সম্পা আক্তার বাস করেন পাগলা নন্দলালপুরে। বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর। তিন সন্তানের জননী। তিনি জানান, তার কোন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। ভাবীর কথামতো দু/চার প্যাকেট খাবার বড়ি খেয়েছেন। তাতে মাথা ঘোরে, কেমন ভয় করে। এলাকায় কেউ কোনদিন বড়ি খেলে কেন মাথা ঘোরে বা কোন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ভাল-তা বলেনি, কোন মাঠকর্মী কোন উপকরণ বিতরণ করেনি। কামরাঙ্গীর চর এলাকার আফিয়া বেগম দুই বছর আগে কপারটি পরেছিলেন, কিন্তু মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও ব্যথা হওয়ায় তা খুলে ফেলেন। তিনি আর কোন পদ্ধতিতে আগ্রহী নন। রংপুর তারাগঞ্জের মোমেনা তিন বছরের জন্য জন্ম প্রতিরোধক ইজেকশন নিয়েও গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তাই আর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করেন না। পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতিগুলো নিয়ে জনমনে বাড়ছে ভীতি। এমন সব বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস।
বাংলাদেশ সরকার পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির জন্য বিশ্বময় প্রশংসিত হয়েছে। এজন্য ১৯৮৭ সালে অর্জন করেছে জাতিসংঘ পুরস্কার। বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শদানের অভাব, উপকরণ বিতরণে অপ্রতুলতা প্রভাবিত করতে পারে বাংলাদেশের এই অর্জনকে। তাই এখনই সতর্ক হওয়ার তাগিদ দেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিজ্ঞজনেরা। সরকারি হাসপাতালের আন্তরিকতা, মাঠকর্মী বৃদ্ধি ও নতুন নীতিমালার প্রয়োজন বলেও তারা উল্লেখ করেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসূত্রে জানা যায়, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণকারীর হার ১৯৭৫ সালের ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০১০ সালে ৬১ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এই হার সন্তোষজনক নয়। ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ দম্পতির মধ্যে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে বলে জানান বিশিষ্ট জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম নুরুন্নবী। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও সিটি কর্পোরেশন শহর ও প্রান্তিক এলাকায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। কর্মসূচির ৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করে সিটি কপোরেশন। এখানে লোকবলের অভাব মাঠ পর্যায়ে সঠিক ধারণা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দিতে ব্যাঘাত ঘটায়। যখন পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল তখন তিনশ’ জনকে সেবা দেয়ার জন্য একজন মাঠকর্মী কাজ করতেন। এখন প্রায় ২২শ জনের জন্য রয়েছে একজন মাঠকর্মী। ফলে একজন মাঠকর্মী এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে পারছে না। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিসাব মতে প্রতিদিন জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসাবে গড়ে ২০ জন বড়ি গ্রহণ করে, ইনজেকশন নেয় ১৫ জন, কনডম গ্রহণ করে ১৫ জন। কপারটি, লাইগেশন, ভেসেকটমি প্রভৃতি দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণে গড়ে দুই/একজনও পাওয়া যায় না। অথচ পুরান ঢাকা ও বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী বিপুল মানুষ এই হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা নেয়। এ সকল স্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণে সরকারের পক্ষ থেকে সেবা গ্রহীতা ও চিকিত্সককে একটি ভাতা দেয়া হয়, যা অনেকেই জানে না। এ ব্যাপারে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. নূর হোসেন তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, তাদের নতুন কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন মাঠকর্মী কাজ শুরু করলে অনেক সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তাদের যে লোকবল ও বাজেট আছে তা দিয়েও অনেক কাজ করা সম্ভব। অনেক মাঠকর্মী মাঠে যায় না। তারা সেই সকল মাঠকর্মীর তালিকা করছেন। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
