আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ব্যবসাকে বৈধ করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন (সূরা বাকারা, আয়াত-২৭৫)। কাজেই সুদযুুক্ত ব্যবসা বৈধ নয়। ব্যবসায় সম্পর্কে বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (স.) এর সহীহ হাদীস হচ্ছে “সর্বাপেক্ষা পবিত্র রোযগার হচ্ছে ব্যবসায়ীদের রোযগার। তবে শর্ত হচ্ছে তারা যখন কথা বলবে তখন মিথ্যা বলবে না, ব্যবসার উদ্দেশ্যে পন্য ক্রয় করতে গিয়ে সেটা মন্দ সাব্যস্ত করে মূল্য কম দেয়ার চেষ্টা করবেনা। নিজের মাল বিক্রয়ের সময় সে মালের অযথা তারিফ করে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করবেনা”। আরেক সহীহ হাদীসে রসূলুল্লাহ (স.) বলেন :যারা আল্লাহকে ভয় করে সত্ভাবে লেনদেন করে, সেসব লোকেরা ছাড়া কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা গোনাহগারদের কাতারে উত্থিত হবে। উল্লেখিত হাদীস দ্বারা ব্যবসায়ীদের যেমন উচ্চ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে তেমনি অসত্ ব্যবসায়ীদের ভয়াবহ পরিণামের বিষয়ে জ্ঞাত করা হয়েছে। মানুষের প্রয়োজন মিটানোর জন্যই ব্যবসায়ের উদ্ভব। আদিকালে ব্যবসায় পণ্যের বিনিময়ে পন্য ব্যবহার করা হতো। এ লক্ষ্যে মানুষ নিজের দেশের দ্রব্য সামগ্রী যা অন্য দেশে ছিল না তা নিয়ে বের হতো এবং নিজের দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় এমন দ্রব্যসামগ্রী সে দেশ থেকে ক্রয় করে আনতো। এভাবেই দেশে বিদেশে ব্যবসার প্রবর্তন ও প্রসার। যারমূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের প্রয়োজন মিটানো এবং মানুষের কষ্ট লাঘব যা নেক কাজ। আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (স.) স্বয়ং খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ব্যবসায় পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। তার ব্যবসায় পরিচালনার সততা ও সফলতায় মুগ্ধ হয়েই খাদিজাতুল কুবরা (রা.) নবী করিম (স.) কে বিবাহ করার আগ্রহ ব্যক্ত করে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এছাড়াও অধিকাংশ সাহাবা কেরাম (রা.) ব্যবসায়ী ছিলেন। সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম ব্যবসায়ী ছিলেন হযরত ওসমান (রা.)। তিনি তার ব্যবসায় থেকে উপার্জিত অর্থ দাস মুক্তিতে, বুভূক্ষুদের অন্নের সংস্থান এবং জেহাদের কাজে ব্যয় করতেন। এরপরেও উদ্বৃত্ত থাকলে বায়তুল মালে জমা করতেন। কিন্তু আমরা যারা ব্যবসায়ী সমপ্রদায় আছি তারা কি করছি তা আমাদের ভেবে দেখা দরকার। ভাবতে হবে শুধু ইহজীবনের জন্যই নয় পরকালের জন্যও, আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের ব্যবসায়ী ভাইদের মধ্যে হাদিসে বর্ণিত শর্তাদির একটিও আছে কি? আমরা রোযার মাসটিকেও এক বছরের উপার্জনের উত্স্য হিসেবে দেখি। যার দরুণ দ্রব্যমূল্য এমনভাবে বাড়িয়ে থাকি যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায় । শুধু তাই নয়, অর্থ উপার্জনের নেশায় আমরা খাদ্য সামগ্রীতে বিষ মিশ্রিত করতে একটুও দ্বিধাবোধ করছি না। মানুষকে কষ্ট দেয়া পাপ। তার চেয়েও বড় পাপ হচ্ছে মানুষকে হত্যার প্রচেষ্টা। মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রমযান এলে দ্রব্যমূল্য অন্যান্য মাসের বাজার মূল্যের চেয়ে কমিয়ে বিক্রী করা হয়। এ পবিত্র মাসে তারা ভর্তুকী দিয়ে থাকে। যাতে রোযাদার মানুষ তার সাধ্যের মধ্যেই সকল প্রকার দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করতে পারে। শুধু তাই নয়, ধনী গরীবের মধ্যে কোন শ্রেণিভেদ না করে তারা সকলের জন্য খাবার সামগ্রী উন্মুক্ত রাখে যাতে কোন মানুষই যেন সাহ্রী বা ইফতারের খাবার পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়। এ জন্য দেখা যায় আরব বিশ্বে রমযানে কারো খাবার চিন্তা করতে হয় না। অপরদিকে আমরা ঐ চিন্তাতো দুরে থাক বরং নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর মূল্য আকাশচুম্বী করছি এবং বিষ মিশ্রিত খাবার বিক্রয় করছি। সাধারণ মানুষকে এগুলো পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ বলে বিক্রয় করছি। আমাদের বর্তমান সরকার রমযানে যাতে সাধারণ মানুষেরা কষ্ট না পায় তজ্জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। সরকারি তরফ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী যা দেশে উত্পাদিত তা এ মাসে রফতানী বন্ধ এবং যেগুলো সর্বশ্রেণীর মানুষের রোযার খাবারের জন্য আমদানী করা প্রয়োজন ঐগুলোর ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগ আল্লাহ এবং তার রসূলের পছন্দনীয় কাজ। এরপরেও কেন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে থাকবে? বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের মন মানষিকতায় লেগে আছে, এগারো মাসের উপার্জন করতে হবে এই একটি মাসে। কাজেই কে কি বললো তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু আমরা কি একটি বারও ভেবে দেখছি যে, আমি রমযান মাসের রোযা রেখে দোকানে বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে বসে অহরহ মিথ্যা কথা বলছি, নিম্নমানের দ্রব্য সামগ্রীকে উচ্চমানের বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছি। যে দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য যা নয় তারচে দু’ তিনগুন হাকিয়ে কথার মাধূর্যতা দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে বিক্রয় করে মানুষকে প্রতারিত করছি। আমাদের মধ্যে অনেকেই রোযা রেখে যে কাজগুলো করে যাচ্ছেন তাতে তারা রোযা থাকছেন না বরং উপবাস করছেন? এই রোযাদার ব্যবসায়ী ভাইকে যদি ইফতারীর সময় হবার ১ সেকেন্ড আগে ইফতারী করতে বলা হয় তাহলে তিনি কোন অবস্থাতেই ইফতারী করবেন না। রোযা রাখার সময় তো পুলিশ পাহারায় রাখা হয় না তারপরেও তো মানুষ পরিপূর্ণভাবে রোযা পালন করে। এখানে আল্লাহ ভীতি থাকা সত্বেও ব্যবসার ক্ষেত্রে এ ভীতি তার অন্তরে থাকছে না কেন? আমরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে, মিথ্যা কথা বলে যা কিছু আয় করছি তা কিসের জন্য? তা কি আমরা একটিবার ভেবে দেখেছি। সূরা তাকাসুর নাজিল হবার পর রসূল্লাহ (স.) সাহাবা কেরামদের উদ্দেশ্যে বলেন, আদম সন্তান বলে আমার ধন, আমার ধন অথচ তোমার অংশতো ততটুকু যতটুকু তুমি খেয়ে শেষ করো অথবা পরিধান করে ছিন্ন করে দাও অথবা ছদকা করে সম্মুখে পাঠিয়ে দাও। আর সবতো তুমি অপরের জন্য ফেলে যাবে। সর্বোপরি কথা হচ্ছে নিজের ভোগের জন্য মানুষের কতটুকু প্রয়োজন, যতটুকুু মাটি দ্বারা তার মুখ ঢাকা যায়। তাহলে একটু ভেবে দেখি, আমার আপনার অথবা প্রতিটি মানুষের মুখ ঢাকতে কতটুকু মাটির প্রয়োজন। আফসোস এরপরেও আমাদের অঢেল সম্পদ প্রয়োজন। সম্পদ যতই অঢেল হোক মৃত্যুর সাথে সাথেই তার উপর আমাদের কোন অধিকার বা কন্ট্রোল থাকে না। কবরে যাবার সময় তো দুটো হাত খোলা অবস্থায় যেতে হয়। ঐ হাত দু’টিতে কিছু রাখলেও তা মুষ্টিবদ্ধ করা যায় না। তারপরেও কেন আমাদের অর্থ ও সম্পদ অর্জনের জন্য প্রতিযোগীতা করতে হবে। সম্পদ রেখে যাব আমি ভোগ করবে অন্যজন, কিন্তু জবাবদিহী করতে হবে কেবল আমাকেই। এরপরেও সম্পদ চাই, প্রচূর ও অঢেল। আমাদের সকলের দৃষ্টি বাস্তবতার দিকে ধাবিত করতে হলে আমাদের একটি কাজ করা প্রয়োজন, তাহলো মৃত ব্যক্তিকে জানাজা পড়াবার আগে জানাজায় সামিল হওয়া লোকসকলকে কফিনের কাপড় থেকে তার হাত দুটো বের করে দেখাতে হবে এবং দেখিয়ে বলতে হবে দেখুন! এত সহায় সম্পত্তি রেখে আজ উনি শূন্য হাতে চলে যাচ্ছেন। এমনি করে সকলকেই সবকিছু রেখে শূন্য হাতে চলে যেতে হবে। রেখে যাওয়া অর্থ-কড়ি ও সম্পদ হারাম পন্থায় উপার্জিত হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি যার যার তাকেই করতে হবে ভোগকারীদের নয়। তাই আল্লাহ আমাদের অল্প রুজি / সম্পদে সন্তুষ্ট থাকার তওফীক দিন।
লেখক :পরিচালক (ভূমি স্টেইট), রাজউক
