‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার সবগুলো রিপোর্ট আমি নিজে করেছি’

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪৭
অনুবাদ ও ভূমিকা :শামস আরেফিন আপনার সাথে সাক্ষাত্কারটি আপনার সম্পাদনা জগতে প্রবেশের সময়কাল ১৯৬৯ সাল থেকে শুরু করতে চাইছি। কী বলেন? খুশবন্ত সিং : হিন্দুস্থান টাইমসে ১৯৬৭ সালে দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ পাই। কিন্তু রকফেলার গ্র্যান্টের এই অনুরোধ আমি রক্ষা করতে পারিনি। তারা আসলে মি. রমনকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তেমন যোগ্য কোনো সম্পাদক খুঁজে পাচ্ছিল না। আমি তাদের জানাই—সম্পাদকের দায়িত্ব নেয়ার জন্য দু-বছর সময়ের প্রয়োজন। তখন আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশ বিষয়টি পড়াচ্ছিলাম। আর এই সময় তারা আমাকে চাকরিতে যোগদানের অনুরোধ জানায়। তখন এই অনুরোধ কি আপনার সাহিত্যচর্চা থেকেও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়? খুশবন্ত সিং : নিশ্চয় তা লোভনীয় সুযোগ। কেননা, তখন এই মানের ম্যাগাজিন একটিই ছিল। আমি দেশে ফিরে আসি আর সাংবাদিকতা পেশা পছন্দ করি। আমি ‘দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকাতে যোগদানের পূর্বেই স্থির করেছিলাম—পত্রিকাটি কীভাবে আমি পুনর্গঠন করব। কারণ, যখন ‘বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশ’ বিষয় পড়াতাম, তখন বুঝতাম কত কম জানতাম ভারতের ব্যাপারে। ১৯৬৯-এর এক গ্রীষ্মে আমি ভারতে ফিরে এলাম। আমার নিয়োগের পূর্বে তখন একজন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিল। কর্তৃপক্ষের তার ওপর তেমন আস্থা ছিল না। কিন্তু তারা কেনই বা আপনাকে সম্পাদক হিসেবে পছন্দ করল। অথচ আপনি তো আগে কোনো পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন না? খুশবন্ত সিং : আমি কিন্তু ইতোপূর্বে ‘অ্যায়ার’ এবং ‘ইউজ্যানা’ নামক একটি পত্রিকায় কাজ করেছি। যদিও তা তেমন গুরুত্ব পাওয়ার মতো বিষয় নয়। তারা আমাকে পছন্দ করল। কারণ, আমার প্রবন্ধ ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। আমি ভারতের অনেক পত্রিকায় লিখতাম। তার মানে একেবারে অখ্যাত ছিলাম না বলা যায়। আমি ‘স্টেটম্যান’ পত্রিকার জন্য নিয়মিত লিখতাম। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র জন্য মাঝেমাঝে লিখতাম। আর নিয়মিত ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর লেখক ছিলাম। আপনি বলেছেন—যখন কোনো পত্রিকার বিক্রি ব্যাপক হয়, তখন বিজ্ঞাপনের টাকা দিয়ে আর খরচ পোষায় না। এটা কি পত্রিকা লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? খুশবন্ত সিং : কারণ, তখন ‘দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’ প্রায় ৪.১০ লক্ষ কপি বিক্রি হতো। আর আমি যখন দায়িত্ব নিই; তখন এর সার্কুলেশন ছিল মাত্র ৬০,০০০। মাত্র এক বছরে এর সার্কুলেশন অনেক বেড়ে যায়। আমি পত্রিকার দোকান ও ফুটপাটের দোকানগুলোতে জিজ্ঞাসা করতাম—বিক্রি কেমন হয়? তারা আমাকে দেখেই চিনত। আর খুব খুশি হতো। তারা বলত—‘এক কপিও বাকি নেই। সব বিক্রি হয়ে গেছে।’ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও সংবাদ সংগ্রহের জন্য আমার সাপ্তাহিকটি ক্রয় করত। তখন তো আর এত নির্ভরযোগ্য পত্রিকা ছিল না। পত্রিকায় হকার সমিতি ও স্থানীয় বিক্রেতারা কোনো সমস্যা সৃষ্টি করত না? খুশবন্ত সিং : আসলে তখন তেমন কোনো প্রতিযোগিতাই ছিল না। কিন্তু যখন অশোক জ্যান পত্রিকার দায়িত্ব নিল, আমার সমস্যাও দেখা দিল। আমি আশোক জ্যানকে বললাম, ‘দেখুন আমি এই পত্রিকায় নয় বছর যাবত কাজ করছি। আমি আপনার পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়িয়েছি। আমি কারো কাছে একটু কৃতজ্ঞতা ও উত্সাহও পাইনি। হ্যাঁ, তবে সম্পাদক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া অনেক কিছু। আর ঠিক তখন মোরারাজা দেশাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি জ্যানকে বলেন—আমাকে যেন পত্রিকাটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কেননা, আমি মিসেস গান্ধীর সমর্থক। সত্যি আমি গান্ধীকে সমর্থন করতাম। কেননা, আমি মনে করি—মিসেস গান্ধী তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য তাঁর কৃতিত্বটুকু স্বীকার করা হয়নি। আর জরুরি অবস্থা তিনি বাধ্য হয়ে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু মিসেস গান্ধীকে আমি কখনো একচোখা হয়ে সমর্থন করিনি। আপনি কিভাবে মিসেস গান্ধীর এত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন? খুশবন্ত সিং : আমি ‘দ্য ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’-এ যোগদানের পূর্বে তাঁর সাথে বারকয়েক সাক্ষাত্ করেছিলাম। আমি ১৯২০ সালে তাঁর সাথে প্রথম লাহোরে সাক্ষাত্ করি। যখন তিনি কাশ্মীর থেকে লাহোরে যান। তিনি লাহোরে আমার বন্ধুদের সাথে অবস্থান করছিলেন। আর বন্ধুরাই তাঁকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর লালবাহাদুর শাস্ত্রী সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালে আবার সাক্ষাত্ হয়। তিনি কিছুটা গম্ভীর থাকতেন আর কদাচিত্ অফিসে আসতেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নিউ ইর্য়ক টাইমস তাঁকে নিয়ে প্রোফাইল লিখতে বলল আমাকে। কিন্তু আমি নিজেও তখন তাঁর সর্ম্পকে খারাপ ধারণা পোষণ করতাম। আমি তখন লিখলাম, ‘পুরো ভারতবর্ষ অবাক হয়ে গেছে—তিনি কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন। অথচ তিনি যদি সরকারি অফিসে একজন সাধারণ কেরানির চাকরির জন্যও দরখাস্ত করতেন, তবে কোনোদিনও চাকরি পেতেন না। কারণ, তাঁর মেট্রিকুলেশন পাস করার সার্টিফিকেটও নিজের নামে ছিল না’। আর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর সাথে সাক্ষাতের আশাও করিনি। কারণ, তাঁকে অনেকটা অসহনশীল মনে হতো। তাঁর সাথে পত্রিকায় নিয়োগ পাওয়ার পর এক-দু’বার সাক্ষাত্ করি। কেননা, কর্তৃপক্ষ আমাকে তাঁর সাক্ষাত্কার সংগ্রহ করতে বলেছিল। কিন্তু তাঁর পরিবারের সাথে মেশার পর তাঁকে জানতে পারলাম। আর তখন তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন। জরুরি অবস্থা চলাকালে আমি সঞ্জয়ের সাথে এক-দু’বার সাক্ষাত্ করি। তখন মিসেস গান্ধীকে গাছ রোপন করতে দেখতাম। ক্ষমতা ত্যাগ করার পর আমি তাঁর বাড়িতে দু-তিনবার প্রতি সপ্তাহে যেতাম। যখন ‘ন্যাশনাল হ্যারাল্ড’-এ প্রথম দিকে যোগদান করি; তাঁকে প্রতিদিনই দেখতাম। তাঁকে বলতাম, ‘আসলে আমি আপনার কোনো সময় নষ্ট করতে চাই না। বরং আপনি আপনার একজন প্রতিনিধি পাঠান’। আমি তাঁকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুলে বলতাম। তিনি প্রণব মুখার্জির নাম বলতেন। আমি প্রণবের সাথে কয়েকবার সাক্ষাত্ করেছি। কিন্তু আমাদের সাক্ষাত্ ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তিনি শুধু বলতেন কীভাবে তাদের সাথে অসদাচরণ করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে তখন আমি মিসেস গান্ধীর বাড়িতে যেতাম। কিন্তু তখন তাঁর চারপাশে অনেক ভিড় থাকত। তিনি ভদ্রতার খাতিরে কাউকে বের করে দিতেন না। আমি হঠাত্ তাঁর কক্ষে প্রবেশ করতাম, কিছুক্ষণ কথা বলেই বেরিয়ে আসতাম। তিন ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পরও দেশের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে তিনিই ছিলেন। মিসেস ইন্দিরা আমার প্রতি সদয় ছিলেন। কারণ, আমি সঞ্জয়কে সমর্থন করি। আমি তাঁর মারুতি গাড়ির প্রজেক্ট নিয়ে পত্রিকায় লিখি। আমি সেই ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করি; এটা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। তখন সেই ফ্যাক্টরিটাকে একটা কর্মকারদের গ্রামের মতো মনে হতো। একজন সম্পাদক হয়েও ঘটানস্থলে গিয়ে সাধারণ রিপোর্টারের মতো রিপোর্ট করা—এটা কি একটা অস্বাভাবিক বিষয় নয়? খুশবন্ত সিং : অসংখ্যবার নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। আমি সেই ঘটনার ক্ষেত্রেই যেতাম, যেগুলো খুবই আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার সবগুলো রিপোর্ট আমার নিজের করা। আমি সশরীরে তখন অসংখ্যবার ঢাকায় গিয়েছি। ঢাকায় আকাশ পথে যাওয়ার অনুমতি আমার ছিল। অনেক পাকিস্তানি বন্দির সাথে কথা বলার অনুমতি আমাকে দেওয়া হয়েছিল। এ অনুমোদন কারও ছিল না। আমার লেখা সেইসব প্রবন্ধ নিয়মিত ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত হতো। আর এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর এগুলোকেই আবার আমার সাপ্তাহিকে প্রকাশ করতাম। নিউ ইর্য়ক টাইমস এই রিপোর্টগুলোর জন্য আমাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্মানি প্রদান করত। এরপর পাকিস্তানি বন্দিদের নিয়ে কাজ শুরু করলাম। আমি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করলাম। আর তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা চাইলাম। এতে মিসেস গান্ধি প্রচণ্ড রাগ করলেন। তিনি আমাকে দিল্লিতে ডেকে পাঠালেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি রাজনীতি সর্ম্পকে তেমন কিছুই জানেন না।’ আমিও প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘আমি রাজনীতি না বুঝলেও মানবিকতা কী—তা বুঝি। মানবিক দিক থেকে যা খারাপ, রাজনীতি কখনো তার বৈধতা প্রদান করতে পারে না।’ তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন আর বললেন, ‘আমাকে লেকচার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ এরপর পাকিস্তানিরা আমার প্রচেষ্টায় তাদের যুদ্ধবন্দিদের মুক্ত করে নিতে সক্ষম হয়। তাদের অসংখ্য চিঠি পেয়েছি শুধুমাত্র পত্রিকায় এ বিষয়ে লেখার জন্য। আমি যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে প্রায় সকল সৈন্য ও অফিসারের ঠিকানা আজও সযত্নে সংগ্রহে রেখেছি। বোম্বেতে ফিরে আসার পর আমি তাদের প্রত্যেকের নিকট চিঠি লিখি। একটু অস্বাভাবিক ঘটনার