নাদিন গর্ডিমার

আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী কণ্ঠস্বর

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪৬
আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গ লেখিকা নাদিন গর্ডিমার ছিলেন আপাদমস্তক বর্ণবাদবিরোধী। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী থাকার পরও তিনি লেখাকেই আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। উচ্চপদে থাকার যোগ্যতা থাকার পরও পার্টিতে সেভাবে না থাকার কারণ জানা যায় তাঁর বক্তব্য থেকে। তিনি স্পষ্টতই মনে করতেন লেখাটাই তাঁর কাজ। তিনি নিজে চারিদিকে যা দেখছেন তাকেই তিনি লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চান। করেছেনও তাই। তিনি তাঁর লেখায় চরিত্রগুলো এমনভাবে সৃষ্টি করতেন যেখানে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ, স্বার্থান্ধ ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে উপস্থিত হয়। ১৯৭৪ ‘দ্য ম্যান বুকার পুরস্কার’ বিজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য কনজারভাসনিস্ট’-এ তাঁর সৃষ্ট চরিত্রটি একজন শ্বেতাঙ্গ শিল্পপতি, যে জোহানেসবার্গের বাইরে জমি ক্রয় করে সেখানে শিল্প-কারখানা স্থাপন করে। অত্যন্ত রক্ষণশীল আর বর্ণবাদী স্ত্রীর প্ররোচনায় সেই ভূমি ক্রয় করা হয়। যাকে কেন্দ্র করে পুরো কাহিনি এগিয়ে গেছে। আবার ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘বার্গারস ডটার’-এর কথা যদি বলি, সেখানে দেখা যায়, রোসা বার্গার নামের এক ব্যক্তির সুযোগ্যা কন্যা ছিলেন মেধাবী চিকিত্সক। কিন্তু সেই ডাক্তার ছিলেন মনেপ্রাণে বর্ণবৈষম্যবাদ বিরোধী। সক্রিয় ছিলেন আন্দোলনের সঙ্গে। তার জন্য তাকে মাশুলও দিতে হয়েছে। বর্ণবৈষম্যবাদ বিরোধী হওয়ার কথিত অপরাধে তাকে জেলে ঢোকানো হয়। আর সেই জেলখানাতেই তার মৃত্যু হয়। রোসা চরিত্রটিতে দেখানো হয়েছে কোথাও রাজনৈতিক অসততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকলে কিভাবে মানুষকে অসহায় হয়ে পড়তে হয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকলে মানুষ কিভাবে নিসঙ্গ হয়ে পড়ে তা দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘জুলাইস পিপল’ গ্রন্থে ভিন্নমাত্রার সমাবেশ ঘটিয়েছেন তিনি। উদার এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারের ঘটনা বিবৃত হয়েছে সেখানে। সেই পরিবারটি ছিল বর্ণবাদবিরোধী। নির্যাতনে অতিষ্ট সেই শ্বেতাঙ্গ পরিবারটি একসময় তাদের সাবেক গৃহকর্মীর সহায়তায় বেঁচে যায়। যার নাম ছিল জুলাই। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘অ্য ওয়ার্ল্ড অব স্ট্র্যাঞ্জারস’-এ তিনি দেখিয়েছেন, একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বন্ধন তৈরির ব্যাপারে কিভাবে ভূমিকা রেখেছেন। আর সেই অবস্থাটা যে আজকের মতো ছিল না তা বলাবাহুল্য। সেখানে সাম্প্রদায়িক কারণে যে দুর্ভোগ ছিল তাকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। শুধু সম্প্রদায় নয়, বর্ণ নয়, স্থান এবং পরিচয় কিভাবে রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিপর্যায় পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছে তা-ও তিনি দক্ষতার সাথে তাঁর লেখায় প্রকাশ করেছেন। ‘লেখিকা বর্ণবাদের অত্যন্ত গভীরে গিয়ে অমানবিকতাকে প্রকাশ করেছেন তাঁর লেখার মাধ্যমে। আর লেখনির কৃতিত্ব হচ্ছে তাঁর এই বর্ণনাগুলো গোটা দুনিয়ার বর্ণবাদের চিত্রকেই প্রতিনিধিত্ব করে।’ এমন মন্তব্য শোনা যায় ১৯৯১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদানকালে সুইডিস অ্যাকাডেমির পারমানেন্ট সেক্রেটারি ‘স্টুর অ্যালেন’-এর বক্তৃতা থেকে। ‘রাজনীতিই লেখার চরিত্র’ গর্ডিমারের লেখায় তা-ই প্রতিভাত হয়। বলেছেন, নোবেল পুরস্কার কর্তৃপক্ষের অন্যতম ব্যক্তি ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক এবং গর্ডিমারের উপন্যাস নিয়ে যিনি গবেষণা করছেন, স্টিফেন ক্লিংগমেন। তাঁর মতে, গর্ডিমারের চরিত্রগুলো সেটা শাদা হোক কিংবা কালো হোক তাকে বুঝতে হলে, আপনাকে রাজনীতিকেও জানতে হবে। আর তখনই বুঝতে পারবেন ওখানকার রাজনীতি কিভাবে ব্যক্তিপর্যায়েও প্রভাব ফেলেছে। বিশাল মাপের এই লেখিকা যে নিজের স্বাধীনমতো লিখে যেতে পেরেছেন সেটা তো নয়। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকান সরকার তাঁর লেখা চারটি বই নিপীড়নমূলক সেন্সরশিপ আইন বলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। প্রতিটিই ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় উপন্যাস। ‘অ্যা ওয়ার্ল্ড অব স্ট্র্যাঞ্জার্স’, ‘দ্য লেইট বারগুইজ ওয়ার্ল্ভ্র’, ‘বার্গারস ডটার’ এবং ‘জুলাইস পিপল’ এই নিষিদ্ধ তালিকার উপন্যাস। শুধু নিষিদ্ধই ঘোষিত হয়নি। এই উপন্যাসগুলো লেখার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতারও অভিযোগ আনা হয়েছিল। গর্ডিমারের উপন্যাস সম্পর্কে তিনি নোবেল বক্তৃতায় বলেছেন, একজন লেখকের সৃষ্ট চরিত্রগুলো কিংবা লেখার বিষয়বস্তু নির্ধারণে লেখকের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশেষ করে সামাজিক পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। একটু বেশি বলা মনে হলেও এই সামাজিক পরিস্থিতিটা খুব একটা সরলপথে চলে না। সমুদ্রের মহাশক্তির কাছে একজন জেলের জীবন যেমন, ঠিক তেমনি। ‘কংগ্রেস অব সাউথ আফ্রিকান রাইটার্স’-এর কো-ফাউন্ডার গর্ডিমার। আর এই সংগঠনটির অধিকাংশ সদস্যই কৃষ্ণাঙ্গ। ‘কংগ্রেস অব সাউথ আফ্রিকান রাইটার্স’-এর সুবাদে এডওয়ার্ড সাঈদ এবং সুসান সুনত্যাগ-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। তাঁর চিন্তাভাবনাও ছিল ব্যতিক্রমী। সামাজিক মূল্যবোধ এবং অর্থনৈতিক বিরূপ অবস্থার প্রতিক্রিয়ার দায়কেও তিনি অন্য সাধারণের মতো দেখতেন না। জোহানেসবার্গে যখন অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়, সেখানে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার চেয়ে অপরাধী হওয়ার কারণ খুঁজে বের করে তা দূর করার বিষয়ে তাকে দৃষ্টি দিতে দেখা যায়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনাও উল্লেখ করা যায়। একবার তাঁর এনগেজমেন্ট আংটিটি চুরি হয়ে যায়। তাঁর ঘরের দ্রব্যাদিও চুরি হয়ে যায় সেই সময়। তিনি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বললেন, যদি তরুণদের সমস্যা নিরসনের ব্যবস্থা না করা হয়, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে শুধু শাস্তি দিয়ে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তিনি সেভাবেই অপরাধ বিষয়গুলোকে তাঁর লেখাতেও স্থান দিয়েছেন। যাতে স্পষ্ট হয়ে যায়—অপরাধী নয়, অপরাধের কারণ দূর করতে না পারলে সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রত্যাশা করা যায় না। গার্ডিয়ান পত্রিকায় তাঁর সেই মানসিকতার কথা স্পষ্টভাবে তিনি বলেছেনও। ‘আমি মনে করি অপরাধের পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হবে আগে। তরুণদের সুযোগবঞ্চিত রেখে অপরাধ দমন করা যাবে না। তাদের শিক্ষা প্রয়োজন, প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আর তখনই তারা অপরাধ করা থেকে বিরত থাকবে।’ জীবনকে সহজভাবে দেখার অসাধারণ কৌশল জানা ছিল তাঁর। অন্তত লেখায় মনোনিবেশ করলে দেখা যাবে, তিনি সমাজভাবনাগুলোকে এত দক্ষতার সঙ্গে তুলে এনেছেন যেন একেকটি ছবি। তারপরও সেগুলো প্রবন্ধ কিংবা নিবন্ধ নয়। প্রতিটিই সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। পড়তে গিয়ে মনে হবে—সত্যের চেয়ে বড় সত্য লুকিয়ে আছে তাঁর সাহিত্যকর্মগুলোতে। একজন সাংবাদিক যে প্রতিবেদন তৈরি করেন, একজন জীবনীকার যেভাবে জীবনী রচনা করেন, সেভাবে তিনি জীবনকে তোলে আনেননি। অথচ তাঁর গল্পে থাকে রাজনীতি ও নীতির গহিনের কথা। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে আমাদের আহ্বান জানান রাজনৈতিক অঙ্গনে ঢোকার জন্য, রাজনীতির ভেতরে কী আছে তা জানার জন্য। আর নিজের ভেতরে জন্ম নেয়া রাজনীতির বিষয়গুলোও কৌশলে প্রকাশ করে দেন লেখার মাধ্যমে। ক্লিংগমেনের মন্তব্য এগুলো। তিনি আরো বলেন, গর্ডিমার আফ্রিকার একটি খনি অঞ্চলে জন্ম নেয়া বিরল প্রতিভার অধিকারী লেখিকা। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই জায়গা সম্পর্কে তাঁর গর্ববোধ ছিল প্রচণ্ড। ইউনিভার্সিটি অব ক্যাপটাউনে ১৯৭৭ সালে বক্তৃতাকালে গর্ডিমার উল্লেখ করেছেন, আফ্রিকা আমাকে অনেক দিয়েছে। আফ্রিকা তো আমার কাছে স্বপ্নের জায়গা। ইউরোপীয়দের কেউ কেউ আফ্রিকাকে ভালো চোখে না দেখতে পারেন, কিন্তু আফ্রিকা আফ্রিকাই। এর তুলনা আফ্রিকা ছাড়া আর কিছু না। কেউ বলতে পারেন আফ্রিকা পিছিয়ে পড়া একটি জায়গা, এমনকি সুন্দরও না। কিন্তু সেখানেই আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা। গর্ডিমার ছিলেন ইহুদি। বাবা-মা সেখানকার অভিবাসী। বাবা এসেছেন লিথুয়ানা থেকে, মা ইংল্যান্ড থেকে। গর্ডিমার স্পষ্টতই বলতেন, তিনি এবং তাঁর পরিবার সর্বোতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাস করতেন। এগার বছর বয়সে তাঁর হূদরোগ ধরা পড়ে। যে কারণে তাঁর মা তাঁকে স্কুল থেকে সরিয়ে আনেন। এমনকি নাচের ক্লাসগুলোও করতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। গৃহশিক্ষক দিয়ে তাঁর লেখাপড়া চালানো হতে থাকে। কয়েক বছর তাঁকে বিশ্রামে রাখার ব্যবস্থা করেন তিনি। গর্ডিমারও বলেছেন এই বিষয়ে। বিবিসি ম্যাগাজিনে তিনি শ্রোতাদের বলেছেন, আমার মা যেভাবে আমাকে নজরে নজরে রাখতেন তাতে মনে হয় আমি দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় পড়ে যাই। মা তাঁকে কাছছাড়া করতেন না। বয়ঃসন্ধিকালটাও তাঁকে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে কাটাতে হয়েছে। বিকেলে মা তাঁকে বই পড়তে দিতেন। সেখান থেকেই লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। স্থানীয় পত্রিকায় শিশুদের পাতায় লেখালেখি দিয়ে শুরু হয় তাঁর লেখার অভ্যাস। আর ১৫ বছর বয়সে তিনি প্রথম বড়দের লেখা লেখেন। একসময় জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেখানেও দেখেন বর্ণবাদ কিভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতেও তিনি ড্রাম পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা লাভের সুযোগ তৈরি করে নেন। যিনি ছিলেন দীর্ঘকালীন এবং ঘনিষ্ঠতর বন্ধুদের একজন। ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যাপটাউন’-এ থাকাকালে তিনি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেখেন, কয়লাখনির কালো শ্রমিকরা যেসব দোকান চালাত সেখানে শ্বেতাঙ্গরা হাত দিত না। দুর্বিসহ ঠেকেছে সেই দৃশ্য তাঁর কাছে। তিনি তাঁর লেখকবন্ধুদের এই অনুভূতির কথা পরবর্তীকালে বহুবার বলেছেন। ১৯৪৯ সালে তিনি ‘ফেইস টু ফেইস’ গল্পসংগ্রহ প্রকাশ করেন। তখন থেকে তাঁকে দেখা যায়, তিনি নিউইয়র্কারে গল্প দিচ্ছেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য লাইয়িং ডেইস’ প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায় স্বর্ণখনির এলাকায় মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ পরিবারের একটি মেয়ে বেড়ে ওঠার কালে কৃষ্ণাঙ্গদের বিষয়ে কিভাবে উপলব্ধি করতে থাকে। নোবেল পুরস্কার গ্রহণকালে প্রথম উপন্যাসে বর্ণিত গল্প সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নিজের জীবনের প্রতিফলন সেখানে আছে কি না। তিনি বলেছিলেন, ‘উপন্যাসে লেখকের অন্তরের অন্তস্থল থেকেই গল্প আসে’। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন জেরাল্ড গেভরনস্কি। বিবাহবিচ্ছেদ হলে ১৯৫৪ সালে তিনি রেইনহোল্ড সিজারকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন দার্শনিক আর্নেস্ট সিজারের ভাস্তে। রেইনহোল্ড সিজার ২০০১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। প্রথম পক্ষের কন্যা ওরিয়েন দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র হুগো। দেশে গণতন্ত্র ফিরে এলে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আচ্ছা দেশে কি সাহিত্যের স্বাধীনতা পাওয়া যাবে?