বেসরকারি চ্যানেল এনটিভির ঈদের নাটক মানেই ভিন্ন গল্প, ভিন্ন আয়োজন। আসছে ঈদের জন্য একটি মানবসম্পর্কের গল্প নিয়ে জনপ্রিয় নির্মাতা আলী ফিদা একরাম তোজো নির্মাণ করলেন ‘পারিবারিক জীব’ শিরোনামের একখণ্ডের নাটক। এই নাটকে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন জেনি ও ইন্তেখাব দিনার। নাটক ও দুই অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ের নানা গল্প নিয়ে এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন সোহেল মামুন
একজন অভিনয়শিল্পীর বড় গুণ হলো শেখার মানসিকতা। এই ধারার শিল্পীদের মধ্যে জেনিকে একটু এগিয়েই রাখতে হবে। বেশ কয়েক বছর ধরে অভিনয় করে অনেক নাটকের জন্য দর্শকদের ভালোবাসা অর্জনের পরও এই অভিনেত্রী এখনও নিজেকে অভিনয়ের শিক্ষার্থী ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর তার এই মানসিকতার কারণেই সমসাময়িক অন্যদের থেকে তাকে সহজেই আলাদা করা যায়। নিজের ভাবনার ভিন্নতা নিয়ে এভাবেই বললেন জেনি, ‘আমি যেহেতু অভিনয় শিখে এসে টিভি নাটকে কাজ করার সুযোগ পাইনি, তাই অভিনয় করতে করতেই আমাকে তা শিখতে হয়েছে। আমি একটি নাটকে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করি, তাই পরবর্তী নাটকে কাজে লাগাই। আর আমার এই অভিনয় শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা পালন করছেন আমার সিনিয়র শিল্পীরা। আমি কাজ করতে গিয়ে একেকজনের কাছ থেকে অভিনয়ের বিভিন্ন বিষয় রপ্ত করেছি। সত্যি বলতে কী, অভিনয়টা আসলে অবজারবেশনের বিষয়। আমি প্রতিনিয়ত নানা রঙের মানুষ দেখে তাদের মাঝ থেকেই নিজের অভিনীত চরিত্রের বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করি। তবে বেশিরভাগ সময়ই চেষ্টা থাকে নিজের চরিত্রগুলোকে একটু আলাদাভাবে উপস্থাপনের। তবে সবসময়ই যে নিজের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল ঘটে তা নয়। কখনো কখনো স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার অমিল তৈরি হয়। আর এই যে অতৃপ্তি—এটাই একজন অভিনয়শিল্পীকে আগামীতে আরও ভালো কাজ করতে প্রেরণা জোগায়। আমি অভিনেত্রী হিসেবে সব সময় অতৃপ্তিকে অন্তরে পুষে রাখি।’ অন্যদিকে ইন্তেখাব দিনার তার অভিনয় জীবনে একখন্ড ও ধারাবাহিক মিলে প্রায় চার শ’র বেশি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এত চরিত্রে অভিনয় করে কেমন লেগেছে? দিনারের সাবলীল উত্তর, ‘বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে ভালো লাগে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে, তারা জীবনে নানা চরিত্রে অভিনয় করতে পারে। যা হয়তো বাস্তব জীবনে কখনো ঘটে না।’ ছোটপর্দার এই দুই ব্যস্ততম অভিনয়শিল্পী আসছে ঈদের জন্য এনটিভিতে প্রচারিতব্য ‘পারিবারিক জীব’ শিরোনামের একখণ্ডের নাটক অভিনয় করলেন। আলী ফিদা একরাম তোজোর রচনা ও পরিচালনায় এই নাটকে আরও অভিনয় করেছেন ডেইজি আহমেদ, কচি খন্দকার, শাহেদ আলী, পিদিম, আবু সায়েম ভূঁইয়া শাহীন, সালমান আল মামুন প্রমুখ। এই নাটকের গল্পে দেখা যাবে, মেহরিন-সোহান দম্পতির পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনের প্রথম পাঁচ মাস ছিলো কলহ ও মনোমালিন্যে ভরা। প্রথম পাঁচ মাসে তারা দু বার আলাদা থাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপর থেকে তাদের জীবন চলছে মধুর। যে কেউ এই দম্পতিকে দেখলে তার মনে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য, কেমন করে মানুষ এ রকম সুখের জীবন বানায়! আমরা তো পারি না! প্রথম পাঁচ মাসে দ্বিতীয় বারের মতো তারা আলাদা