চারদিক নীরব। মনে হয় যেন মৃত্যুরা ছেয়ে ফেলেছে সব। কোনো শব্দের উচ্চকিত আড়োলন নেই। গত সাত বছরে এমন চেহারায় শহরকে দেখিনি। না, না এটা দিনের দৃশ্য নয়, রাতের কথা বলছি। আমার নাম জয়ন্ত। ওদিকে আমার হয়েছে ভীষণ কান্না কান্না অবস্থা। জন্মের সময় যেভাবে কেঁদেছিলাম, সেই ভাবে না বুঝে কাঁদছি এখন। প্রেম আছে সংসার নেই, চাকরি নেই বিয়ের বাজারও চরা। ফেউয়ের মতো কারো পিছন পিছন লেগে থাকার অদম্য অভ্যাসটা এখনো ভালোভাবে রপ্ত করতে পারিনি। না হলে আরো আগেই কিছু একটা জুটে যেত কপালে। আমার বন্ধু-বান্ধব যারা ওই সোনার হরিণ পেয়ে গেছে, তাদের প্রতি আমার একটা কথাই মনে পড়ে—‘প্রতিহিংসা আমার, আমিই তা শোধ করব’। আমার পরিবার অনেক দিন থেকে ঝামেলায় কারাবরণ করছে। সত্যি কারাবরণ নয়, এ যেন খোলা আকাশের নিচে থেকে, নিজ ঘরে থেকেই কারাবরণ। বোনটাকে বিয়ে দিয়ে বাবা সুখী হতে পারেনি। এ যন্ত্রণা কেবল বাবার একা নয়, বোনটি একা নয়, পরিবারের সবাই ভোগ করছে। আর আমি ভোগ করছি চাকরি যন্ত্রণা। কিন্তু আমি এখনো কিছুই করতে পারিনি। যদিও এখন প্রতিদিনই সাপ্তাহিক ছুটির দিন মনে হয়। শুধু চাকরির গন্ধ, ফাইলের গন্ধ পেতে ইচ্ছে করে। ছোটবেলায় যেমন শুধু জলে নামতে ইচ্ছা করত। বোন ও বোনের জামাই একসাথে থাকাটা হাস্যকর মনে হলেও নিয়তির চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেল না। তার স্বামী কাজে যায়। কিন্তু মাঝেমাঝে বাসায় ফিরে আসে না। আমি ভাবি, এ যেন ছোটবেলায় খেলতে যাওয়ার মতো অবস্থা। খেলার মাঠ থেকে না আসার ইচ্ছের মতো।
চাকরির কথা পরিচিত অনেককে বলা হয়ে গেছে।
মাঝেমাঝে বাবা গ্রাম থেকে ফোন করে বলে—
‘কত বছর হলো, এখনো কিছু করতে পারলি না।’
‘কী করব বাবা?’
‘জীবনে যা চেয়েছ তা-ই তো দিয়েছি, ঢাকায় আসতে চেয়েছ তাও দিয়েছি; না তো করিনি। বলো, বলতে পারবে করেছি?’
পড়ালেখার ইতি টেনেছি চার বছর হয়ে গেছে।
আমিও ভাবছি এসব কথা তো আমাকেই বলবে। আর কাকে বলবে!
খানিকক্ষণ চুপ থেকে মায়ের কাছে ফোনটি যায়।
‘মা, কেমন আছেন?’
‘আমি ভালো। দেখ, চাকরি-বাকরি না হলে বাবা গ্রামে চলে আয়।’
‘গ্রামে গিয়ে কী করব?’ খানিক উত্তেজিত হয়ে। মা বলে, ‘এখানে ব্যবসা করে খাবি। সমস্যা কী; চলে আয় বাবা। তোকে অনেকদিন দেখি না।’
আমি বাবার কথাগুলো, মা-র কথাগুলো আমার নিজের সাথেই নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকি। নিরাশ হয়ে। কোনো জবাব পাই না। ঠিক যেন স্মৃতিহারা মানুষের মতো। এক ভীষণ অপরাধবোধ নতুন করে মনের সামনে ভেসে উঠল। শুধু মরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মরব কী করে?