প্রতি আকর্ষণ সাধারণত খ্যাতিমান সাংবাদিকদের মাঝেই থাকে। আপনার ক্ষেত্রেও তা সত্য? খুশবন্ত সিং : সত্যি বলতে কি, যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে এরকম খেলার বিরুদ্ধে আমিই একমাত্র প্রতিবাদী ছিলাম। পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভারতে থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছিল। কেননা, মিসেস গান্ধী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আর মি. মুজিবেরও গান্ধীর ওপর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আমি চাইলাম—আগে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। তারপরই ওইসব যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া হোক, যাতে সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় সুনিশ্চিত হয়। আর অবশেষে ভারত তা-ই করে। আপনার সহকর্মী ও অধিকাংশ রাজনীতিবিদ আপনাকে শুধু সাংবাদিক ভাবেন। এতে কি আপনার বিরক্তি লাগে না? খুশবন্ত সিং : আমি এতে কিছুটা অহং বোধ করি। কেননা আমি রাজনীতির ওপর কলাম লেখে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছি। আমার ব্যক্তিগত অভিমত আছে। আর কারো কথায় আমার ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন হবে না। আমি অধিকাংশ রাজনীতিবিদকে বিরক্তিকর ব্যক্তিত্বের অধিকারী মনে করি। তারা শুধু নিজেদের নিয়ে ভাবে। কিন্তু কখনো চারপাশের অবস্থা নিয়ে ভাবে না। একজন সম্পাদক হিসেবে আপনি কীভাবে পত্রিকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরতেন? খুশবন্ত সিং : আমি প্রবন্ধের জন্য বিশেষ লেখক নির্বাচন করতাম। যেমন—আমি খুবই ইহুদি বিরোধী একজন মানুষ জীবনের শুরু থেকেই। আর কুররাতুলআইন হায়দার ছিল আমার পত্রিকার একজন সাংবাদিক। সে মুসলমান ও ফিলিস্তিনের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। সুতরাং আমি তাকে বললাম—তার প্রামাণ্য মতামত তুলে ধরতে। প্রমাণ করতে—কিভাবে ইসরাইল আমেরিকার ও বিশ্বের পুরো মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। আপনার তৈরি এত জনপ্রিয় ‘দ্য ইলাস্ট্রেটড উইকলি অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকার যখন দুরাবস্থা দেখলেন, তখন কেমন লাগল? সত্যি বলতে কি, ক’দিন আমি ভাণ করি—আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। অথচ বাস্তবে আমি কিছুটা আনন্দিত হয়েছিলাম। পত্রিকা কর্তৃপক্ষের শিক্ষা হয়েছে—কীভাবে সম্পাদকের সাথে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি। কারণ, তারা অনেক বিত্তবান। তাই তারা একসময় পত্রিকাটা বন্ধই করে দিলো। বিবিসি’র অভিযোগ, আপনি নাকি ঘটনাকে অতিরিক্ত আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করেন; যাতে করে পত্রিকা বেশি বিক্রি হয়। আপনি এ ব্যাপারে কী বলবেন? খুশবন্ত সিং : হ্যাঁ, তা আমি খোলামেলাভাবেই করেছি। যেমন ‘ফুলন দেবী’র জীবনী লিখতে গিয়ে এরকম কিছুটা হয়েছে। এ লেখাটা আমার শ্রেষ্ঠ রচনা। এই মহিলা আট বা নয় জন পুরুষের স্ত্রী। তাদের সবাই সমানভাবে তার সাথে বিছানায় যেত। সে তার স্বামীদের—নিজের পছন্দমতো একেক সময় একেকজনকে বেশি গুরুত্ব দিত। তাদের সবারই বয়স ছিল ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। প্রতিরাতেই সে কোনো একজনের সাথে থাকত। যতক্ষণ না ওই পুরুষের সাথে তার স্ত্রী বা প্রেমিকার দেখা হতো, আর সেই মেয়েটি তার সাথে ঝগড়া করত। আমি তার এমন তথাকথিত স্বামীর সাথে কথা বলেছি, যে এক গ্রামে বাস করত। সে কিভাবে পুরুষটিকে প্রলুব্ধ করে তাও জানতে পারি তার স্বামীর কাছ থেকে। যেমন—গঙ্গায় স্নানের সময় সে বসনহীন হতো। আর যেকোনো পুরুষের কাছে সাবান চাইত। সে নিজেই নিজেকে অর্পণ করত পুরুষদের নিকট। এমন সময় একজন পুরুষেরই বা কী করার থাকে। এমন ঘটনা অসংখ্য পুরুষ (তার স্বামীরা) আমাকে বলেছে। সে তাদের সাথে এক রাত কাটিয়েই বলত—এখন তো আমাদের মাঝে বিয়ে হয়ে গেছে। আর যখন তার সেই স্বামীর প্রেমিকা বা বউ এসব জানত তখন সে ফুলন দেবীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। বস্তির সকল মানুষের সামনে তাকে যাচ্ছেতাই বলে গালাগাল দিত। ফুলন দেবীও কম যায় না, তার ভাষা তো আরও খারাপ। আমি তার অনেকগুলো চিঠি দেখেছি। তার একটি ছিল পুলিশ ডিআইজিকে লেখা। যে ডিআইজি পুলিশ তাকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছিল। আমার ভাগ্য ভালো—আমাকে তার সাথে সাক্ষাত্ করতে হয়নি। কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল তার বোন। সে খুবই ভদ্র ও সুন্দরী। আর প্রথমে তো আমার সাথে কথা বলতেই রাজি হয়নি। আমি একশ রুপি দেওয়ার পরই সে কথা বলতে রাজি হয়। আপনি কি মনে করেন আপনি ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর তুলনায় কিছুটা হলেও ভিন্নতা আনতে পেরেছেন? খুশবন্ত সিং : আমি এমন কখনো মনে করি না। আমি মনে করি না—কোনো সাপ্তাহিকের সম্পাদক দৈনিকের সম্পাদকের তুলনায় বেশি কিছু দিতে পারে। কারণ, একটি দৈনিকে অসংখ্য সাংবাদিক ও জেলাপ্রতিনিধি-স্থানীয় প্রতিনিধি থাকে। কিন্তু একটি সাপ্তাহিকে তার তিনভাগের এক ভাগও থাকে না। শুধু পার্থক্য সম্পাদকীয় লেখেই করা সম্ভব। আপনি কি মনে করেন—টিভি সংবাদপত্রের ভূমিকা পরিবর্তন করে দিয়েছে? খুশবন্ত সিং : অবশ্যই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া টিভি চ্যানেল আপনাকে পাঠ করার বিরক্তি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমরা যেহেতু অলস; তাই আমাদের পড়ার তুলনায় টিভি দেখতেই ভালো লাগে। বিজ্ঞাপন ছাড়া টেলিভিশনের প্রোগ্রামগুলোর কোনো খারাপ দিক নেই। যদিও সংবাদ-এর সময়ে তারা আধাঘণ্টা বা তারচেয়ে বেশি নষ্ট করে বিজ্ঞাপনে। আপনি যখন মূল ঘটনা দেখবেন স্বচক্ষে, তা আপনি সকালে সংবাদপত্রের পাতায় আর পড়তে চাইবেন না। যেমন—ক্রিকেট ম্যাচ আপনি অনেক সময় ব্যয় করে দেখেন; তাই দ্বিতীয়বার আবার তা পত্রিকায় পড়ার প্রশ্ন আসে না। আর এই কারণে সংবাদ মাধ্যমগুলো হিন্দি ফিল্ম, ফিল্মের তারকাদের খবর বেশি প্রচার করে। আমি সম্পাদক থাকাকালে—কখনো এসবের সাথে পরিচিতও ছিলাম না। কারণ, সম্পাদকের দায়িত্ব হচ্ছে নতুন থিম খুঁজে বের করা। যেমন—বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তির নিত্যনতুন উত্কর্ষ ইত্যাদি। একজন সাংবাদিককে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ হতে হবে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে। নতুন নতুন ছেলেমেয়ে পত্রিকায় যোগদান করলে তাদের এসব কথা বলতাম। কারণ, তারা শুধু রিপোর্টার ছিল। আর কোনো বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন তাদের একেবারে