শুধু একজোড়া সোনার দুল। তার জন্য বদলে গিয়েছিল ছোট্ট ওলগার গোটা জীবন। ভাগ্যের ফেরে মায়ের কোল ছেড়ে ঠাঁই হয়েছিল যাযাবরদের তাঁবুতে। শেষে সেই তাঁবুর জীবনই ভাগ্যে এনে দিল চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তন। পূর্ব ইউরোপের দেশ মলডোভার সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় এবার সেরা হয়েছেন বিশ বছরের সুন্দরী ও মেধাবী তরুণী ওলগা রোমানোভিচ। প্রতিযোগিতা পর্বে তার সবকিছু অন্য প্রতিযোগীদের মতো ছিল। কিন্তু মিল ছিল না একটি জায়গায়। ওলগার জীবনের লম্বা একটা দুঃখের কাহিনী আছে, যা রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে। তার জীবনটা ঠিক আর পাঁচজনের মতো নয়।
ওলগার মা তামারা লুইস বাস করতেন বেলারুশে। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ির পর তিনি মলদোভায় চলে আসেন। ওলগার বয়স তখন মাত্র চার বছর। একদিন কিছু একটা কিনতে শিশু ওলগাকে দোকানে পাঠান তার মা। কিন্তু ফাঁকা পেয়ে তাকে চুরি করে নিয়ে যায় এক যাযাবর। পরে সেই যাযাবর একজোড়া সোনার দুলের বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দেয় অন্য এক যাযাবর পরিবারের কাছে। ওলগার নতুন জীবনের শুরু এখান থেকে। ছোট্ট ওলগাকে সাদরে গ্রহণ করে নতুন পরিবার। সেখানে তার ফের নামকরণ হয়। ‘ওলগা’ মুছে গিয়ে তার নয়া পরিচিতি হয় মারিয়া প্রেইডা নামে। মারিয়াকে খুবই ভালবাসতেন যাযাবর পরিবারের সকলে। তাকে মানুষ করার দায়িত্ব নেন নতুন দাদী। ওই বৃদ্ধার কাছেই যাযাবরদের ভাষা শেখে মারিয়া। একই সঙ্গে দক্ষ হয়ে ওঠে মলদোভীয় ভাষাতেও। এর পর তাকে রুশ ভাষা শিক্ষার স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। স্কুল পেরিয়ে কলেজ। সেখানে রান্না ও হেয়ার ড্রেসিংয়ের পাঠ নেয় মারিয়া। এরই মধ্যে মলদোভার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নাম নিবন্ধন শুরু হয়। আত্মবিশ্বাসী মারিয়া নাম লেখায় সেই প্রতিযোগিতায়। সবাইকে পেছনে ফেলে সেরা সুন্দরী নির্বাচিত হয় সে।
সবই চলছিল গতানুগতিক ছন্দে। সম্প্রতি হঠাত্ সব কিছু উল্টেপাল্টে দিল তাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করা সেই দাদীর আকস্মিক অসুস্থতা। দীর্ঘ রোগভোগে কাবু বৃদ্ধা একদিন মারিয়াকে তার অতীত কাহিনী শোনান। কিন্তু তার জন্মসূত্রে পাওয়া নাম আর মা-বাবার পরিচয় তিনি জানতেন না। নাতনিকে ডেকে বলেন, ‘এবার নিজের আত্মীয়দের খুঁজে বের কর’।
কিন্তু বিশাল এই পৃথিবীতে কীভাবে খড়ের গাদায় সূঁচ খুঁজে বের করবে মারিয়া? অনেক ভেবে পরিচিত এক মনোবিদের সাহায্যে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে। অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় হদিস মেলে তার শিকড়ের। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে সন্ধান মেলে তার জন্মদাত্রীর। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ১৬ বছর আগে মলদোভার সোরোকি শহর থেকে যাযাবররা শিশু ওলগাকে চুরি করেছিল। প্রায় দেড় যুগ পার করে মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হয় মারিয়া ওরফে ওলগার। চোখের পানি তার আর বাধ মানে না। মেয়েকে হারিয়ে এতদিন পর কেমন আছেন ওলগার মা? স্থানীয় সংবাদপত্রের এক সাক্ষাত্কারে ওলগা জানিয়েছে, ‘মা খুব অসুস্থ। বিছানা ছেড়ে উঠে বসার ক্ষমতা নেই। তার বোধশক্তিও হারিয়েছে। বেঁচে আছেন, এই যা। উনি নিজের জগতেই বাস করেন। আমি ওকে আর আঘাত দিতে চাই না।’
ওলগাকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত তার পরিবার। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে নিজের তিন ছেলেকেও এক ধনী পরিবারে দান করেছিলেন ওলগার মা। আপাতত সেই তিন ভাইয়ের ফিরে আসার পথ চেয়ে দিন গুণছে চিকিত্সক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মলদোভার এই বিউটি কুইন।