শান্তা নামের একটি মেয়ে আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে। জীবনে কোনো মেয়ের সততার কাছে যদি হেরে যাই, তা হলে ওই মেয়েটি। আমি এখনো বেকার আর সে কলেজের লেকচারার।
রাতটা ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি এগিয়ে যাচ্ছি হতাশার সাথে পাল্লা দিতে দিতে। মাঝেমাঝে ভাবি, আমার সাথে সময়ের কত অমিল, আমার সাথে পৃথিবীর কত অমিল!
একান্তভাবে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভেতরে বেদনা মাখানো বাহিরে অর্থহীন একটা হাসি হেসে ফেলি। আমার ব্যাপারে আমি এক অকপট খাঁটি মানুষ! তবু কখনো কখনো বাস্তবতার কাছে হেরে যাই, কিন্তু সততার কাছে নয়। আবার কখনো অনুভূতিহীন এক ভাসমান জীব মনে হয় আমাকে এই শহরে। তবে শহরটা ছেড়ে চলে যাবার চিন্তা এখন পর্যন্ত মাথায় ঢোকেনি। কারণ, আগামীকালের জন্য নিরন্তর অপেক্ষা। দেখি না কী হয়! হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সারা শহর। ঘুমে ক্লান্ত হয়ে আছে সারা শহর। কেউ হয়তো রাত জাগছে। রাত জাগা তারাদের মধ্যে আমিও একজন। নিজের কাছে সত্ থাকতে চাই বলে শান্তাকে জানিয়ে দিয়েছি, অন্তত একটা চাকরি না পেলে তোমাকে বিয়ে করছি না। আমি চাইনি তাকে কখনো ঠকাই। অনুতাপ কিংবা করুণার ছায়া পড়ুক কারো ওপর। অকস্মাত্ বাবার ফোন আবার। তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, শুধু ঢাকায় নয়, দক্ষিণ এশিয়ায়। নৈরাশ্য ও একটা বিরক্তির ছায়া পড়ে গেছে মুখে, অবয়বে। ‘দেখ বাবা, চাকরি যদি না হয় কিছু করার নেই। বাড়িতে চলে আসিস। এটা নিয়ে চিন্তা করিস না। দেখ কী হয়। এখন ঘুমিয়ে পড়।’
‘বাবা, আমি যতটা পারছি চেষ্টা করছি।’
চাকরি নিয়ে একটা অস্পষ্ট ধারনা এবং অবিশ্বাস কাজ করছে প্রতিনিয়ত আমার মধ্যে। সব যেন আমাকে বিপন্ন করার মতো এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখে। প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে যাই। তবু ভাবি মানুষ দ্বারা অন্য মানুষের আত্মা কোনোভাবে নিপীড়িত হবে না। না হলেই ভালো। হয়তো আরো একবার যুদ্ধে নামতে পারব। জীবন যুদ্ধে। এই যুগে ন্যায়বুদ্ধির ধারালো তরবারিটা উঠিয়ে রাখতে হয়—এতদিনে আমি তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছি। কিন্তু শান্তার কাছে প্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যে তেমন তুচ্ছতা লক্ষ করিনি। কিছুটা গতানুগতিকতা রয়েছে এটা সত্য। একদিন হয়তো মনে হবে, শান্তার সৌন্দর্য আমার কাছে অতীত হয়ে আছে। চোখে ঘুম চলে আসে। আর আইনেস্টাইনের উক্তি মনে হতে থাকে। ‘আমি কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি, সাহায্য চাইলে যারা না করেছেন, তাদের জন্যই কৃতিত্বগুলো আমার একার।’ সব কিছু বিপন্ন করার মতো। ঘুমের ঘোরে নিজেকে ভুলে যেতে থাকি। মনে হয় এখনো জীবন স্বপ্নের মধ্যে ডুবে আছে। জানালার পাশে গিয়ে রাতের বাতিটা নিভিয়ে দিলাম। বিছানায় গিয়ে নির্বোধ মানুষের মতো ঘুমানোর চেষ্টা করছি। আজ রাতেও আমার ঘুম আসছে না।
রাতের গভীরতা, ঘন হয়ে যাওয়া নিঃশ্বাসের অস্থির কথকতা পেরিয়ে, তোমাকে ভাবনার আকাশে জড়িয়ে রেখে রেখে চোখ দুটো বাস্তবতার বিরুদ্ধচারিত হতে থাকে। হতে হতে কখন যে সকাল হয়ে গেল, টের পাইনি। যদিও এ শহরের কোটি কোটি মানুষ বুঝে গেছে সকাল হওয়ার আনন্দ-বেদনা। আমি হাত-মুখ ধুয়ে চুল ঠিক করে যেই পোশাক পরতে যাব ঠিক তখনি আমার মোবাইল বেজে উঠল।
শান্তা, ফোন করেছে। কী করছ? খেয়েছ? উত্তর দিলাম না।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ওকে বললাম—‘তোমার কী মনে হয়?’
