সালাম মুর্শেদির কলাম

যোগ্য দলের হাতেই উঠেছে শিরোপা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৪
একই সঙ্গে দুটি বিপরীত ভাবনা আমার মাথায় খেলা করছে। দুটি ভাবনাই প্রবল। একটি হচ্ছে, টুর্নামেন্টের সেরা দেশটিকেই আগামী চার বছরের জন্য আবাস হিসাবে বেছে নিয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফি। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, অমরত্বের খুব কাছে এসেও তাকে ছোঁয়া হলো না লিওনেল মেসির। কাগজে-কলমে শেষ হয়ে গেলেও আমি নিশ্চিত, এক মাসের এই ফুটবল উত্সবের রেশ কাটবে না এখনই। মেসি ভক্তদের কষ্ট থেকে যাবে আরো বহুদিন। তেমনি জার্মান সমর্থকরা উত্সবে মেতে থাকবেন আরো চারটি বছর। চার বছর পর পর ৩২টি দেশের অংশগ্রহণে যে ফুটবল মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল ভক্তদের চোখে সেটা ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। সত্যিই তো। আর কোন ক্রীড়ামহাযজ্ঞ মানুষের মনে এমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। অনেকে হয়তো ব্যাপকতার দিক থেকে অলিম্পিক গেমসের কথা বলবেন, গৌরব কিংবা অলিম্পিকের অবস্থান হয়তো বিশ্বকাপ ফুটবলেরও ওপরে। কিন্তু যেই উত্তেজনা-উন্মাদনা বিশ্বকাপ ছড়ায় অলিম্পিকের সাধ্য কি তার সাথে পাল্লা দেয়ার! তাই বিশ্বকাপের একটি আসর শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে সে নিয়ে আলোচনাটা শেষ হয় না। কারণ মাঠের খেলার মতো মানুষের উন্মাদনাকে তো আপনি ঘড়ির কাটা ধরে শেষ করে দিতে পারবেন না! এই উন্মাদনার কারণেই আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দেখি সমর্থকদের বাড়াবাড়ি রকমের আবেড়ের বহি:প্রকাশ। যে যার ফেবারিট তারকাকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় নামে, তার জার্সি পরে। ঘর সাজায় প্রিয় তারকার বিশাল সব ছবিতে। এই দর্শক সমর্থন হয়তো মাঠে খেলোয়াড়দের উজ্জ্বীবিত করে কিন্তু সেটা মাঠের খেলায় প্রভাব ফেলে খুব সামান্যই। সেই বিষয়টিই আরেকবার প্রমাণ করলো জার্মানি। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ছন্দময় খেলা উপহার দেয়া জোয়াকিম লোয়ের দল তাদের সেই ছন্দ ধরে রাখলো ফাইনালেও। তাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল আর্জেন্টাইনদের আটাশ বছরের লালিত স্বপ্ন। মেসি নামক এক ক্ষুদে বালকের পায়ে বিশ্ব জয় করার যেই স্বপ্ন গত আট বছর ধরে সমর্থকরা দেখে আসছিলেন, অপমৃত্যু ঘটলো তারও। মেসি আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে তার বয়স এবং ফর্ম বলছে খেলাটা তার পক্ষে খুবই সম্ভব। কিন্তু চার বছর পর মেসি তার সেরা ফর্মে থাকবেন কিনা সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আসল কথা হলো, মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টাইনদের শিরোপা জয়ের ইচ্ছাটা আরো চার বছরের জন্য বাধা পরে গেল। কে জানে সেটা চিরকালের জন্যই আটকে গেল কিনা! আর্জেন্টিনা হয়তো ভবিষ্যতে বহুবার বিশ্বকাপ জিতবে। তবে সেই দলে হয়তো মেসি থাকবেন না। এই একটা চিন্তাই মেসি ভক্তদের কাঁদাতে বাধ্য। কারণ গত চার-পাঁচ বছর ধরে যে খেলোয়াড়টি ফুটবলের সব সাফল্য নিজের পায়ে দলেছেন, প্রতিভা বিচারে যাকে মানা হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা; তাকেই কিনা বিদায় নিতে হবে বিশ্বকাপ শিরোপা না ছুঁয়ে! মেসি ভক্তদের মতো এই চিন্তা কষ্ট দেয় আমাকেও। তবে কে জানে, মেসি হয়তো চার বছর পর ফিরবেন নিজের সেরা রূপেই। জয় করবেন বহু আরাধ্য বিশ্বকাপ শিরোপা। তবে তার আগ পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবল শাসন করার ক্ষমতা পেয়ে গেছে জার্মানি। বলা ভাল, তারা সেই ক্ষমতা আদায় করে নিয়েছে। সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ধ্বংস করে দেয়া দলটি, ঐ ধরনের ফলের পরও ফাইনালে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল না। প্রতিটি মুহূর্ত তারা মেপে খেলেছে। প্রতিটি আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণে তারা তাদের পুরনো জয় ক্ষুধাই দেখিয়েছে। যদিও অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় কৌশল নির্ভর পজেশনাল ফুটবলই দেখেছি আমরা। তবে পুরো খেলায় নিজেদের রক্ষণ সামলে রাখতে পারলেও শেষ মুহূর্তে ভুল করে বসে আর্জেন্টিনা। আর ম্যাচে নিজেদের সেরা এবং প্রায় একমাত্র সুযোগটিকেই কাজে লাগায় জার্মানি। সব কিছু মিলে আমি বলবো, মেসির জন্য রাতটি ছিল হতাশার। কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দলটির হাতেই উঠেছে ট্রফি।