জোয়াকিম লোতেই এলো সাফল্য

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২১:১০
ইউরোর ২০০৪ আসরে রুডি ফোলারের ব্যর্থতার পর জার্মান ফুটবল ফেডারেশন (ডিএফবি) দলের ভার তুলে দিল সাবেক স্ট্রাইকার জার্গেন ক্লিন্সম্যানের হাতে। কোচ হিসাবে নিয়োগ পেয়েই ক্লিন্সম্যান প্রথম যে কাজটি করলেন, সেটি হলো নতুন একজন সহকারী নির্বাচন করা। যে কিনা দল সামলানোর পাশাপাশি খেলোয়াড় নির্বাচনের কাজটিও ভালো ভাবেই করতে পারবেন। সহকারীকে সাথে নিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই একাদশ থেকে শুরু করে কৌশলেও আমূল পরিবর্তন নিয়ে এলেন ক্লিন্সম্যান। প্রথাগত পাল্টা আক্রমণ নির্ভর খেলা বাদ দিয়ে জার্মানি শুরু করলো এখনকার আক্রমণাত্মক খেলা। ফলাফলও পাওয়া গেল প্রায় সাথে সাথেই। দেশের মাটিতে ২০০৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান পেল তারা। বিশ্বকাপের পরে নতুন করে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানালেন ক্লিন্সম্যান। বিন্দুমাত্র না ভেবে তার সেই সহকারীকে দেয়া হলো পূর্ণকালীন দায়িত্ব। কারণ, ততদিনে জানা হয়ে গেছে- ক্লিন্সম্যানের দলের সাফল্যের পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী এবং কৌশল নির্ধারক ছিলেন এই সহকারীই। টানা তিনটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে জার্মানিকে শেষ চারে তুলে দেয়ার পরে অবশেষে সেই সহকারী পেলেন চূড়ান্ত সাফল্য। গত রবিবার রাতে মারাকানা স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো শিরোপা জয়ের আনন্দে মাতলো জার্মানি। আর দেশের ফুটবল ইতিহাসে চিরদিনের জন্য নিজের জায়গা করে নিলেন ক্লিন্সম্যানের সেই সহকারী এবং দলের বর্তমান কোচ জোয়াকিম লো। লো দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে যতগুলো টুর্নামেন্ট খেলেছে জার্মানি তার প্রতিটিতেই তারা পৌঁছেছে সেমিফাইনালে। লোর ধারাবাহিকতা বোঝাতে বোধহয় এই একটি তথ্যই যথেষ্ট; কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য আসছিল না কিছুতেই। গত বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়া দলটি এবারও টুর্নামেন্ট শুরু করে অন্যতম ফেভারিট হিসাবেই। যদিও তাই বলে তাদের নিয়ে বাজি ধরার লোক খুব বেশি বোধহয় ছিল না। তার অন্যতম কারণ ছিল- শেষ চার থেকে তাদের বিদায় নেয়ার অতীত ইতিহাস। অতীতে ১২ বার সেমিফাইনাল খেলেও মাত্র তিনবার শিরোপা জেতা জার্মানি পর্তুগালকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শুরু করে টুর্নামেন্ট। শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরোনোর পর শেষ চারে তারা ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে ব্রাজিলকে। তবে বিশাল এই জয়ের পরেও লোয়ের উল্লাস খুব বেশি চোখে পড়েনি। চূড়ান্ত উল্লাসটা হয়তো ফাইনালের জন্যই জমিয়ে রেখেছিলেন তিনি। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই ফেটে পড়লেন বুনো উল্লাসে। যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই জড়িয়ে ধরছেন। কখনো গলা ফাটিয়ে চিত্কার করছেন। এরই মধ্যে ক্লোসা, শোয়েনস্টেইগাররা আবেগে চোখের পানি মুছতে মুছতে মাথা রাখছেন লোয়ের কাঁধে। সন্তানকে যেমন পিতা জড়িয়ে ধরেন ঠিক তেমনি তাদের জড়িয়ে ধরছেন লো। লুকাস পোডলস্কি, ম্যাট হামেলসদের মতো কাউকে আবার জড়িয়ে ধরছেন নিতান্ত বন্ধুর মতো। দুই যুগ পর দেশকে শিরোপা এনে দেয়ার পর লোর এমন উদাযাপনে নিশ্চয়ই কেউ অবাক হননি। বরাবরই কৌশলগত দক্ষতার জন্য বিখ্যাত লো তার কৌশলের ঝলক দেখিয়েছেন এই রাতেও। তিনিই আগে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা মেসি নির্ভর নয়; কিন্তু মাঠে দেখা গেলো সেই মেসির পায়ে শেকলটা খুব শক্তভাবে পরিয়ে রাখার পরিকল্পনাটা আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছিলেন তিনি। আর তাতেই মূলত বুয়েন্স আয়ার্স থেকে আসা লাখো সমর্থকের কপাল পুড়লো। ’৯০ বিশ্বকাপের মতো এবারও আর্জেন্টাইনদের বুকে ‘ছুরি’ বসিয়ে দিলো জার্মানরা। ৯০ মিনিটের ফুটবল যুদ্ধটা শেষ হওয়ার পর ১১৩ মিনিটে মারিও গোটজের দুর্দান্ত এক গোলে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। বুক দিয়ে বলটা নামিয়ে বা পায়ে দারুণ একটা ভলি করে আর্জেন্টিনার গোলকিপার রোমেরোকে বোকা বানিয়ে দৃষ্টি নন্দন গোল করেছেন মিরোস্লাভ ক্লোসার বদলে খেলতে নামা এই ফরোয়ার্ড। এ আগে নির্ধারিত সময়ে সমানে সমানেই লড়ছিল দুই দল। যদিও কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি করেছিল আর্জেন্টিনাই। ম্যাচের সহজতম সুযোগটি হাতছাড়া করেন গঞ্জালো হিগুইন। ২০ মিনিটের সময় জার্মানির টনি ক্রুস সতীর্থ গোলরক্ষককে হেড করতে গেলে স্ট্রাইকার হিগুয়েন পেয়ে যান বলটি। জার্মান ডি বক্সে গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়েরকে একা পেয়েও বল পোস্টের বাইরে মারেন তিনি। সুযোগ পেয়েছিলেন লিওনেল মেসিও। তবে, দুরূহ কোন থেকে তিনি বাম পায়ে যে শটটি নেন, সেটা ন্যুয়েরকে পরাস্ত করতে পারলেও বেরিয়ে যায় পোস্টের ডান প্রান্ত ঘেঁষে; কিন্তু তিনি বক্সের ভেতরে দাঁড়িয়ে জার্মান গোলকিপার ম্যানুয়েল ন্যুয়েরকে একা পেয়েও বলটা জালে পাঠাতে পারেননি। এই গোল হলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারতো। কাউন্টার অ্যাটাক থেকেও আর্জেন্টিনা এদিন কয়েক দফায় গোলের সুযোগ পেয়েছিল। মার্কোস রোজো সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। এরপর অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনা অনেকটা খেলার ধারার বিপরীতেই সুযোগ ন্যুয়েরকে একা পেয়েও সেই সুযোগ হাতছাড়া করেন বদলি খেলোয়াড় প্যালাসিও। গোল্ডেন গ্লোভস জেতা ন্যুয়েরের মাথার উপর দিয়ে মারতে গিয়ে এই স্ট্রাইকার বল পাঠিয়ে দেন পোস্টের উপর দিয়ে। এরপর তো গোয়েটজের সেই গোল। ফলে, আটাশ বছরের আক্ষেপ অন্তত আরো চারটি বছরের জন্য নিশ্চিত হয়ে যায় আর্জেন্টিনার।