‘না খেলে খেয়ে নাও’।
‘না খেলে কি মানুষ মারা যায়?’
‘একদিন না একদিন মারা যাবে। পথই পথকে নিয়ে যাবে।’
এবার মাদার তেরেসার কথা মনে পড়ছে। ‘কিছু কিছু মানুষ আসে আশির্বাদ হয়ে, কিছু কিছু মানুষ আসে শিক্ষা হয়ে!’
সে নিশ্চয় আমার জন্য আশির্বাদ।
আমি শার্টের শক্ত কলার ঠিক করে সারা শরীরে ডিওডোরেন্ট, টাকার ব্যাগ, তালা-চাবি এবং আমার সোনালি রংয়ের হাতঘড়িটা নিয়ে বের হলাম। কিছু না খেয়েই। যদিও মনে শান্তির বাতাস বইছে না, তবু ডিওডেরেন্টের সুগন্ধ সেই মহিমা ছড়াচ্ছে। জুতার শব্দ করতে করতে খুব দ্রুত নামলাম সিঁড়ি দিয়ে। বের হতে না হতেই বাসার গার্ড মামা বলল—‘আপনার একটা চিঠি এসেছে, মামা।’ বুকে কাঁপন ধরে গেল। চিঠিটা নিয়ে আবার রুমে প্রবেশ করলাম। খুব ধীরে ধীরে। মনে হয় যেন আমি ধীর গতির এক কচ্ছপ। ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে, খামটা খুলে দেখি—অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার। ‘ও মাই গড’। আমি পুরো হতম্ভব। চোখ আমার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মুখে যেন হাসির আবির। খুঁজে পেলাম যেন এক আশ্চর্য প্রদীপ। এটা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। স্বপ্নের চেয়েও আলাদা, আবেগের চেয়েও নির্মল। তবে এটা বাস্তবতার পরীক্ষায় প্রাথমিক জয়। কারণ, মনে ছিল স্বামী বিবেকানন্দের কথা—‘আমি বিশ্বাস করি যে, কেউ কিছু পাওয়ার উপযুক্ত হলে জগতের কোনো শক্তিই তাকে বঞ্চিত করতে পারে না।’
দুই.
‘বাবা আমার হয়ে গেছে।’
‘কী হয়েছে তোমার?’
‘চাকরি হয়ে গেছে?’
‘কী বলো? ভালো। কবে থেকে জয়েনিং? আগামীকাল থেকে?’
