সেমিফাইনালে বিদায়ের পরপরই নেদারল্যান্ডস দলের কাছ থেকে একটা আপত্তির রব উঠেছিল। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটা কেমন যেন অর্থহীন ঠেকছিল লুই ফন গাল কিংবা অ্যারিয়েন রোবেনদের কাছে। আর সেই ম্যাচটাকে কমলা জার্সিধারীরা যে রীতিমত বৃদ্ধাঙ্গুলিই দেখালো। এক তরফা ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে দিল তারা।
সান্ত্বনাটুকুও জুটলো না ব্রাজিলের, নেদারল্যান্ডসের কাছে ৩-০ গোলের হারে উল্টো জুটলো দর্শকদের দুয়ো। অন্যদিকে হাসিমুখে মাঠ ছাড়লো নেদারল্যান্ডস। শেষটা ভাল হওয়ায় কিছুটা স্বস্তির সুবাতাস নেদারল্যান্ডস শিবিরে। ম্যাচ শেষে অ্যারিয়েন রোবেন বলেন, ‘শেষটা আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল। সুন্দরভাবে বিশ্বকাপটা শেষ করতে পেরেছি আমরা। তাই বলে এক ম্যাচ দিয়ে সেমিফাইনালে হারের হতাশাটা মুছে ফেলা যাবে না। আমাদের ফাইনাল খেলার লক্ষ্য ছিল।’
নেদারল্যান্ডসের রবিন ফন পার্সি ও ডালে ব্লিন্ড ম্যাচের শুরুর দিকে গোল করে ব্রাজিলকে জার্মান-লজ্জার কথা মনে করিয়ে দেন। আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এই ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ভাইনালডামের গোলে মাথা হেট করেই মাঠ ছাড়ে সেলেচাও দল। ১৯৪০ সালের পর এই প্রথম দেশের মাটিতে টানা দুই ম্যাচে হারল ব্রাজিল। সেবার আর্জেন্টিনার কাছে ৩-০ গোলের হারের পর উরুগুয়ের কাছে ৪-৩ গোলে হার মেনেছিল ব্রাজিল।
গত শনিবার ব্রাসিলিয়ার স্ট্যাডিও ন্যাসিওনালে তৃতীয় মিনিটেই পেনাল্টি থেকে গোল করে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে নেন ফন পার্সি। দ্বিতীয় মিনিটে ডি বক্সে অ্যারিয়েন রোবেনকে ব্রাজিলের অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ডাচরা।
বাঁ দিকে ঝাঁপালেও ফন পার্সির শট ঠেকাতে পারেননি জুলিও সেজার। খেলার বয়স তখন মাত্র ২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড। ষষ্ঠ মিনিটে প্রথম আক্রমণটি গড়ে ব্রাজিল। বাম দিক থেকে অস্কারের চমত্কার ক্রসটি অল্পের জন্য নাগালে পাননি রামিরেস।
সেমিফাইনালে রক্ষণভাগের সীমাহীন ব্যর্থতায় জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হারের দুঃস্বপ্ন ১৭তম মিনিটেই মনে করিয়ে দেন ডেভিড। ডান প্রান্ত দিয়ে ইয়োনাথন ডি গুজম্যানের ক্রস হেড করে বিপদমুক্ত করতে গিয়ে ব্লিন্ডের পায়ে তুলে দেন লুইজ।
ডি বক্সে বাঁ পায়ে বল নামিয়ে ডান পায়ের জোরালো শটে বল জালে জড়ান ব্লিন্ড। বিশ্বকাপে এটাই তার প্রথম গোল। ৩৮তম মিনিটে ব্যবধান কমানোর একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় ব্রাজিলের। ডান দিক থেকে অস্কারের একটি ফ্রি-কিকে ডি বক্সে লুইস গুস্তাভো মাথা ছোঁয়ানোর পর জালের সামনে বলে পা লাগাতে পারেননি পাওলিনহো ও লুইসের কেউই।
খেলায় ফিরতে দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া ছিল ব্রাজিল। বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও একটিও কাজে লাগাতে পারেননি অস্কার, জো, হাল্করা।
যোগ করা সময়ে ভাইনালডামের গোলে ব্রাজিলকে আরো বড় লজ্জায় পড়তে হয়। রোবেনের বাড়ানো বল থেকে ডারিল ইয়ানমাতের ক্রসে অরক্ষিত পিএসভি মিডফিল্ডার সহজেই বল জালে জড়ান।
ব্রাজিল দলের শুরুর একাদশে ছয়টি পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারি, কিন্তু সাফল্য আনতে পারেনি। তবে নিজেদের কিছুটা দুর্ভাগা ভাবতেই পারে ব্রাজিল। ডাচদের ডি বক্সে রুন ভ্লারের একটি হ্যান্ডবল নজর এড়িয়ে যায় রেফারি জামেল হাইমুদির। পরে অস্কারকে ফাউল করা হলে পেনাল্টি না দিয়ে উল্টো ডাইভের অভিযোগে তাকে হলুদ কার্ড দেখান আলজেরিয়ার এই রেফারি।
সতীর্থদের উত্সাহ দিতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ব্রাজিলের সেরা তারকা নেইমার। চোটের কারণে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়া বার্সেলোনা তারকাকে মাঠে বসেই দলের পরাজয় দেখতে হল।
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল খাওয়া দলটি হল ব্রাজিল! শেষ দুই ম্যাচেই দলটিকে নিজেদের জাল থেকে ১০ বার বল কুড়িয়ে আনতে হয় দলটিকে। সব মিলিয়ে ১৪ বার ব্রাজিলের জালে বল জড়িয়েছে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা।
পরিসংখ্যান দেখলে নেদারল্যান্ডসের জন্য সহজ একটা ম্যাচ বলে মনে হলেও রোবেন মোটেই ম্যাচটিকে সহজ বলে মনে করছেন না। তার ভাষায়, ‘এটা আমাদের জন্য মোটেই সহজ কোন ম্যাচ ছিল না। আগের ম্যাচের হতাশা ছিল। সেই দুঃখ ভুলে ভাল খেলাটা আমাদের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা সেই চ্যালেঞ্জে সফল হয়েছি। তাই দল নিয়ে আমি গর্বিত। সবার সাথে মাঠে একসাথে খেলাটা সত্যি দারুণ উপভোগ্য ব্যাপার।’
গতবার ফাইনালে খেলা নেদারল্যান্ডস এবার অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ শেষ করলো। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের পর দ্বিতীয় রাউন্ডেও জেতে লুইস ফন গালের দলটি। কোয়ার্টার-ফাইনালে কোস্টা রিকাকে টাইব্রেকারে হারানোর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় দলটি। তবে রেকর্ডবুকে তা থাকবে ড্র হিসেবেই।
নেদারল্যান্ডসের কোচ হিসেবে এটাই ছিল ফন গালের শেষ ম্যাচ। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্ব নিতে যাওয়া এই কোচ ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তৃতীয় গোলরক্ষক মিশেল ভর্মকেও বদলি হিসেবে নামান। ফলে এই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস দলের ২৩ খেলোয়াড়েরই মাঠে নামা হলো।
