উচ্ছ্বাস-উন্মাদনায় জার্মানদের বীর বরণ

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২১:১৭
দুই যুগ পরে প্রথম শিরোপা, সেটাও আবার দুই জার্মানির একত্রীকরণের পরে প্রথমবারের মতো। দেশে ফেরার আগেই তাই টের পাওয়া যাচ্ছিল ভক্তদের উন্মাদনা। দেশে ফিরে বিশ্বকাপ বীরেরা যে হূদয় নিংড়ানো এক সংবধর্নাই পাবেন, সেনিয়ে কারো ক্ষীণ সন্দেহও ছিল না। ঘটলোও ঠিক তাই। রাত ভর অপেক্ষা শেষে নাচ গান, কান ফাটানো চিত্কার আর পাগলাটে উদযাপন। চতুর্থবারের মতো দেশকে বিশ্বকাপ শিরোপার আনন্দে ভাসানোর পর ফিলিপ লামরা গত মঙ্গলবার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে পেলেন অভূতপূর্ব এক সংবর্ধনাই। আসলে উত্সবটা শুরু হয়ে গিয়েছিল আগেই। রোববার রাতের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারানোর সাথে সাথেই আসলে শুরু হয়ে গিয়েছিল উত্সবটা। বার্লিন, হামবার্গ, ফ্রাংকফুর্ট, ব্রেমেনের শহুরে এলাকা পেরিয়ে সেই উত্সবের ঢেউ রঙ্গিন করে তুলেছিল দেশের সামীন্তবর্তী এলাকাগুলোকেও। তবে পুরনো ঐতিহ্য মেনে উত্সবের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে কাজ করছিল বিখ্যাত ব্রান্ডেনবার্গ গেট। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে জাতীয়তাবাদী শক্তির বিজয় স্মারক হিসাবে নির্মিত এই গেটের সামনে রোববার রাতেই জড়ো হয় লাখ খানেক জার্মান। সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাদের কেউ কেউ বাড়ির পথ ধরলেও অনেকেই থেকেও গিয়েছিলেন বীরদের বরণ করে নিতে। এরপর প্রতিমুহূর্তে সেই মানুষের সংখ্যা কেবল বেড়েছেই। মঙ্গলবার সকাল নাগাদ সংখ্যাটা পেরিয়ে যায় আড়াই লাখের ঘর। এরপরও প্রচুর মানুষ শিরোপা উদযাপনের মূল কেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকেন কিন্তু জায়গার সংকুলান করতে না পেরে তাদের দাঁড়িয়ে পড়তে হয় অনেকটা দূরে। ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিনে যখন জার্মান দলকে বহনকারী বিমানের বার্লিনের মাটি ছোঁয়ার দৃশ্য ভেসে উঠলো, মুহূর্তেই হাজার গুণ বেড়ে গেলো সমর্থকদের উল্লাস। পতাকা উড়িয়ে তারা প্রকাশ করতে চাইলেন তাদের আনন্দ। জার্মান দল এবং সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে বিশ্বকাপের আগেই বিখ্যাত বিমান সংস্থা লুফথানসা তাদের বেশ কিছু বিমানের নামকরণ করেছিল ফ্যানহানসা। সেই ফ্যানহানসারই একটি বিশেষ বিমানে করে রিও ডি জেনিরো থেকে বার্লিনের তেজেল বিমানবন্দরে উড়ে এল জার্মান দল। যার একপাশে লেখা ছিল ‘ভিক্টরস’ অর্থাও বিজয়ী। বিমানবন্দরের সংকীর্ণ জায়গাতেই আগে থেকেই হাজির ছিলেন প্রচুর সমর্থক। তাদের উল্লাস বাড়িয়ে দিয়ে হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে বিমান থেকে প্রথমে বেরোলেন ফিলিপ লাম। তাকে অনুসরণ করলেন মিডফিল্ড জেনারেল বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার। কাঁধে জড়ানো জার্মানির কালো-লাল-সোনালী পতাকা। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে টারমাক স্পর্শ করলেন খেলোয়াড়দের সবাই। ততক্ষণে হাতের মোবাইল ফোন দিয়ে তাদের ছবি তুলতে শুরু করেছেন বিমান কর্মীরা। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তদের চিত্কারে তখন আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। তাদেরই একজন ব্রেন্ড হেসে। পেশায় বাস ড্রাইভার ব্রেন্ড জানালেন, শত ব্যস্ততার মধ্যেও বিশ্বকাপের একটি খেলাও মিস করেননি তিনি। ড্রাইভিং হুইলের পেছনে থেকেও রেডিওতে প্রতিটি খেলার ধারাভাষ্য শুনেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক একটা মুহূর্ত এটা। আপনি প্রতিদিন এমন দৃশ্য দেখবেন না।’ সুদীর্ঘ দুই যুগের বিরতিই এই ট্রফিটাকে বিশেষত্ব দান করেছে বলেও জানান তিনি। প্রায় একই কথা জানান আগত আরেক ভক্ত লিডিয়া লাম্পাও। কর্মক্ষেত্রে যাবার পথে বন্ধুকে নিয়ে বিমান বন্দরে এসেছিলেন পেশায় বিপণন কর্মকর্তা এই নারী। মেসুত ওজিল-মারিও গোয়েটজেদের চোখের সামনে দেখে খুশি যেন আর বাঁধা মানছিল না লিন্ডার। কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততার সত্ত্বেও জার্মানির প্রতিটি ম্যাচ টেলিভিশনে দেখেছেন তিনিও। আর মাঠে প্রিয় তারকাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের প্রতিদান হিসাবে এই সকালবেলা কাজ বাদ দিয়ে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এভাবেই তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার প্রমাণ দিচ্ছি। প্রতিটি ম্যাচই ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং আমার ইচ্ছা ছিল খেলোয়াড়দের অন্তত একবার সামনাসামনি দেখার। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং আমার মনে হচ্ছিল এবার আমরাই জিততে যাচ্ছি।’ নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তায় এরপর লিন্ডা-ব্রেন্ডদের মতো সমর্থকদের ভিড় সামলে দ্রুতই মাসির্ডিজের বিশেষ একটি কালো বাসে চড়ে বসেন দলের সবাই। ছাদখোলা বাসটি রওনা হয় মধ্য বার্লিনের দিকে। রাস্তার পাশেও অপেক্ষা করছিল হাজার হাজার জার্মান সমর্থক। রাস্তার পাশের বিল্ডিংগুলোও বাদ ছিল না। সেগুলোর ছাদে-খোলা জানালায় দেখা মিল ছিল প্রচুর উত্সুক মানুষের মুখ। মানুষের চাপে বাসের গতি খানিকটা স্লথ হয়ে যাওয়ায় অনুমানের চেয়ে বেশি সময়ই লাগে ব্রেন্ডনবার্গ গেটে পৌঁছাতে। এর আগেই অবশ্য বার্লিনের মেয়র ক্লস ওয়েরিটের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত্ সেরে ফেলে তারা। ততক্ষণে আকাশ ছুঁয়েছে ভক্তদের চিত্কার। সেই চিত্কার চেঁচামেচির মধ্যেই মঞ্চে উঠে গেলেন শোয়েনস্টেইগার, লাম-খেদিরারা। তাদের উত্সবের মধ্যমণি হয়ে রইলেন কোচ জোয়াকিম লো। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যটিকে উত্সর্গ করলেন সমর্থকদের উদ্দেশ্যে। ৫৪ বছর লো বললেন, ‘এই ট্রফি এখানে উপস্থিত সবার। এই ট্রফি জার্মানির প্রতিটি মানুষের।’ নিশ্চিতভাবেই জার্মানদের আনন্দের এই রেশ থাকবে আরো চারটি বছর। কারণ রাশিয়ায় বিশ্বকাপের পরবর্তী আসরের আগ পর্যন্ত তো ফুটবল সামাজ্যের সম্রাট তারাই। এএফপি