বিশ্বব্যাংকের বিকল্প একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশ চীন। প্রস্তাবিত এশিয়ান ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) নামের এ ব্যাংকটি হবে পশ্চিমা বলয় মুক্ত। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চীন চাইছে এমন একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ব্যাংক গড়ে উঠুক যেখানে পশ্চিমা আধিপত্য কম হবে এবং চীন নিজেই তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে আশার কথা হলো চীনের প্রস্তাবে ২২টির অধিক দেশ এ ব্যাংকে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। দেশগুলোর তালিকায় তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপানও রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সড়কের উন্নয়নসহ প্রতিবেশীদেশগুলোর সাথে যোগাযোগে মনযোগী হবে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে বেইজিং থেকে ইরাকের বাগদাদ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগটি হয় ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে। এই ব্যাংকের ৫০ ভাগের মালিকানা থাকবে চীনের হাতে। ইতিমধ্যে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকেও আমন্ত্রণ জানালে তাকে স্বাগত জানাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ব্যাংকটি শুধু বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগী হবে না, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককেরও (এডিবি) প্রতিযোগী হয়ে উঠবে। এদিকে বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিম গত সপ্তাহে তার চীন সফরে বলেছেন, প্রস্তাবিত এশিয়ান ইন্ফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) হবে দারিদ্র্য নির্মূূল এবং বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্বমূলক সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার নতুন শক্তি। এ উদ্যোগকে বিশ্বব্যাংক স্বাগত জানায়। প্রতিবছর উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ খাতে বিশ্বব্যাংক গত বছর ৬০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। বেসরকারি খাতসহ এর মোট পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রকৃত চাহিদার অনেক কম। বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, এ জন্য এআইআইবির মতো নতুন প্রতিষ্ঠানকে স্বাগত জানাই। কারণ অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন অনেক। নতুন ব্যাংক চালু হলে তাদের সঙ্গে আমরা সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারি। কারণ আমাদের শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য। আমাদের এ শত্রু প্রবৃদ্ধির পরিপন্থী।
বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ থাকার পরেও এ ধরনের ব্যাংক গঠনের প্রয়োজনীয়তা কী হতে পারে, এমন প্রশ্নের উদ্ভব হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সমপ্রতি জিডিপি’র আকারের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীন বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাপানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। তার পরেও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপানের চেয়ে বিশ্বব্যাংক কিংবা আইএমএফ এ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পিছিয়ে রয়েছে চীন। বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ভোট দেয়ার ক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্যের থেকেও কম ক্ষমতা রয়েছে চীনের। বলতে গেলে দ্বিতীয় সারির ভোটার হওয়ায় বিশ্বব্যাংকে চীনের ক্ষমতা অনেক কম। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে চীনের মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১৫.৭ শতাংশ এবং জাপানের রয়েছে ১৪.৬ শতাংশ শেয়ার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) চীনের জন্য রয়েছে ৪ শতাংশ কোটা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রয়েছে ১৮ ভাগ কোটা। সবমিলিয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হওয়ার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন।