অজানা ছিল। অথচ সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন—যদি কেউ কৃষিবিশেষজ্ঞ হয়; তাকে শুধু সেই কাজ দেওয়া হবে। তারা কোনো বিষয়ে দক্ষ হয় না। তারা শুধু ঘটনাস্থল বা মিটিংয়ে যায়, আর শুধু রিপোর্ট করে। এ কারণে অধিকাংশ পত্রিকায়ই শুধু রাজনীতিবিদদের কথায় পরিপূর্ণ থাকে। শুধু গোছানো ভাষা ব্যবহার করে ঘটনার বর্ণনা সাংবাদিকতা হতে পারে না। আপনি কি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন—আপনি ২৫ বছর আগে সম্পাদক ছিলেন। আর তখন আপনাকে এত চ্যানেল, ম্যাগাজিন, পত্রিকার সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়নি? খুশবন্ত সিং : অবশ্যই। আমার সময় এত প্রতিযোগিতা ছিল না। আর আমি জানতামও না এত প্রতিযোগিতা থাকলে কী করতে হতো। সবসময় চিন্তায় ডুবে থাকতে হতো কিভাবে করব নতুন সংখ্যার আয়োজন। অথচ আমার পত্রিকা তখন সর্বাধিক পঠিত। সাংবাদিকতায় রাজনীতি ও যৌন কেলেঙ্কারি সর্ম্পকে আপনার অভিমত কী? খুশবন্ত সিং : যদি কোনো ক্ষমতাসীন ব্যক্তি হয়, যে নিজেকে সর্বসাধারণের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলতে চায়, তখন সর্বসাধারণের মাঝে তার জীবনাচার পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়। আর যদি তার কোনো নুন্যতম দুর্বল বিষয় থাকে, তখন তা প্রকাশ করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবেই যদি তিনি ভালো হন, তবে নিশ্চয় তিনি প্রশংসার দাবিদার। যৌন কেলেঙ্কারি, ধর্ম আর রাজনীতি ভারতীয় সাংবাদিকতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় তিনটি বিষয়। আপনার কি মনে হয়—এসবের কখনো পরিবর্তন হবে? খুশবন্ত সিং : আমি যৌন কেলেঙ্কারি সর্ম্পকে ততটা জানি না। তবে মনে করি, ধর্মকে সবসময় সাংবাদিকতা থেকে আলাদা রাখা উচিত। আমার কোনো ক্ষোভ নেই স্রষ্টায় বিশ্বাসী মানুষের ওপর, যারা উপাসনালয়ে যায়, পুজো করে আর পুজোয় অনেক সময় নষ্ট করে। এটা তাদের ভালোলাগা। যদি এসব করে তারা কোনো শান্তি পায়—তবে তাদের স্বাগতম। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্ম অনেক কুসংস্কারের জনক। এ কারণেই আমি হুক্কামা, ফতোয়া ইত্যাদি ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক প্রায়োগিক দিকের চরম বিরোধিতা করি। আমি চাই ধর্মীয় উগ্রবাদ আইন করে বন্ধ করে সরকারের সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, আপনি অন্য কারো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। আর আমাদের সমাজে এটা কখনো সম্ভব নয়। আপনার কি মনে হয় চিদাম্বর ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন ঠিক পথেই আছেন? খুশবন্ত সিং : আমি চিদাম্বরের ব্যাপারে তেমন জানি না। আমি তার অর্থায়নের ব্যাপারেও জানি না। আমি শুধু মনমোহনের ব্যাপারে এটুকুন বলতে পারি—তিনি এমন একটি বিবৃতিও দেননি, যা নিয়ে কেউ আপত্তি করতে পারে। তিনি মুখ দিয়ে কাউকে আক্রমণও করেননি। তিনি মেপে কথা বলেন। ঠিক একই রকম সোনিয়া গান্ধীর বেলায়ও বলতে হয়; তারা দুজনেই জানেন তাদের নিজস্ব ক্ষমতা ও করণীয় কী। তাদের কেউ বিজেপি নেতৃবৃন্দের মতো এখানে-ওখানে কাউকে আক্রমণ করে বসে না। এটা কি সম্ভব—একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েও মনমোহন রাজনীতির বাইরে অবস্থান করবেন? এর ফলে