আবারো মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স। আবারো সেই বোয়িং ৭৭৭। অতি সামপ্রতিক ইতিহাসে দু’বার ঘটনার শিকারের নাম কাকতালীয়ভাবে একই। তাই অনেকে বলতে বাধ্য হয়েছে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের দিকে কি কোনো অপশক্তির ‘কুনজর’ পড়েছে! গত বৃহস্পতিবার এই এয়ারলাইন্সের এমএইচ১৭ ফ্লাইটটি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম থেকে কুয়ালালামপুর যাবার পথে ইউক্রেনের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভূপাতিত হয়। এতে নিহত হয় বিমানে থাকা ২৯৮ আরোহীর সবাই।
এর আগে এবছর ৮ মার্চ একই এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ কুয়ালালামপুর থেকে ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে যাচ্ছিল চীনের রাজধানী বেইজিং। কিন্তু বিমানটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। হাজার তল্লাশি করেও কোনো ফল মেলেনি। হদিস পাওয়া যায়নি বিমানটি কিংবা তার যাত্রীদের। এবার বিমান কিংবা তার যাত্রীদের হদিস পাওয়া গেছে। তবে আস্ত বিমান নয়, টুকরো টুকরো ধ্বংসাবশেষ। কিছু অংশ পুড়ে কয়লা। আর যাত্রীরা সব মৃত। এই নৃশংস ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। কিন্তু দোষের ভাগ কেউই গায়ে মাখতে চাইছে না। যদিও কিঞ্চিত্ পাওয়া তথ্যপ্রমাণে অভিযোগের তীর উঠেছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডনেস্ক এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা রুশপন্থি বিদ্রোহীদের দিকেই। কারণ বিমানটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে এই এলাকা থেকেই।
ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই রাশিয়ায় তৈরি বিমানঘাতী ‘বাক’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে বিমানটিকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তারা বলছে, বিমানটি ১০ কিলোমিটার উপর দিয়ে উড়ছিল। তাদের কাছে যে ভ্রাম্যমাণ লাঞ্চারের ক্ষেপণাস্ত্র আছে তা দিয়ে ১০ কিলোমিটার উপরের টার্গেটে আঘাত করা সম্ভব নয়। তাদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে ইউক্রেন সরকারই বিমানটি বিধ্বস্ত করেছে বলে তারা দাবি করে। অপরদিকে, রাশিয়া দায়ী করেছে ইউক্রেনকে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সরাসরি দায়ী করেছেন রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের। ওয়াশিংটন জানায়, রাশিয়ার দেয়া চোরাই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বিমানটি নামিয়েছে বিদ্রোহীরা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উপর চরম ক্ষিপ্ত হয়েছে রাশিয়া। কিন্তু মার্কিন ও ব্রিটিশ মিডিয়া রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের পিছু নিয়েছে। পুতিনই যে গোটা ঘটনার জন্য দায়ী তা তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে চলেছে। এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবারই রাশিয়ার উপর একগুচ্ছ আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল আমেরিকা। তার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা জল্পনা শুরু হয়ে যায়।
উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিধ্বস্ত হওয়া বিমান ও তার যাত্রীদের লাশ প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। গ্রাবাভো গ্রামের এক প্রত্যক্ষদর্শী কৃষক জানিয়েছেন, মাঠে কাজ করার সময় বিমানটি ভেঙে পড়তে দেখেন তিনি। তার আগে গুলির শব্দও শুনেছেন।
মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শেষবার যখন বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তখন বিমানটি ইউক্রেনের আকাশসীমার মধ্যে ছিল। বিমানটি যখন ইউক্রেনের আকাশসীমা ছেড়ে রাশিয়ার প্রবেশের উপক্রম করছিল, সেই সময়েই কিয়েভ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রাডার থেকে হঠাত্ অদৃশ্য হয়ে যায় বিমানটি। নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও রাশিয়ার কোনও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে বিমানটির যোগাযোগ ঘটেনি। উদ্বিগ্ন হয় মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স। তাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে নিখোঁজ হওয়া সেই বিমানটি। একারণেই সাথে সাথে শুরু হয় তল্লাশি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা যায় ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি শাখতায়েস্ক অঞ্চলের মাঠ থেকে উড়ছে আকাশ ছেয়ে যাওয়া কালো ধোঁয়া। পরের ঘটনা সবার জানা।