‘বাবা, আর চিন্তা করো না...।’
যদিও চাকরিতে আমার কখনো আগ্রহ তেমন প্রবল ছিল না। ছোটবেলায় ভাবতাম, চাকরি মানে অন্যের গোলামি করা। আমার বাবা-দাদারা কেউ চাকরি করেনি। আমাকে ঠিক তার উল্টো বিষয়ের জন্য দৌড়াতে হলো। তাও আবার পড়ালেখা করে। সার্টিফিকেট অর্জন করে। একদিন না একদিন আমাকে তা করতেই হতো। ঠিক যেন প্রতিদিন ভাত খাওয়ার মতো। চিরদিন এভাবে থাকতে পারে না কেউ। আমি যেন এসব বলেও নিজের সাথে নিজে সাহস দেখাচ্ছি এবং প্রতারণা করছি। তবু মন যেন চারদিকে ইতস্তত ছড়ানো জিনিসপত্রের ভেতর থেকে প্রতিদিন পাঠ করা গীতা গ্রন্থখানি নিয়ে প্রার্থনা করতে লাগল। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। মন ধর্মে আকৃষ্ট হতে শুরু করল। আমি তো আর নিজের জন্য একা বাঁচি না। কেউই নিজের জন্য একা বাঁচতে পারে না।
এরপর মন চাইল শান্তার কাছে যাই। তার নরম গলায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চুলে, কপালে, গালে ও ঘাড়ে চুমু খাই। আবার আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। গাছ, পাখি, চাঁদের সাথে কথা বলার কথা মনে পড়ছে। সেই কথা এখন আর হয় না। এখন শুধু কথা হয় ইট, কাঠ, পাথর ও প্রেমিকার সাথে। তেমন কথা হয় না মায়ের সাথে। কিন্তু ছোটবেলায় আমার মায়ের উজ্জ্বল হাসির ছোঁয়া, পাখির ওমের মতো মায়ের বুক—সব লেগে আছে আমার শরীরে, হূদয়ে। বারবার মনে ওঠে ভুল করার কথা, মায়ের কথা না শুনার কথা। এখন তো সবার কথাই শুনতে হবে। মা, সব সহ্য করে ক্ষমা করে দিতেন। ভালোবাসা ছাড়া কি ক্ষমা করা যায়! মা, বাবা, সঙ্গী ক্ষমা করেছেন। এখন দেখি অফিস আমার কোনো ভুল ক্ষমা করে কি না! দেখি চিঠিটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে আছে টেবিলের ওপরে। খানিক আগেও যার গুরুত্ব ছিল আকাশসম। অক্ষরগুলো তার শরীর জুড়ে লেগে আছে। আমি লেগে আছি শান্তার মনে। হঠাত্ বাড়ির নিচে কান্নার শব্দ শোনা গেল। কে যেন বলছে—
গত তিন-চার দিন ভাত খাইনি। আমাকে কেউ দুইটা ভাত দিবেন? বলেই অঝোরে কান্না। কান্নার শব্দ যেন আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় আমি যখন চার বছরের, মাংস খাওয়ার স্বাদ পাইনি, সে কথা মনে পড়ে যায়! আহ! কী শান্তি! আহ! কী কষ্ট!
সে সব এখন অতীত। আমার যেন অতীত স্মৃতির প্রতি করুণায় মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে—লজ্জায়, আবেগে, ব্যাথায়। মনে হয় পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা কতটা সুখকর, কতটা নিরানন্দের। আমার আদি পুরুষরা তাহলে কতটা কষ্ট করেছে। ভাবতেই কেমন জানি শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। এখন তো নৃত্যরত নদীর মতো বয়ে চলব। কিন্তু আমার ঘরটা হয়ে গেছে পরিত্যক্ত ডাস্টবিনের চেয়েও খারাপ। সব অগোছালো। ও একবার এসে খুব বিরক্ত হয়েছিল। নিজেকে না গোছানার ভারটা যে কী রকমের তা শ্রীহীন ঘরের মধ্যে অনুমান করেছিল শান্তা। চাকরিহীন গতিহীন চলতে থাকলে হয়তো একসময় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতাম। কয়েকবার মৃত্যুচিন্তা মাথায়ও এসছিল। যখনই বাবা, মা ও শান্তার মুখগুলো ভেসে উঠত স্পষ্ট তখন কেন জানি সব যাতনায় শুধু পানি নয় বরফ ঢেলে দিত বিধাতা। আমি যেন বিধাতার সামনে পড়ে যাই ভুল করে! হাসি আসে, দুঃখ আসে। দুঃখের ভাষা প্রকাশ করতে পারিনি কখনো—এক আমি আমার আমিকে আর ও ছাড়া কাউকে। কিন্তু আমি কষ্টকে কখনো অবহেলা করিনি। নিজের মনে হয়েছে। মাঝেমাঝে নিজেকে নিজের কাছেই নিদারুণ বোকা মনে হয়েছে। একদিন ধরে নিয়েছিলাম, সব ঠিক হয়ে যাবে, সব সত্যি ঠিক হয়ে যাবে। যেমন ঠিক ছিল আমার জন্মকথা। যদিও আমার নিজস্ব শক্তি ও উত্তাপ এতদিন কোনো কাজে লাগেনি। শুধু একটা চাকরির জন্য!
