বিশ্বকাপ ফুটবলের মাঝপথে নেইমারের বিদায় হয়ে গেলো। তার চোট নিয়ে এখনও পুরো ফুটবল দুনিয়ায় আলোচনা চলছে। অন্য ফুটবলারদের মধ্যেও চোট পাওয়ার আতঙ্ক ভর করেছে। সাও পাওলোতে আজ আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডস দ্বিতীয় সেমিফাইনালের আগে দল নিয়ে দুই দলের কোচ-খেলোয়াড়রা যেমন খুব সাবধান। খেলোয়াড়দের চোট পাওয়া থেকে সাবধান থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে দারুণভাবে। সব মিলে বলা যায় বিশ্ব ফুটবলের এই মুহূর্তের পরাশক্তি দুই শিবিরেই চোট আতঙ্ক ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এমন ম্যাচে কতক্ষণই বা নিজেকে নিরাপদে রাখা সম্ভব। লিওনেল মেসি-আরিয়েন রোবেনরা ভালভাবেই জানেন, এমন ম্যাচে নিজের সর্বস্বটা ঢেলে দেয়ার কোন বিকল্প নেই। আর সেটা করতে গেলে চোট পাবার সম্ভাবনা থাকবেই।
তাছাড়া নেইমার যেভাবে পেছন থেকে আঘাত পেয়েছেন সেই রকম পরিস্থিতি কতক্ষণই বা পাহারা দিয়ে রাখা যাবে। দুই দলই তাই রেফারির সহায়তা কামনা করেছেন। তাদের যুক্তি, রেফারি যদি খেলাটা আরো সূক্ষ্মভাবে পরিচালনা করেন তাহলে নেইমারের মতো ঘটনা ঘটবে না। গতকাল রাতে হয়ে যাওয়া ব্রাজিলের বিরুদ্ধে টুর্নামেন্টের প্রথম সেমিফাইনালের আগে রেফারির বাড়তি সতর্কতার দাবী করেছিল জার্মানি দলও।
নেদারল্যান্ডসের দুশ্চিন্তা তাদের দলের সেরা খেলোয়াড় রোবেন-ফন পার্সিরাও আবার এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে যান কিনা।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা তো সরাসরি নিজের দাবী তুলে ধরেছে ফিফার কাছে। ফিফার কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারেই আমলে নিয়েছেন। ফিফা ঘোষণা দিয়ে চোট পাওয়া খেলোয়াড়দের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিবে বলে জানা গেছে। আর তাছাড়া ভালো ফুটবলারকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বটা কিছুটা হলেও রেফারির উপরই বর্তায়। ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলাগুলোতে সেটাই দেখে আসছি আমরা। তবে ব্রাজিল বিশ্বকাপে রেফারি কতটা পেরেছেন তা হয়তো দর্শকরাই ভালো বলতে পারবেন।
তবে সব মিলে বলা যায়, চোট আতঙ্ক মাথায় রেখেই মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা এবং নেদারল্যান্ডস। দু’দলের জন্যই অপেক্ষা করছে বহুকাঙ্ক্ষিত ফাইনাল। চব্বিশ বছর পর আবার সেমিফাইনালে খেলছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা যে ম্যাচগুলো খেলেছে সেটা যে প্রকৃত আর্জেন্টিনা নয় নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। শুধু সমর্থকই বা বলি কেন? দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো সাবেক তারকারাও সমালোচনা করেছেন দলের পারফরম্যান্সের। আর অধিনায়ক লিওনেল মেসিও তো প্রকাশ্যেই করেছেন কোচের কৌশলের সমালোচনা।
বসনিয়া হার্জেগোভিনা, নাইজেরিয়া, ইরানের মতো দুর্বল দলের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে লড়াই করতে হয়েছে। শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১১৮ মিনিটে গোল করে ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। আর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে পেলেও মেসিরা ম্যাচের ৮ মিনিটে পাওয়া গোলটি ধরে রেখে জয়টা তুলে নিয়েছে। আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠেছে ঠিকই। নামের ভার অনুসারে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল কি দর্শক প্রত্যাশানুযায়ী খেলতে পেরেছে? দলের ভেতরে আত্মতুষ্টি আছে কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে চিন্তায় আছেন কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলা। কঠিন এবং শক্ত প্রতিপক্ষের সামনে সাবেলার দল কতটুকু লড়াই করতে পারবে সেটা দেখার অপেক্ষায় আর্জেন্টাইন ভক্তরা।
আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের আসল লড়াইটা হবে আজ নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে। সাবেলার শিষ্য মেসি, হিগুয়েন, মাসচেরানো, লাভিজ্জি, পাবলো জাবেলটা, গ্যাগোদের সামনে কঠিন পরীক্ষা। কারণ ডি মারিয়া নেই। আগুয়েরা চোট থাকলেও দল থেকে বলা হয়েছে সে এখন ফিট। নামতে পারবে। সাবেলা চূড়ান্ত করেননি ডি মারিয়ার জায়গায় কাকে স্থান দেবেন।
আর্জেন্টিনার ফরমেশনে আছে চার ডিফেন্ডার। রোজো, গ্যারায়, ফার্নান্ডেজ, জাবালেতা। সামনে থাকতে পারেন গ্যাগো, মারসচেরানো এবং আগুয়েরা অথবা ম্যাক্সি রডরিগুয়েজ অথবা এনোজো পেরেজ থাকবেন। মেসির সামনে থাকবেন হিগুয়েন এবং লাভেজ্জি। এমন ছকেই খেলার সম্ভবনা আর্জেন্টিনার।
কোস্টারির বিরুদ্ধে ম্যাচটা ছাড়া নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে যে খেলাগুলো গেছে তাতে নেদারল্যান্ডস বুঝিয়ে দিয়েছে তারা ফুটবল যুদ্ধের ময়দানে লড়াকু সৈনিক। নেদারল্যান্ডস তিন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলে আসছে। মার্টিন ইনডস, ভিলার, ডি ভ্রিজ, দুই উইংয়ে থাকবেন ডার্ক কুইট এবং ব্লিন্ড। তারা উপরে উঠবেন আবার নিচেও নামবেন দলের প্রয়োজনে। এই দুজনকে মাঝ মাঠের যোগান দেয়ার জন্য নির্ধারণ করেছেন কোচ লুইস ভ্যানগাল। স্নেইডার, ডিপেই, ফনপার্সি, আরিয়ের রে বেন আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভাঙ্গার দায়িত্ব নেবেন। ভয়ঙ্কর ফুটবল খেলেনে স্নেইডার, ফনপার্সি নেদারল্যান্ডসের শক্তি তারা। ১২০ মিনিট খেলেও ক্লান্ত হতে দেখা যায় না যাদের। টোটাল ফুটবলের জনক বলা হয় নেদারল্যান্ডসকে। অথচ আজ পর্যন্ত এই ফুটবল দেশটি বিশ্বকাপের শিরোপা পায়নি। বিশ্বকাপ ফুটবলের বর্তমান রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস এবার নিয়ে ৫ বার সেমিফাইনাল খেলছে। আবার তাদের সামনে ফাইনালে উঠার সুযোগ এসেছে। এক ম্যাচ দূরে আছে ডাচ ফুটবল। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে যেতে পারলে ট্রফির কাছাকাছি যাবে নেদারল্যান্ডস।
৭৮ এবং ৮৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা কি ছেড়ে দেবে নেদারল্যান্ডসকে। এমনিতেই তাদের সামনে বড় প্রেরণা আজ আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা দিবস। ১৯৬ বছরের দেশটি এবার নিয়ে ১৫ বার বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলছে। শেষবার সেমিফাইনালে উঠেছিল ৯০ বিশ্বকাপে। সাবেলা মেসির কাছে তৃতীয় শিরোপা চেয়েছেন হিগুয়েন, মেসিরা কি পারবেন। নাকি রোবেন, ফনপার্সিরা ফাইনালের টিকিট নিয়ে যাবে। ফুটবলের আসল লড়াইটা হবে আজ। দু’দলের খেলোয়াড়দের মতোই বিশ্বব্যাপী সমর্থকদেরও আশা সেটা হোক চোট মুক্ত এক সেমিফাইনাল।
* ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম সেমিফাইনাল খেলছে আর্জেন্টিনা।
* এর আগে বিশ্বকাপে তিনটি সেমিফাইনালের সবক’টিতেই জয় পেয়েছিল তারা।
* বিশ্বকাপে এর আগে আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস চারবার মুখোমুখি হয়েছিল। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডস জিতেছে দু’টি ম্যাচে, আর্জেন্টিনা জিতেছে একটিতে। ড্র হয়েছে একটি ম্যাচ।
* বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় পাওয়া ম্যাচটি ছিল ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল।
* বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা নিজেদের সর্বশেষ ১৬ ম্যাচের মধ্যে একটিতে মাত্র হেরেছে।
* বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকা দেশগুলোর বিপক্ষে নিজেদের গত ১২টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র দু’টিতে হেরেছে নেদারল্যান্ডস।
* লিওনেল মেসি এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি (১৯) গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন।
* বিশ্বকাপ আসরে এবারই প্রথম বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এক সঙ্গে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে।
* এবারের টুর্নামেন্টে ১২টি গোল করেছে নেদারল্যান্ডস। এর মধ্যে ১০টি গোলই দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় পেয়েছে তারা।
* সর্বশেষ চারটি গোল এসেছে খেলার ৭৫ মিনিট পর।