ইউক্রেনের পূর্বদিকের এই ডোনেস্ক প্রদেশে গত কয়েকমাস ধরেই রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত উত্তপ্ত। বিচ্ছিন্নতাবাদী রুশপন্থিরা এখানেই ইউক্রেন প্রশাসনের সঙ্গে প্রবল সংঘর্ষ চালাচ্ছে। এদিন সকালেই এই প্রদেশেরই লুহানস্কে ইউক্রেন বিমানবাহিনীর একটি এসইউ-২৫ বিমান ধ্বংস করেছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তাই এই বিমানটিও যে তারা ইউক্রেনের যুদ্ধবিমান মনে করে ভূপাতিত করেছে এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত করে নিরীহ মানুষ মারার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এমনও হয়েছে, কোনও সময়ে যে দেশের বিমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে, তারাই পরবর্তী সময়ে আগ্রাসন দেখিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে ঘাতকের ভূমিকায়। যেমন, ১৯৫৫ সালে ইসরাইলের একটি যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস করে দিয়েছিল বুলগেরিয়া, এতে নিহত হয়েছিল ৫৮ জন। ১৮ বছর পর সেই ইসরাইলই লিবিয়ার বিমান গুলি করে নামিয়েছিল। যাতে প্রাণ গিয়েছিল ১০৮ জনের। ১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে অ্যাঙ্করেজ হয়ে সোল যাচ্ছিল কোরিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ০০৭। অটোপাইলটে থাকা বিমান নিজের গতিপথ থেকে বেশ অনেকটা সরে ঢুকে পড়ে সোভিয়েত কামস্কাটকার কাছে শাখালিন দ্বীপের নিষিদ্ধ আকাশসীমায়। নিরীহ বিমানকে ঘিরে ফেলে সোভিয়েত বিমানবাহিনীর তিনটি সুখোই-১৫ আর একটি মিগ-২৩। আক্রান্ত বিমানটি যে যুদ্ধবিমান নয়, তা বুঝতে পেরেও সুখোইয়ের পাইলট মেজর গেনাদি ওসিপোভিচ ছুঁড়ে মারেন মিসাইল। ঝাঁঝরা হয়ে যান ২৬৯ জন যাত্রী-ক্রু। অন্যদিকে, ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে ছোঁড়া মিসাইলে ধ্বংস হয়ে যায় ইরানের যাত্রীবাহী বিমান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫। ৬৬ জন শিশুসহ ২৯০ আরোহীর মৃত্যু হয় মাঝ-আকাশে।
জানা গেছে, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের বিধ্বস্ত বিমানের ব্ল্যাক বক্স রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের হেফাজতে। বিস্ফোরণের কয়েকঘণ্টা পর এই দাবি জানিয়েছে ওই এলাকার দখল নেয়া বিদ্রোহীরা। তবে ব্ল্যাক বক্স নিয়ে কী করা হবে, তা এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি তারা। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে চূর্ণ হওয়ার আগে এবং বিস্ফোরণের ঠিক পরের মুহূর্তে বোয়িংয়ের অন্দরে কী অবস্থায় ছিলেন যাত্রী ও কর্মীরা, তার হদিস দিতে ব্ল্যাকবক্সে রেকর্ড হওয়া কথোপকথনের নথি পাওয়া জরুরি।
এদিকে, বিমান ধ্বংসের জন্য পরোক্ষেভাবে রাশিয়াকেই দায়ী করেছেন ওবামা। তিনি বলেছেন, ‘রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীরাই যে বিমানটিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে নামিয়েছে তার প্রমাণ রয়েছে মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে। এই বিদ্রোহীদের আগাগোড়া মদদ জুগিয়েছে রাশিয়া। তবে আমেরিকা এখনই কোনও সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অপরাধী কে, তা জানার জন্য অপরাধের প্রকৃতির দিকে নজর দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। উেক্ষপণের পর ক্ষেপণাস্ত্রটি যে পথ ধরে গিয়েছিল, তার বৈদ্যুতিক পদচিহ্নটি খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। পূর্ব ইউরোপের উপর নজর রাখার জন্য যে মার্কিন উপগ্রহ মহাকাশে ছাড়া আছে, সেই উপগ্রহ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের স্থান ও কাল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে বলে দাবি করেছেন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ রিকি এলিনসন।
সবাই চায় অপরাধী সনাক্ত হোক। কারণ, ইউক্রেনের ওই অঞ্চল এখন নরকের নামান্তর। গ্রাবাভো গ্রামের বাইরে একটি ভুট্টা ক্ষেতের সর্বত্র দুইদিন ধরে ছড়িয়ে ছিল আধপোড়া ও থেঁতলে যাওয়া লাশ। এর মধ্যে অনেকের দেহ থেকেই ১০ কিলোমিটার উপর থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় প্রবল হাওয়ার বেগে জামা কাপড় খুলে গিয়েছিল। ক্ষেতের মধ্যে পড়ে থাকা নগ্ন দেহগুলো সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখানে সেখানে পড়ে থাকা এই নগ্ন লাশগুলো যেন দুনিয়ার মানুষগুলির নগ্ন রূপটিই সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে!
যেভাবে ভূপাতিত করা হয় মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমানটি
বিধ্বস্ত বিমানটি ১০ কিমি উপর দিয়ে যাচ্ছিল। ভূমি থেকে ছোড়া একটি ‘বাক’ ক্ষেপণাস্ত্র ১৯শ’ কিমি/ঘন্টা বেগে ছুটে গিয়ে এতে আঘাত করে।
দুই সেকেন্ডেই সব শেষ
বাক ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে কাজ করে
এতে বসানো রাডার ১৬০ কিমি পর্যন্ত আকাশসীমা স্ক্যান করতে পারে। এরপর এটি টার্গেটের জ্যামিতিক রূপরেখা তৈরী করে ফেলে
এরপর এটি ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্দেশ দেয় ফায়ার
করার জন্য
এই ক্ষেপণাস্ত্রের টার্গেটে আঘাত করার সফলতার
হার ৯০ শতাংশ
বাক ৯কে৩৭ ক্ষেপণাস্ত্র
১৯৮০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে তৈরী
অন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান ভূপাতিত করতে ব্যবহার করা হয়
এতে ক্রু থাকে চারজন
এর প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ১৮ ফুট লম্বা এবং এটি ১৫০ পাউন্ড ওজনের ওয়ারহেড নিয়ে উড়ে যেতে পারে
সর্বোচ্চ ২১ কিলোমিটার উচু দিয়ে
উড়ে যাওয়া বিমানে আঘাত করতে
পারে
আঘাতের জন্য তৈরী হতে এটি ৫ মিনিট সময় নেয়
টার্গেটের ৬৫ ফুট দূরত্বে গিয়ে বিস্ফোরিত হয় যাতে ডানা, ইঞ্জিনরুম, জ্বালানি ট্যাংক ধ্বংস হয়
যাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র আছে
চীন
উত্তর কোরিয়া
সিরিয়া
ইউক্রেন (৬০টি)
রাশিয়া
(৩৫০টি)