কলেজে পড়া অবস্থায় উচ্ছৃঙ্খল স্বভাব, অল্প বয়স বারবার প্রেমের মোহে কাটাবার জন্য রেজাল্টের কিছুটা ক্ষতিও করে ফেলি। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পকেট ভারী বেতন দেবার প্রতিশ্রুতি পেয়ে আগামীকাল অফিসে যাব। শান্তার চাকরি, তার পরিবারের অর্থ-সম্পদের কাছে আমার দৈন্যের কথা খুঁজে চলি। কারণ, তার তুলনায় আমার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। তার চরিত্রের উদারতা নতুন করেই শেখায়। শেখার শেষ নেই। জন্ম থেকে শিখছি।
পরেরদিন সকালে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। ঢাকায় যে অসহ্য গরম, যে অসহ্য জ্যাম। তাতে মনে হয় অফিসে যথাসময়ে পৌঁছা অনেক কষ্টকর হয়ে যাবে। মাঝেমাঝে ঢাকাকে আমার কাছে মরুভূমি মনে হয়। আমি তো ঈশ্বরকে এখনো ভালোবাসি। রোজ যেমন ভালোবাসি তেমন। আজ ভুল করে সকালে প্রার্থনা করা হয়নি। তাই ভাবলাম। আমি কি ঈশ্বরকে ভালোবাসতাম! আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে শান্তার সাথে কথা বলা হয় নাই। তাই ভাবি। আমি কি শান্তা তোমাকে ভালোবাসি? না, ভালোবাসতে ভুলে গেছি!
অফিসে ঢুকতে না ঢুকতে শান্তার ফোন। প্রথম দিন বলে ফোনের সংযোগটা কেটে দিলাম। অফিসে বসে ফাইলের গন্ধ, চাকরির একটা নতুন ঘোলাটে গন্ধ আমাকে চারদিক থেকে ছেয়ে ফেলেছে। কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেছে তা অনুমান করতে পারিনি।
অফিস শেষ হলে আবার শান্তার ফোন।
‘এই তুমি কই? ফোন ধরো না কেন?’
‘দেখ, চাকরি আমায় ভালোবেসে ফেলছে, আমাকে খেয়ে ফেলছে।’
‘কী বলো, এইসব! ভাত খেয়েছ দুপুরে?’
‘হ্যাঁ, খেয়েছি, তুমি?’
‘এই রাখো তো একটু। বস ফোন দিয়েছে’
‘আচ্ছা। রাতে কথা হবে।’
বসের কথাগুলো শুনতে শুনতে আস্তে আস্তে ক্লান্ত শরীর, কিন্তু আনন্দময় একটা দিন নিয়ে আমার একমাত্র আশ্রয় ঘরটির দিকে চললাম। রিকশা করে। আমি বুঝে ফেলি আমার অবস্থা কী। কিছুটা অনুতাপ হয়। তবু ভাবি, চাকরি না করার চেয়ে করাই ভালো।
ঢাকা শহরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আমার চিন্তাভাবনা যেন কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