থাকতে শুরু করে এবং একা থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে ওঠে। হঠাত্ একদিন ইরিন হাজির হয় সোহানের কাছে সুখে থাকার এক অভিনব প্রস্তাব নিয়ে। ঢাকা শহরের একটি শান্ত এলাকায় তাদের বসবাস। বাড়ির অনতিদূরে আরেকটা বাড়ির সামনে চোখে পড়ার মতো একটা কাঁঠাল গাছ। ইরিনের প্রস্তাব ছিল, এখন থেকে প্রতিদিন বাসায় ঢোকার আগে পরস্পরের প্রতি সব ক্ষোভ, অভিযোগ, জেদ ইত্যাদি ওই কাঁঠাল গাছটার নিচে জমা রেখে এলে কেমন হয়! নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকা সোহানও বোধহয় এমন একটা আধাপাগল প্রস্তাবের অপেক্ষাতেই ছিল। নাটকীয়ভাবে সেও রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে শুরু। এরপর অনেক দিন, মাস, বছর পেরিয়ে গেছে, নিয়ম করে প্রতিদিন তারা বাসায় ঢোকার আগে কাঁঠাল গাছটির নিচে পরস্পরের প্রতি তাদের সব ধরনের ক্ষোভ-অভিযোগ জমা রেখে যায়। গাছটিও তাদের সব অভিযোগ নিজের কাছে জমা রাখে। ফলে এইদিনগুলোতে তারা পাখিদের মতো নির্ভার, প্রজাপতির মতো সুখী জীবন যাপন করে আসছিল। কিন্তু এক বিকেলে ইরিন যখন বাসায় আসছিল তখন হঠাত্ খেয়াল করে তাদের সুখে থাকার অবলম্বন কাঁঠাল গাছটা বিক্রি ফেলছে গাছের মালিক। ইরিন নানাভাবে চেষ্টা করে গাছের মালিককে গাছটি বিক্রি ও কাটানো থেকে বিরত রাখতে। গাছওয়ালার সাথে না পেরে ইরিন ও সোহান সাহায্য নেয় এলাকার মুরুব্বি ও পরিবেশবাদী এনজিওর। এলাকার মুরুব্বিরা বারবার জানতে চায় কেন তারা গাছের মালিককে গাছ কাটতে বাধা দিচ্ছে? কিন্তু তারা কোনো সদুত্তর পায় না। গাছের মালিক এনজিওকে কথা দেয়, এই একটা গাছ কাটার বিনিময়ে সে দশটা কাঁঠাল গাছ রোপন করবে। ঠিক হয়, দশটা গাছ রোপন করার পরই গাছটা কাটা হবে। পরিবেশবাদীরা সন্তুষ্ট হয়ে চলে যায়। ইরিন-সোহান দম্পতি হতাশ হয়ে পড়ে। তারা বুদ্ধি বের করতে থাকে কীভাবে গাছটা কাটা বন্ধ করানো যায়। তারা আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরিকল্পনা করে। আইনজীবী তাদেরকে কোনোভাবেই সহায়তা করতে পারে না বরং পরামর্শ দেয় সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর। শুধু আইন কেন, এই দম্পতির সমস্যার কথা যারাই শোনে তারাই মেন্টাল হসপিটালে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এক পর্যায়ে ইরিন-সোহান সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যায়। নাটকে নিজের চরিত্র সম্পর্কে জেনি বলেন, ‘এই নাটকে আমি মেহরিন চরিত্রে অভিনয় করেছি। এখানে আমি ইন্টারমিডিয়েটে পড়া একটা মেয়ে। আমাদের বাসার নিচ তলায় সোহান ভাড়া থাকে। এক সময় তার সাথে আমার প্রেম হয়। পরে আমরা পালিয়ে বিয়ে করি। আমাদের সংসার শুরু হয় কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়া। তাই সংসারে আসে নানা অশান্তি। সব মিলিয়ে নাটকে আমার চরিত্রটি বেশ মজার। এই চরিত্রে অভিনয় করে আমি আনন্দিত।’ এবার দিনার বললেন নাটকে তার চরিত্র নিয়ে। তার ভাষ্যে, ‘এখানে আমার চরিত্রের নাম সোহান। চরিত্র বেশ মজারই বলা যায়। সবচেয়ে বড় কথা অনেক দিন পর ভিন্ন ধরনের একটি নাটকের গল্প পেলাম। এরকম জীবনঘনিষ্ঠ গল্প কম পাওয়া যায়। ভালো গল্পের নাটকে অভিনয় করতে পেরে ভালো লেগেছে।’ নাটক প্রসঙ্গে পরিচালক আলী ফিদা একরাম তোজো বলেন, ‘এটা একটা মানবসম্পর্কের গল্প। যে গল্পের বাধা মানুষ নিজেই। যে গল্পের সঙ্কট তৈরি করে মানুষ নিজেই। মানুষ কেবল সঙ্কট তৈরিই করে না। সঙ্কটমোচনের চেষ্টাও করে যায় নিরন্তর। এটা সেই স্ব-সৃষ্ট সঙ্কট মোচনের চেষ্টার গল্পও। আশা করছি নাটকটি দর্শকদের ভালো লাগবে।’
