ডাই ম্যানশ্যাফট — বরাবরই একটি শক্তি হয়ে লড়াই করে জার্মানরা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচেও দেখা গেল সেই পুরনো চিত্র। ৭-১ গোলে সেমিফাইনালে ইউরোপিয়ান দলটি বিধ্বস্ত করলো সেলেচাওদের। কাঁদলেন সিলভা-লুইজরা, কাঁদলো গোটা ব্রাজিল। জার্মানির এরকম নারকীয় হয়ে ওঠার ইতিহাস অবশ্য বেশ পুরনো।
ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব হওয়ার প্রথম উপলক্ষ হিসেবে জার্মানি বেছে নেয় ১৯৫৪ বিশ্বকাপ। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সে বিশ্বকাপটি মোটেও জার্মানদের জন্য অপেক্ষা করছিল না। বিশ্বকাপটা হতে পারত ফেরেঙ্ক পুসকাস আর তাঁর ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’-এর (হাঙ্গেরি) সাফল্যগাথার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। অথচ সেটি আজও হাঙ্গেরির কাছে যন্ত্রণা, কষ্ট, আর আক্ষেপের প্রতিশব্দ মাত্র! টানা ২৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে এসেছিল পুসকাসের দল। দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০, জার্মানিকে ৮-৩ গোলে উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল তারা। এরপর দুটি বাধা — ব্রাজিল ও উরুগুয়েকে ৪-২ গোলে হারিয়ে সোজা ফাইনালে। তারপর...সে গল্পটা বড্ড বেদনাদায়ক। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে প্লে-অফ খেলতে হয়েছিল যে জার্মানির, সেই দল কিনা শেষমেষ জিতল শিরোপা! ফাইনালে আট মিনিটে ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও শিরোপাটা আর ছোঁয়া হয়নি পুসকাসদের। সে বিশ্বকাপে জার্মানরা ছাড়া বাকি বিশ্ব একমনে চেয়েছিল, বিশ্বকাপটা পুসকাসের হাঙ্গেরিই জিতুক। কিন্ত ‘নিষ্ঠুর’ জার্মানির কাছে সে চাওয়ার মূল্য সামান্যই! ওই ফাইনালটা আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ‘দ্য মিরাকল অব বার্ন’। এ নামেই ২০০৩ সালে একটি জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে।
১৯৭৪ বিশ্বকাপে রাইনাস মিশেলস ও ইয়োহান ক্রুইফের হল্যান্ড বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দিল ফুটবলে এক অনন্য নান্দনিকতার সঙ্গে। ‘টোটাল ফুটবল’ নামে খ্যাত ফুটবলের এই নান্দনিকতা মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল গোটা ফুটবল-দুনিয়াকে। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা হল্যান্ডের জন্য যে চূড়ান্ত দুর্গতি অপেক্ষা করছে ফাইনালে, সেটা কে জানত! ১৯৫৪ সালে ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’দের হটিয়ে দিয়েছিল যারা, সেই জার্মানদের ছকেই আটকে গেল দুরন্ত ডাচরা। খেলার আগেই অন্য এক খেলা খেলেছিল জার্মান সংবাদমাধ্যম। ম্যাচের আগের দিন হল্যান্ডের প্রাণভোমরা ক্রুইফকে নিয়ে এক বিতর্কিত সংবাদ ছেপে হকচকিয়ে দিয়েছেল ‘বিল্ড’। তবুও ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল হল্যান্ড। শেষ রক্ষা হয়নি তার পরও। ২৫ মিনিটেই সমতা ফেরায় জার্মানি। ৪৩ মিনিটে জার্ড মুলার বিশ্বকাপে তাঁর ১৪তম গোলটি করেন। ওই বিশ্বকাপেও জার্মানরা বাদে বাকি বিশ্ব চেয়েছিল হল্যান্ড জিতুক। ফুটবল কিংবদন্তি ক্রুইফ তো বটেই, ডাচ সমর্থকদের আজও বুকটা ভারি হয়ে ওঠে সে ফাইনালের কথা মনে করে!
১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে পরাজয়ের যন্ত্রণায় কাতর আর্জেন্টিনা কিংবদন্তি ম্যারাডোনা — রীতিমত ইতিহাসের পাতায় উঠে গেছে এই ছবিটি। তার কারণও ছিল ও জার্মান দস্যুরাই। আগের বিশ্বকাপেই (১৯৮৬) সব আলোটুকু নিজের দিকে কেড়ে নিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় শিরোপা। জার্মানরা হয়তো সেদিন ম্যারাডোনার হাসি দেখে মনে মনে বলেছিল, এর শেষ দেখেই ছাড়ব! ঠিক চার বছর পর, ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে আবারও আর্জেন্টিনা-জার্মানি। ম্যাচের আগেই আর্জেন্টিনা শিবিরে দুঃসংবাদ কার্ড ও চোটের ফাঁড়ায় নেই গুরুত্বপূর্ণ চার খেলোয়াড়। ম্যাচে দুই লালকার্ডে ম্যারাডোনার দল পরিণত হলো নয়জনে। তবুও দাপটের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু রেফারি এডগার্ডো কডেসালের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ৮৫ মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে গেল জার্মানি। আন্দ্রেস ব্রেইমের গোলে জিতে যায় জার্মানি। আগের বিশ্বকাপে বিজয়ের হাসি হাসা ম্যারাডোনাকে এবার মাঠ ছাড়তে হলো বাঁধভাঙা অশ্রু নিয়ে। ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতির মণিকোঠায় আজও ভাসে ম্যারাডোনার সেই অশ্রুসিক্ত দুই নয়ন।
সবসময় অবশ্য জার্মানী এতোটা অজেয় নয়। তাদের হারতেও দেখা যায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক আটবার ফাইনালে উঠেছে তারা। এর মধ্যে এই বিশ্বকাপ বাদে জিতেছে মাত্র তিনটি।
জার্মানরা ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছে, ১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে ও ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে পরাজিত হয়েছে। বিশ্বকাপে জার্মানদের কাছে সামপ্রতিককালের সবচেয়ে বড় ‘ট্র্যাজেডি’ ২০০৬ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ না জিততে পারা। তার পরও জার্মানরা থমকে যায়নি। বরং পূর্ণোদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিটি বিশ্বকাপে। সবসময়ই জানিয়ে দেয় শেষ না হওয়া পর্যন্ত জার্মানরা হার মানতে নারাজ।
২০১০ সালের বিশ্বকাপেও তাদের অতিমানবীয় রূপ দেখা যায়। সেই আগুনে পুড়ে আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে সেই ম্যাচের পর চাকরি চলে গিয়েছিল কোচ ডিয়েগো ম্যারাডোনার। খালি হাতে বিশ্বকাপ থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল মেসি-হিগুয়েনদের। এবারের বিশ্বকাপটাও তাদের জন্য শুরু হয় পর্তুগালের জালে চার গোল দিয়ে। আর সর্বশেষ তারা ছেলে খেলা করলো ব্রাজিলকে নিয়ে। এবার কি তাহলে ফাইনালেও অবিশ্বাস্য কোন কিছু করে দেখাবে জোয়াকিম লো’র দল? প্রশ্নের উত্তর সময়ই জানিয়ে দিবে, কিন্তু আপাতত তাদের নিয়ে যথেষ্ট ভয়েই থাকবে আর্জেন্টিনা।
