। তাকে আমরা ভালোবাসি কারণ ও ব্রাজিলের জার্সিতে কঠোর পরিশ্রম করে। এবার ওর কষ্টের প্রতিদান দেয়ার সময় চলে এসেছে। এবারের বিশ্বকাপ জয়টা আমরা সবাই ওর জন্যই উত্সর্গ করবো। জয় আমাদেরই হবে।’
