জার্মানিকে চতুর্থবারের মতো শিরোপা উত্সবে ভাসানোর পর বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার প্রশংসার বৃষ্টিতে স্নাত করেছেন জার্মান সমর্থকদের। বলেছেন, কোন খেলোয়াড় কিংবা কোচ নয়, সমর্থকদের তুমুল সমর্থনই দুই যুগ পর জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বকাপের বিশতম আসরের ফাইনালে গত রোববার রাতে বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে মারিও গোয়েটজের অতিরিক্ত সময়ে দেয়া গোলে জার্মানি হারায় আর্জেন্টিনাকে। এই জয়ের মাধ্যমে প্রথম ইউরোপিয় দল হিসাবে আমেরিকা মহাদেশে বিশ্বকাপ জিতলো জার্মানি।
দেশ থেকে হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে ব্রাজিলে খেলতে আসলেও খেলোয়াড়দের মন সব সময়ই দেশেই পড়েছিল বলে জানান শোয়েনস্টেইগার। আর দূরত্বের বাধাকে পেছনে ফেলে সমর্থকরাও প্রতি মুহূর্তেই অনুপ্রাণিত করে গেছেন খেলোয়াড়দের। ভিন্ন এক মহাদেশে, ভিন্ন পরিবেশে এই অনুপ্রেরণার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম জানিয়ে এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকা বলেন, ‘আমরা সবাই সময়টা উপভোগ করছি। অসাধারণ একটা মুহূর্ত এটা। যে সমর্থন জার্মানবাসী আমাদের যুগিয়েছে তাতে তাদের ধন্যবাদ জানাতেই হবে। আমরা প্রতি মুহূর্তেই তাদের সমর্থন এবং অনুপ্রেরণা টের পেয়েছি।’
সমর্থকদের অনুপ্রেরণাই পুরো দলকে তাদের সেরাটা ঢেলে দিতে উত্সাহিত করেছে জানিয়ে প্রায় এক দশক বাদে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে সাফল্য পাওয়া এই তারকা বলেন, ‘সত্যিই অবিশ্বাস্য একটা পারফরম্যান্স ছিল এটা। সমর্থকরা যেভাবে আমাদের উত্সাহ যুগিয়েছেন, সত্যি বলছি এর আগে কখনো তেমনটা দেখিনি আমি। এটা ছিল আমাদের শক্তির অনি:শেষ উত্স। এটার কারণেই আসলে আমরা শিরোপা জিতেছি।’
বায়ার্নের জার্সি গায়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে গত বছর জার্মানির সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হওয়া শোয়েন্সটেইগারের সমর্থকদের প্রতি এমন অভিবাদন জানানোর কারণটাও স্পষ্ট। চোটের কারণে বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়নদের হয়ে সর্বশেষ মৌসুমে মোটেই ধারাবাহিক ছিলেন না এই মিডফিল্ড জেনারেল। তাছাড়া আরিয়েন রোবেন এবং ফ্রাঙ্ক রিবেরির দুরন্ত ফর্মে বায়ার্নের মধ্যমাঠে একটু নড়বড়েও হয়ে গিয়েছিল তার জায়গা।
চোঁটের কারণে কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল শোয়েনস্টেইগারের তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলাটাও। তবে শেষ পর্যন্ত সব বাধা ডিঙ্গিয়ে জোয়াকিম লোয়ের বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নেন তিনি। আর এই পুরোটা সময়ই সমর্থকদের পাশেই পেয়েছেন শোয়েনি।
পুরো টুর্নামেন্টেই দুর্দান্ত খেলা ২৯ বছর বয়সী এই তারকা, দলের প্রয়োজনে গতকাল ম্যাচেও নিজের পজিশন পাল্টেছেন দুবার। ম্যাচ শুরুর মাত্র ১২ ঘন্টা আগে চোঁটের কারণে ছিটকে যান তার মধ্যমাঠ সতীর্থ স্যামি খেদিরা। খেদিরার বদলে খেলানো হয় ক্র্যামারকে। ফলে কিছুটা পাল্টে যায় শোয়েনির দায়িত্ব।
ম্যাচের আধা ঘন্টা পার হবার পরপরই চোঁটের শিকার হয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন ক্র্যামারও। তার বদলে নামানো হয় আন্দ্রে স্কুরেলকে। ফলে আবারো পাল্টে যায় শোয়েনস্টেইগারের ভূমিকা। তবে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ফলস নাইন, মিডফিল্ডার, ডিফেন্ডার, হোল্ডিং মিডফিল্ডার এমনকি স্ট্রাইকারের ভূমিকায়ও খেলে আসা শোয়েনস্টেইগারের তাতে মোটেই সমস্যা হয়নি। সহজাত দক্ষতায় আর্জেন্টিনার আক্রমণ প্রতিহত করার পাশাপাশি ভূমিকা রেখেছেন দলের আক্রমণ রচনায়ও। তবে তাতে ক্ষয়ক্ষতিও কম হয়নি তার। প্রতিপক্ষের বেশ কিছু মারাত্মক ট্যাকলের শিকার হতে হয়েছে তাকে, সার্জিও অ্যাগুয়েরোর হাতের আঘাতে কেটেও গেছে চোখের নিচে, ঝরেছে রক্তও। তবে শেষ পর্যন্ত কিছুই থামাতে পারেনি শোয়েনিকে।
এ নিয়ে সর্বশেষ পাঁচটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টেই জার্মানিকে কমপক্ষে শেষ চারে নিয়ে গেলেন শোয়েনি। সাবেক জার্মান তারকা এবং বর্তমানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করা অলিভার বিয়েরহফের বিশ্বাস, খেলার প্রতি অবিশ্বাস্য পরিমাণ ভালোবাসাই শোয়েনস্টেইগারের এমন সাফল্যের কারণ। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি জার্মানির জার্সি গায়ে অভিষেকের পর শোয়েনি গত দশ বছরে খেলে ফেলেছেন ১০৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ফর্ম এবং ফিটনেস বিবেচনায় অনায়াসেই হয়তো খেলতে পারবেন আরো কয়েক বছর। বিয়েরহফ মনে করছেন শোয়েনির পক্ষে আগামী বিশ্বকাপ খেলে ফেলাটাও মোটেই কঠিন কিছু নয়। কারণ শুরুর দিনগুলোর মতো এখনও জার্মানির মাঝমাঠের দায়িত্ব বহনের দায়িত্ব শোয়েনস্টেইগারের আছে। মাঠে নামতে না পারলে এখনো শোয়েনস্টেইগার সেই ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর মতোই হতাশা বোধ করেন বলেও জানান বিয়েরহফ। খেলার প্রতি যার এমন ভালোবাসা সমর্থকরা যে তাকে ভালোবাসবেন সেটাই তো স্বাভাবিক তাই না!