কি তিনি মন্ত্রিসভার অসহযোগিতার মুখোমুখি হবেন না? কারণ মন্ত্রীরা চান, সবসময়ই নিজের অতিরিক্ত প্রভাব খাটাতে? খুশবন্ত সিং : হ্যাঁ এটা সত্য—মন্ত্রীসভার বোঝা তাঁর কাঁধে চেপেছে তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও। কিন্তু মন্ত্রীসভাকে নিয়ন্ত্রণ মানেই তো সরকার পরিচালনা। কারণ যতই বলেন—এটি একটি বিভিন্ন দলের সমর্থনে কোয়ালিশন সরকার। যদি ছোটদলগুলো চায়, তারা সরকার ভেঙে দিতে পারে। সরকারকে সবসময় বিরোধীদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে হয়। আর বামদের এক্ষেত্রে অনেক ছাড়ও দিতে হয়। তবে আমি বলব না, তিনি খুবই ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষ। কেউ জানে না, সামান্য দুর্ঘটনায় পুরো পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিরোধিরা এমন সামান্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি যাতে সরকার ভড়কে যায়। মনমোহন নিজেও এই দায়িত্ব নিয়ে খুশি নন। তাঁকে অনেক কাজ করতে হয় এমন লোকদের সাথে; যখন তাঁকে গুরুত্বহীন করার মতো অনেক লোক মন্ত্রীসভায় রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির প্রতি আপনার অনেক শ্রদ্ধা। তাঁর ব্যাপারে আপনি এখনো কি ভাবেন? খুশবন্ত সিং : একজন মানুষ হিসেবে আমি তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করতাম। তাঁর সাথে সাক্ষাত্ করলেই তিনি আপনাকে উষ্ণ সম্ভাষণ জানাবেন। আমার কাছে মনে হয়, তিনি নরশিমা রাওয়ের মতোই একজন সহজ-সরল মানুষ। যে ব্যক্তি কখনোই ভাবতে পারেনি—বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটবে। শুধু মিছিল হতে পারে, তিনি ভেবেছিলেন। তিনি দাবি করেন—এখানে মিছিল ছাড়া আর তেমন কিছুই হবে না। আমি মনে করি—এমনটা ভাবা নিরেট বোকামি ছাড়া কিছু নয়। এর জন্য মূলত শিবসেনারাই দায়ী। আর এটাও অবাক হওয়ার মতো বিষয়—সরকারের গোয়েন্দারা তাঁকে জানায়নি শিবসেনারা মসজিদটা ভাঙতে যাচ্ছে। নিশ্চই আপনি তাঁকে এরপর টিভিতে ভয়ঙ্কর রাগান্বিত অবস্থায় দেখেছেন। যখন ‘মুরলি মনোহর’-এর মতো ব্যক্তিরাও অনেক আনন্দিত ছিল। আমি মনে করি, আদভানি এই ঘটনার জন্য পুরোপুরি দায়ী। কিন্তু বাজপেয়ি কখনো এসব তথাকথিত গুঞ্জনে কান দিতেন না। তিনি হূদয়ছোঁয়া এক বক্তব্য দিলেন, যা বিখ্যাত কবি ইকবালের সংজ্ঞানুযায়ী একেবারে মহাননেতার গুণাগুনের সাথে মিলে যায়। আমিও জানি—মসজিদটি ভাঙার পর তিনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে একটা কবিতাও লিখেছিলেন। তিনি এটা আবৃত্তি করে আমাকে শুনিয়েছিলেন। আমি এটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করি; আর আমার পত্রিকায় তা প্রকাশ করি। মনে হয় তিনি আমাকে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন এজন্যই, যাতে আমি তা আমার পত্রিকায় প্রকাশ করি। আপনি সবসময় হিউমারকে সাংবাদিকতায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন? খুশবন্ত সিং : আমি আপনার সাথে সম্পূর্ণ একমত। কারণ, হিউমার নীরবঘাতক অস্ত্র হতে পারে। আপনি এর মাধ্যমে যে কাউকে হাসির পাত্র করে দিতে পারবেন। তার প্রভাব-প্রতিপত্তিকে খুন করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু অধিকাংশ সাংবাদিকই তা করে না। তারা শুধু ক্ষিপ্ত হতে পারে, কিন্তু তা কোনো কাজেই আসে না।