নক্ষত্রের পতন হয়তো একেই বলে! ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তিদের তালিকায় ছিল তার নাম। তবে, টানা দু’ম্যাচ হেরে দেশের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক বিদায় নিশ্চিত হবার পর এবার মুদ্রার অন্য পিঠটিও দেখতে হচ্ছে লুইস ফেলিপে স্কলারিকে। জার্মানির কাছে সেমিফাইনালে বিধ্বস্ত হবার পর এবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের কাছে বড় ব্যবধানে হারতে হলো ব্রাজিলকে। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের করুণ মৃত্যুর পর স্কলারি স্বীকার করে নিয়েছেন, ব্রাজিলের দায়িত্বে ভবিষ্যতে থাকতে পারবেন কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি। কেবল ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন্স চাইলেই থাকা হতে পারে তার। যদিও সে রকম কিছু হবার সম্ভাবনা কমই দেখা যাচ্ছে।
২০১২ সালে মানো মেনেজেসের স্থলাভিষিক্ত হবার সময়ই বোঝা যাচ্ছিল, নিজের কিংবদন্তি সত্তাটাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে যাচ্ছেন স্কলারি। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জিতলে সর্বকালের সেরা কোচদের তালিকায় উঠে যাবে তার নাম, প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানের চোখে তিনি হয়ে উঠবেন অবিসংবাদিত এক নায়ক। আর হারলে নিক্ষিপ্ত হবেন কলঙ্কের আস্তাকুঁড়ে; স্কলারির সামনে সমীকরণটি ছিল এমনই।
সব কিছু জেনে বুঝেই সেই ঝুঁকিটি নিয়েছিলেন ব্রাজিলকে ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জেতানো এই কোচ, ‘খেলোয়াড়রা জানে তাদের বিশ্বকাপ জিততে হবে। ব্রাজিলে একটা টুর্নামেন্ট হবে আর আমরা সেখানে দ্বিতীয় হবার জন্য খেলবো; এমনটা ভাবাই অসম্ভব।’ বছরখানেক আগে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের সাথে এক সাক্ষাত্কারে স্কলারি বলেছিলেন এমনটাই।
সব কিছু চলছিল ঠিকভাবেই, গত বছর কনফেডারেশন্স কাপে ব্রাজিলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সমর্থকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পায় নতুন মাত্রা। অবশ্য দেশের বাইরে যেই দেশ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে, সেই দেশ নিজের মাটিতে বিশ কোটি স্বদেশবাসীর সামনে বিশ্বকাপ জিতবে এমন প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অমূলক নয়! স্কলারির বিশ্বাস জার্মানির বিরুদ্ধে শেষ চারের ম্যাচের আগে ঠিকভাবেই চলছিল সবকিছু। তবে স্বাগতিক দেশ হিসাবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল হজমের লজ্জাজনক রেকর্ড গড়ে বিদায় নেয়ার পর এখন আর পুরনো কথা ভাবতে নারাজ তিনি। পর্তুগালকে ২০০৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলা এই কোচ তবু শেষ পর্যন্ত থাকতে চাচ্ছেন ইতিবাচকই, ‘আমি আসলে বেশ কিছু ইতিবাচক ব্যাপার দেখছি। ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন হবার পর এবারই কেবল আমরা শীর্ষ চারে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করতে পেরেছি।’
পাশাপাশি এই দলটি রাশিয়ায় আগামী বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যের সম্মিলনে শক্তিশালী একটা দলে পরিণত হবে বলেও দাবি করলেন তিনি। যদিও বর্তমান দলের কেবল নেইমার, বার্নার্ড, অস্কার, উইলিয়ান এবং পলিনহোর বয়সই কেবল তখন ত্রিশের নিচে থাকবে।
গত এক যুগে এবারই ব্রাজিল বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা ফল দেখালেও সেটা যে তার চাকরি বাঁচাবার জন্য যথেষ্ট নয়, স্কলারি বুঝতে পারছেন সেটাও। তাই নিজের ভবিষ্যত্ ছেড়ে দিয়েছেন সিবিএফ’র হাতে।
বিশ্বকাপে ভরাডুবির জন্য ব্রাজিল দলে ভবিষ্যত্ নিয়ে যখন সন্দেহ দেখা দিয়েছে, তখন ৬৫ বছর বয়সী স্কলারি জানালেন, ব্রাজিল দলের কোচ থাকার ব্যাপারটি এখন তার নিজের হাতে নেই। তবে বোর্ড চাইলে থেকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ভবিষ্যত্ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি সিবিএফ (ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন) প্রেসিডেন্টের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। আমি তিনটি বিশ্বকাপে কোচিং করেছি। প্রত্যেকবারই সেরা চারে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছি।’
এর আগে স্কলারির তত্ত্বাবধানে ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। এরপর ২০০৬ সালেও পর্তুগালের বিশ্বকাপ দলের কোচ ছিলেন তিনি। ওই আসরেও তার তত্ত্বাবধানে চতুর্থস্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করে পর্তুগিজরা। দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান আসরে বিশ্বকাপ জেতানো স্কোলারি ২০১২ সালে পুনঃরায় ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন। গত বছর তার তত্ত্বাবধানে কনফেডারেশন্স কাপও ঘরে তুলে সেলেসাওরা। ফলে এবারের বিশ্বকাপে স্বাগতিক ব্রাজিলের ওপর প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। যদিও প্রত্যাশার চাপ সামলে আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেনি স্কলারির শিষ্যরা।
জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৭-১ গোলে হারার পর শনিবার তৃতীয়স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও নেদারল্যান্ডসের কাছে হারতে হয়েছে তাদের। দলের এই পরাজয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি স্কলারি। জানালেন স্ট্যাডিও ন্যাশিওনালে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে ব্রাজিল ভালো খেলেছে তার দল, ‘আমি মনে করি, আমরা খারাপ খেলেনি। এটা অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ খেলা ছিল। কিন্তু শুরুতেই আমরা একটি গোল হজম করে ফেলেছিলাম। আমি মনে করি, এমন পারফরম্যান্স দেখানোয় খেলোয়াড়রা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।’—এএফপি/ ওয়েবসাইট
