মন্দায় পড়ে ব্রিটেনে প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৪, ২০:১০
ব্রিটেনে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায়। ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৪৮ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ভোট দিয়েছিল এ দলটিকে। পরবর্তীতে বিশ্লেষকরা এর কারণ ব্যাখা করেছিলেন এভাবে— টিউশন ফি বাড়ানো হবে না, লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের এমন প্রতিশ্রুতি টনিকের মতো কাজ করেছিল। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থাটা একটু চিন্তা করুন। ব্রিটেন ২০১০ সালেই প্রত্যক্ষ করে ছাত্র প্রতিবাদ এবং ২০১১ সালের গ্রীষ্মকালে হয় দাঙ্গা। এ দুটি ঘটনার মূল কারণ ছিল, ক্ষমতায় বসার পরপরই টিউশান ফি ৩০০ শতাংশ বাড়ানো, যাতে ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল ছাত্রদের। তরুণরা এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে যারপরনাই হতাশ। বেকারত্বের উচ্চহার, শিক্ষার পেছনে বরাদ্দ কমে যাওয়া, ছাত্র সুবিধার বিনিময়ে কাজ বাধ্যতামূলক হওয়া এবং গৃহায়নের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হওয়ায় ১৯ থেকে ৩৫ বছর বয়সী লোকজনের কাছে লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা দ্রুত কমেছে। একের পর এক তরুণদের স্বার্থ-বিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে ব্রিটেনের বর্তমান সরকার। তবে স্বপ্রণোদিত হয়ে এমন কাজ খুব কমই করছে তারা। কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির সংসদ সদস্যরা ক্রমাগতই তাদের চাপ দিয়ে যাচ্ছে তরুণ কল্যাণ তহবিলে কাটছাঁট করার বিষয়ে। তাদের অনুপ্রেরণা পেয়েই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১৩ সালের কনজারভেটিভ কনফারেন্সে ২৩ অনূর্ধ্বদের জন্য গৃহায়ণ সুবিধা কমিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করেন। লেবার পার্টি নেতা মিলিব্যান্ডও একই সুরে কথা বলেছিলেন কিছুদিন আগে। অতিসম্প্রতি তিনি প্রশিক্ষণে না থাকা তরুণদের আউট-অফ-ওয়ার্ক বেনিফিট কমিয়ে দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংবাদ সম্মেলন করে। ধারনা করা হচ্ছে, এটি বাস্তবায়িত হলে আরেক দফা ছাত্র বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে। এর আগে টিউশন ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা প্রিন্স চার্লসের গাড়ি বহরে পর্যন্ত হামলা চালিয়েছিল। সপ্তাহ খানেক আগে ব্রিটেনের বিখ্যাত দ্য মেইল পত্রিকা সম্পাদকীয়তে লিখে, তরুণদের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের আচরণ রুক্ষ ও পরিহাসমূলক; ওয়াই জেনারেশনের (১৯ থেকে ৩৫ বছর বয়সী) কথা তাদের মাথাতেই নেই। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এখন যাদের বয়স ১৭ থেকে ২১, তাদের ৫৯ শতাংশই ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভোট দেবে না। তারা মনে করে, রাজনীতিবিদরা বড় ব্যবসায়ী, পেনশনার ও সেলিব্রেটিদের কথাই বেশি ভাবে। তাদের কল্যাণের জন্য ভাবার মতো সময়ই নেই রাজনীতিবিদদের। আজকের তরুণদের ৫৪ শতাংশ ভাবছে, তারা তাদের পিতামাতার চেয়ে খারাপ জীবনযাপন করবে। এমন মনে করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। ব্রিটেনে টানা ২৫ বছর মজুরি বৃদ্ধির পর ২০০৯ সাল থেকে তা কেবলই কমছে। ২০০৮ থেকে ২০১২ এ-সময়ে বয়স বিশের ঘরে এমন লোকদের মধ্যে আয় কমেছে ১২ শতাংশ। অথচ এ সময়ে পেনশনভোগীদের পেছনে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ২০১৩ সালে সরকার পেনশনের পেছনে খরচ করেছে ২৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ব্রিটিশ পাউন্ড। বেকারত্ব, পরিবার, শিশু ও শিক্ষার পেছনে সম্মিলিতভাবে এর অর্ধেকও খরচ করা হয়নি। ইদানীং অনেক নতুন চাকুরি সৃষ্টি হচ্ছে সত্য; কিন্তু এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ তরুণ-তরুণী কাঙ্ক্ষিত কাজ করছে না কিংবা বেকার। তাদের দিনকাল ভাল কাটছে না। এ অবস্থায় ২১ বছরের কম বয়সীদের বেকারত্ব সুবিধায় সংস্কার আনার প্রস্তাব করেছে ব্রিটিশ সরকার। যার মাধ্যমে প্রতিবছর বাঁচবে ১১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ব্রিটিশ পাউন্ড। এ সম্পর্কে কিথ মিলার নামক এক যুবক বলছিলেন ‘কর্তনের পর কর্তন চলছে আমাদের বিষয়ক তহবিলগুলোতে। কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত কোন তহবিলের পরিমাণ কী দাঁড়ায়, তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। বর্তমান অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, খরচ সামলাতে গিয়ে আমরা খাবি খাচ্ছি। রাজনৈতিক শক্তি সামনের দিনগুলোতে হয়তো আমাদেরকে আরো বেশি কোণঠাসা করে ফেলবে। মোদ্দাকথা, তরুণ প্রজন্মের কথা ভাবার মতো সময়ই নেই রাজনীতিবিদদের হাতে। দেশের ঋণ ও ঘাটতি ক্রমশই বাড়ছে। তরুণরা অবহেলিত হলেও বৃদ্ধদের কল্যাণের জন্য সরকার ঋণ করছে। ভবিষ্যতে এ ঋণ আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে, এ বিষয়টি হয়তো অনেকের মাথাতেই নেই। কিন্তু এখন আমরা অবজ্ঞার শিকার হচ্ছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বৃদ্ধদের কল্যাণের বিরোধী নই এবং হওয়া উচিত বলে মনেও করি না। তবে নতুন প্রজন্মের সুযোগ-সুবিধাকেও প্রাধান্য দিতে হবে।’ তরুণদের মাত্র ২৫ শতাংশ সরকারের বর্তমান কল্যাণ পদ্ধতিকে সমর্থন করে। বাকি ৭৫ শতাংশই চায়, সরকার বৃদ্ধদের কথা একটু কম ভেবে তাদেরকে প্রাধান্য দিক। অবস্থাটা এরকম দাঁড়িয়েছে যে, একপ্রকার প্রজন্মগত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি ব্রিটেন। এক পক্ষকে খুশি করতে গিয়ে বেজার হচ্ছে আরেক পক্ষ। —আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে