রোজা অর্ধেক শেষ বলেই যেন ভিড় বাড়তে শুরু করেছে মার্কেটগুলোতে। পিছিয়ে নেই ফুটপাতের বেচা-কেনাও। স্বল্প আয়ের মানুষ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন তাদের ঈদের কেনাকাটা।
কমলাপুরে বাস করেন ফজলুল হক। কাজ করেন একটি প্রেসে। বুধবার সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঈদের পোশাক কিনতে। কিন্তু বৃষ্টি দেয় বাগড়া। ছেলের একটি প্যান্ট কেনার পরই বৃষ্টি তাদের আটকে ফেলে ঢাকা কলেজের ওপারে। ফজলুল হক জানান, একদিনেই অন্তত পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটার ইচ্ছে তার। মা-বাবার জন্য আর একদিন মার্কেটে আসবেন। তবে কেনাকাটা বৃষ্টির জন্য শেষ হবে কি না বুঝতে পারছেন না। এমন অনেকেই ঐদিন বৃষ্টি বন্দি হন ঈদ বাজারে। যাদের আয় একটু কম তাদের জন্য আয়োজন থাকে নগরীর ফুটপাত জুড়ে। ধনী ও মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি কেনাকাটায় পিছিয়ে নেই নিম্নবিত্তের মানুষও। রাজধানীর বিলাসবহুল শপিংমলগুলো যখন উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের ভিড়ে সরগরম, তখন ফুটপাতের দোকানগুলো নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কেনাকাটায় জমজমাট হয়ে উঠছে।
নগরীর নিউমার্কেট, গাউছিয়া, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, ঢাকা কলেজের সামনে, ফার্মগেট, বঙ্গবাজার, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, গুলিস্তান মোড়, নগর ভবন, বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ গেট, নিমতলী, ইডেন কলেজ এলাকা, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, মগবাজার, বাসাবো, খিলক্ষেত, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, রামপুরা, বাড্ডা, গুলশান লিঙ্ক রোড এলাকার রাস্তার দু’পাশে ফুটপাতের ওপর দোকানিরা নানারকম পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ফুটপাত ছাড়াও এসব এলাকার ফুটওভার ব্রিজের ওপরেও বসেছে অস্থায়ী দোকানপাট।
রাজধানীর নিউমার্কেটের ফুটপাতে গিয়ে দেখা যায়, ‘এক দাম দেড়শ’, যা নিবেন দেড়শ’ বা ‘এক দাম একশ’, বাইছা লন একশ’ ইত্যাদি নানা ধরনের হাঁকডাক। বৃষ্টির কারণে কিছুটা থমকে যায় ফুটপাতের বেচাকেনা। বিক্রেতারা বলছেন এবার গতবারের চেয়ে একটু কম বেচাকেনা। তারপর দুই-একদিন হল মার্কেট জমে উঠেছে। এর মধ্যে বৃষ্টি তাদের জন্য শুভবার্তা বহন করে না।
নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মার্কেট হিসেবে পরিচিত ঐ সকল ফুটপাতে শোভা পাচ্ছে নারীদের জন্য দেশিয় সুতি কাপড়ের বিভিন্ন পোশাক। তাতে রয়েছে হাতের ও অ্যামব্রয়ডারি করা রকমারি কারুকাজ। আছে ব্লকের কাজও।
রয়েছে বুটিকের বাহারি পোশাক। আরো আছে কাশ্মীরী ডিজাইনের শাড়ি ও থ্রি-পিস, জরি ও সুতার মিশালে বাহারি নকশার শাড়ি, উজ্জ্বল রঙের জর্জেট শাড়ি ও থ্রি-পিস , টিস্যু কাপড়?। অপরদিকে ছেলেদের জন্য রয়েছে দেশি-বিদেশি নানা ডিজাইনের পাঞ্জাবি, শার্ট, সুতির প্যান্ট, টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট, ফতুয়া। রয়েছে শার্ট ও প্যান্টের থান কাপড়।
মার্কেট ভেদে ছেলেদের শার্ট বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, জিন্স প্যান্ট ৩৫০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকায়, টি-শার্ট ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা, মেয়েদের থ্রি-পিস ৪৫০ টাকা থেকে হাজার/১২০০ টাকা, শাড়ি ৪৫০ থেকে ২০০০ হাজার টাকা, বাচ্চাদের থ্রি-কোয়াটার জিন্স প্যান্ট ৩০০ টাকা, গেঞ্জির সেট ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, ফ্রক ও টপস ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ছেলে ও মেয়ে শিশুদের জন্য হাতাকাটা গেঞ্জি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
রাজধানী সুপার মার্কেটের ফুটপাতে মেয়েদের পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছেন আলী হোসেন। আলী জানান, তার দোকানে অনেক ধরনের দেশি-বিদেশি থ্রি-পিস রয়েছে। এসব থ্রি-পিসের দাম ৯০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া রয়েছে বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের টপস ও ফ্রক। এ বছর ঘের ওয়ালা লম্বা পোশাকের চাহিদা বেশি।
পোশাক ছাড়াও ফুটপাতের এসব দোকানে নিত্য ব্যবহার্য প্রায় সব কিছুই পাওয়া যায়। ছেলেদের পাঞ্জাবি, শার্ট, টি-শার্ট, প্যান্ট, বেল্ট, লুঙ্গি, টুপি, সুগন্ধি থেকে শুরু করে মেয়েদের শাড়ি, ঘড়ি, থ্রি-পিস, টু-পিস, সিঙ্গেল কামিজ, রেডিমেড কামিজ, টপস, টাইটস, গজ কাপড়, বিভিন্ন ধরনের অর্নামেন্টস, কসমেটিকস, বাচ্চাদের পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, ফ্রক, স্কার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, বড়-ছোট সকলের জুতা, স্যান্ডেল, চশমাসহ সংসারের বাসন-কোসনও থাকে এখানে। ফলে অনেকে ঈদ উপলক্ষে সংসারের জন্য নতুন গ্লাস সেট, প্লেট, টিফিন বক্স, শো-পিসও কিনে নেন এসব দোকান থেকে।
ঢাকা কলেজের সামনের ফুটপাতের একটি দোকানে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করছিলেন রাশেদা আক্তার। তিনি বলেন, বড় শপিংমলে গিয়ে কেনাকাটা করার সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই এখান থেকেই ঈদের কেনাকাটা করি। এছাড়া এখানে কম দামে পছন্দের জিনিসও পাওয়া যায়। আর এসব জিনিসের মানও ভালো। আমি দেখেছি অনেক সময় একই জিনিস নামিদামি দোকানে কয়েকগুণ মূল্য দিয়ে বিক্রি করে। তবে ফুটপাতের পণ্যের দাম নিয়ে ভিন্নমতও আছে কারো কারো। পেশায় রং মিস্ত্রী জয়নাল বলেন, ‘কিছুদিন আগেও যেসব টি-শার্ট ১৫০ টাকায় কিনেছি, এখন তার দাম রাখা হচ্ছে ২৫০ টাকা। বলাকা সিনেমা হলের সামনে গজ কাপড় কিনতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাজনিন বলেন, ভিতরের দোকানগুলোতে দাম বেশি। তাই বাইরের দোকাগুলো থেকে কেনাকাটা করছি। তবে এখানেও দাম বেড়ে চলেছে। রোজার অর্ধেক বলেই বিকিকিনি জমে উঠছে বলে জানান বিক্রেতারা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে বিক্রিও তত বাড়বে বলে মনে করছেন বিক্রেতারা।
