অভাবনীয়, অসাধারণ, অবিশ্বাস্য!

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২০:৩৯
দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছিল, ছিল সরকারের প্রতি তীব্র অসন্তোষ, অবকাঠামো গুলো বিশ্বকাপের ক’দিন আগ পর্যন্ত পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠানো যায়নি। কিন্তু একবার বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই যেন বদলে গেল দৃশ্যপট। সেই দেশটির নাম ব্রাজিল। ফুটবলটাই এখানে যেন ধর্মের মত। বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেশটির রাষ্ট্রপতি দিলমা রৌসেফ বলে রেখেছিলেন, ‘ফুটবলের জন্ম ইংল্যান্ডে হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু এর বাসস্থান এই ব্রাজিলেই।’ দীর্ঘ এক মাসের ফুটবলের মহোত্সব কি সেটাই আবারও প্রমাণ করে দিল না? বিক্ষোভের রাজপথ ছেড়ে ব্রাজিলিয়ানরা ভীড় জমিয়েছিলেন স্টেডিয়ামের গ্যালারিগুলোতে। পুলিশের টিয়ার গ্যাস নয়, ফুটবলের জাদুতেই যেন শান্ত হয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল। সেই মহোত্সবের ইতি ঘটেছে। এক মাস লাগাতার বিনোদনের পর চলে গেল বিশ্বকাপ — ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর। কোলাহলটা তাই যেন হঠাত্ করে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ফাঁকা হতে শুরু করেছে দীর্ঘ এক মাস ধরে নানা আবেগের জন্ম দেয়া শহরগুলো। চ্যাম্পিয়ন দল জার্মানির বিজয় মিছিল থেমে গেলেও রংটা এখনও হারিয়ে যায়নি। মেসি-অ্যাগুয়েরোদের কান্নার রোল বন্ধ হলেও শেষ হয়নি হতাশা। বিশ্বকাপ শেষ হলেও শেষ হয়নি এর আবহ! সময়ের স্রোতে একটা সময় এই আবহটাও মুছে যাবে। রয়ে যাবে কেবলই স্মৃতি, কিছু অতিমানবীয় ইতিহাস, কিছু চোখ ধাঁধানো বিস্ময়। কোনটা ছেড়ে কোনটা মনে রাখবেন? রেকর্ড সংখ্যক গোল, সুয়ারেজের কামড়, রবিন ফন পার্সির সুপার ম্যান হয়ে ওঠা, জেমস রড্রিগেজের আগমন, মেসির ধারাবাহিকতা, নেইমারের কান্না, মারিও গোটজের চোখ ধাঁধানো ফিনিশিং, আকাশ সমান হতাশা নিয়ে মেসির গোল্ডেন বলের পুরস্কার গ্রহণ, আবেগ, নাটক, উত্থান-পতন, রংবদল — সব কিছু কি এক বাক্যে বলে শেষ করা যাবে! প্রথম দিনটার কথাই একবার ভেবে দেখুন না। ক্রয়েশিয়ার বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে থাকা দলকে টেনে তুললেন নেইমার জুনিয়র। দুই গোল করে কেবল দলের ভাগ্যই ফেরালেন না, নিজেও চলে আসলেন গোটা বিশ্বেও গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামে। বিশ্বকাপের শেষ প্রান্তে এসে সেই চিত্রটাই ব্রাজিলের জন্য হয়ে গেল মলিন। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে মেরুদণ্ডের ইনজুরি নিয়ে বিদায় ঘটলো সেই নেইমারের। ব্রাজিলের জন্য বিশ্বকাপে মনে রাখার মত স্মৃতি ওই টুকুই। নিশ্চয়ই কোন ব্রাজিলিয়ানরা সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে কিংবা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডের কাছে ৩-১ ব্যবধানে হারের স্মৃতি মনে রাখতে চাইবেন না! স্বাগতিক দলের জন্য ব্যর্থ এক মিশন হয়েছে বলে কি তাই হারিয়ে গেল বিশ্বকাপের সব রং? মোটেই না! কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, আলজেরিযার মত দলগুলোর জন্য বিশ্বকাপটা ছিল যেন রূপকথার এই স্বপ্ন রাজ্য। চিলি, মেক্সিকো, নাইজেরিয়ারাও খেলেছে দাপটের সাথে। আর আর্জেন্টিনা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসরা ছিল মন-মাতানো। এই সব নিয়েই এবারের বিশ্বকাপ। শেষটাও কি কম মনে রাখার মত! একদিকে ‘বিশ্বসেরা’ দল জার্মানি, অন্যদিকে ‘বিশ্বসেরা’ ফুটবলার লিওনেল মেসি। ধ্রুপদী ও পাওয়ার ফুটবলের লড়াই। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে জিতে গেল জার্মানরা। লাতিন আমেরিকা থেকে প্রথমবারের মত ট্রফি নিয়ে ফিরলো ইউরোপিয়ান কোন দল। ইউরোপ থেকে অবশ্য আগেই একবার ট্রফি নিয়ে গিয়েছিল লাতিন আমেরিকানরা। সেটা অবশ্য ৫৬ বছর আগের কথা। স্বাগতিক সুইডেনকে সেবার ফাইনালে ৫-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয় করে ব্রাজিল। তাই এক অর্থে জার্মান এক অসাধ্যই সাধন করলেন! বিস্ময় প্রকাশের আরও অনেক ব্যাপার আছে। গোল সংখ্যার রেকর্ডেই তো নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছে এই বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কাফু ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, ‘ব্রাজিলে সবাইকে স্বাগতম। বিশ্বকাপে আপনাদের জন্য গোলবন্যা অপেক্ষা করছে।’ তার কথা এতোটা মোক্ষম ভাবে যে মিলে যাবে সেটাই বা কয়জন অনুমান করতে পেরেছিল! ফাইনালসহ মোট ৬৪ টি ম্যাচ মিলিয়ে গোল হল মোট ১৭১। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ৩২ টি দলের বিশ্বকাপে গোল সংখ্যার দিক থেকে এই বিশ্বকাপটা থাকছে সবার উপরে। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও হয়েছিল ১৭১ টি গোল। ম্যাচ প্রতি গোলের হিসাবে অবশ্য এটা বেশ পিছিয়ে আছে। এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ। ফ্রান্সে সেবার মাত্র ২৬ টি ম্যাচে হয়েছিল ১৪০ টি গোল। শুধু কি গোল! প্রায় প্রতিটি ম্যাচই তো হাজির হয়েছে অসম্ভব টান টান উত্তেজনার পসরা সাজিয়ে। পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে। মোট আটটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। মারাকানার ফাইনালের নিষ্পত্তিও তো হল অতিরিক্ত সময়ে। এর মধ্যে চারটি ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়েছে টাইব্রেকারে। এটাও নতুন আরেকটা রেকর্ড। ৩২ দলের বিশ্বকাপে সর্বশেষ ২০০৬ সালে ছয়টি ম্যাচ গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত। তার থেকে চারটি ম্যাচ গিয়েছিল টাইব্রেকারে। সামগ্রিক ভাবেও এবার যে প্রতিযোগিতা ছিল বেশি সেটা বোঝার উপায় হচ্ছে একটি ছোট্ট তথ্য — বিশ্বকাপে অনুষ্ঠিত ৬৪ ম্যাচের ৩১ টিতেই প্রথম গোল আসতে সময় লেগেছে কম পক্ষে ৭৫ মিনিট। এর বাদে বিস্ময়কর সব ফুটবল প্রদর্শনী তো আছেই। সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ হতে আর কি লাগে! এখানেই কি শেষ হচ্ছে বিস্ময়! মনে রাখার মত কত কিছুই না রেখে গেলো এই বিশ্বকাপ। টিম কাহিলের সেই অতিমানবীয় গোল, জেমস রড্রিগেজের দুর্দান্ত ভলি, ক্লিন্ট ডেম্পসির দ্রুততম গোল, গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ডের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভ করার রেকর্ড—এতো ঘটনার বিশ্বকাপকে কি এতো সহজে ভুলে যাওয়া যায়!