ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। ১৮ লাখ লোকের বসবাস। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত গাজার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে মিসর সীমান্ত এবং পূর্ব-উত্তর সীমান্ত বরাবর ইসরাইলের সীমান্ত আছে। এই উপত্যাকাটি শাসনের কাহিনী দীর্ঘ। গাজায় শাসকের হাত বদল হয়েছে। কিন্তু গাজার বাসিন্দাদের ওপর শোষণ কমেনি। সবাই কেবল তাদের ব্যবহারই করেছে। তারা সব সময়ই মানববর্ম হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। তাদের যারা ব্যবহার করেছে তাদের কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। কেবল তারা মরেছে। আর এই আধুনিক যুগে এসেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে গাজায় চলছে ইসরাইলের নির্মম হামলা। আর ইসরাইল দায়ী করছে হামাসকে। আর হামাস দায়ী করছে ইসরাইলকে। কিন্তু বেসামরিক নাগরিকরা জানে না তাদের অকালে চলে যাওয়ার জন্য কে দায়ী। পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যরাও জানেনা কোন পাপে তাদের এমন নির্মম পরিণতি হলো! হামলা বন্ধে চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত বিবৃতি এবং বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। কবে হবে এবং আদৌ হবে কিনা তাও জানেননা নিজ শহরেই শরণার্থী বনে যাওয়া গাজার বাসিন্দারা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি বিমান ও স্থল হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩৩ জনে। এর মধ্যে ৭৭ জন শিশু, ২৪ জন নারী এবং ১৮ জন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। আহত হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরুর পর তিন দিনে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের বয়স ১৮ বছরের কম। গত বৃহস্পতিবার গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে ইসরাইল। এর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ বিমান হামলা চালায় দেশটি। স্থল অভিযানকালে ১৩৫টির বেশি রকেট উেক্ষপণ করে হামাস সদস্যরা, তবে এতে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা তা জানা যায়নি। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের হামলায় এ পর্যন্ত ১৭ ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ২১ জনকে তারা আটক করেছেন। এক ইসরায়েলি সৈন্য নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ইসরাইল। তাদের দাবি, সেনারা ২১টি রকেট উেক্ষপণস্থল, ১০টি সুড়ঙ্গপথসহ অন্তত ২৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে এ পর্যন্ত আঘাত হানা হয়েছে। হামাসের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান আরো জোরদার করতে সেনাবাহিনীর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মিডিয়া সামলানোয় ওস্তাদ ইসরাইল: মিডিয়াকে সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টা ভালভাবেই রপ্ত করেছে ইসরাইল। গাজায় যখন শত শত লোক ইসরাইলের হামলায় মারা যাচ্ছেন তখন দেশটির মুখপাত্র সাংবাদিকদের প্রশ্নে এই হতাহতের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। কেবল একটি কথা বলে শেষ করে দিচ্ছেন। তা হলো- ‘ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভাল লাগলো’। আর এতে হয়তো সাংবাদিক উত্তেজিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ মিডিয়াকে সামলাতে ইসরাইলে একটি প্রকল্প চালু আছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের মিডিয়াকে সামাল দেওয়ার বিষয়টি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ইসরাইলি মুখপাত্রকে যখন গাজায় ইসরাইলি নাগরিকদের বাসস্থান বৃদ্ধি করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় তখন উত্তর দেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই এই বাড়ি-ঘর তৈরি করা হচ্ছে। আর যখন ইসরাইলি হামলায় বেসামরিক নাগরিক মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করা হয় তখন বলা হয়, শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যই এই হামলা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসরাইল তার শত্রুদের পরাজয়ের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। এমনকি ইসরাইল সমর্থিত বিশেষজ্ঞ এবং পন্ডিতদেরও কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া আছে। পশ্চিমা কোনো বুদ্ধিজীবী যারা ইহুদী তারা ইসরাইলের বিপক্ষে খুব একটা কিছু বলেন না। কারণ তারা জানেন, ইসরাইল খুব বেশি শক্তিশালী। তাই তারা মনে করেন, ইসরাইলের সমর্থন দিয়ে যদি ভাল কিছু করা যায়। তারা ইসরাইলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এগিয়ে যাও শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে এবং এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে শ্রদ্ধা কর।
কে দায়ী?: গাজার ১৮ লাখ বাসিন্দাদের এই দুর্বিষহ জীবন এবং মৃত্যুর জন্য কে দায়ী। ইসরাইল নাকি গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস। পশ্চিমাদের মতে, এর জন্য দায়ী হামাস। তারা রকেট হামলার মাধ্যমে উস্কানি দিয়ে ইসরাইলকে উত্তেজিত করে হামলা করতে বাধ্য করে। কারণ হামাস কখনো ইহুদীবাদী ইসরাইলকে মেনে নেয়নি। ইসরাইলের তিনজন ছেলেকে অপহরণ করে হামাস। এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই গাজায় হামলা করে হামাস। যদিও হামাস গোড়া থেকেই সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাছাড়া ইসরাইল অনেক আত্মত্যাগ করেছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। দেশটি গাজা থেকে ৯ হাজার বসতবাড়ি প্রত্যাহার করেছে। কেবল স্কুল, কলেজ, উপাসনালয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া। দেশটি আশা করেছিল, শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। কিন্তু ইসরাইলকে প্রতিনিয়ত হামাসের রকেট হামলার স্বীকার হতে হয়েছে। কিন্তু খুব কমই দেখা যায়, হামাসের রকেট হামলায় ইসরাইলের কোনো বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। কিংবা কোনো শিশু মারা যায়। কিন্তু ইসরাইলের হামলায় এর কোনোটাই বাদ যায় না। ইসরাইলের হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের বাড়ি, স্কুল, কলেজ, মসজিদ এবং হাসপাতাল ধ্বংস হচ্ছে। ইসরাইল সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, হামাস এসব স্থানে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ রাখছে। যুদ্ধ বাধাতে ইসরাইল যে কিছু করছেনা তা নয়। তারাও হামাসকে বাধ্য করছে রকেট হামলা করতে। ইসরাইল চায় ফিলিস্তিন নামক কোনো রাষ্ট্র যাতে বিশ্বের মানচিত্রে না থাকে। তারা রাষ্ট্রটি দখল করতে চায়। ইসরাইল চায় বিশ্ব তাদের ইহুদিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিক। আর এজন্য তারা যা ইচ্ছা তাই করতে চেষ্টা করে। গাজায় যে বিদ্যুত্ আছে তা সরবরাহ করে ইসরাইল। গত শনিবার ইসরাইল বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে অন্ধকারে আছে গাজাবাসী। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব হবে যখন ইসরাইল আর গাজায় বোমা হামলা চালাবে না। গাজা দখল করবে না। মানুষের প্রতি নির্যাতন করবে না। তাদের সঠিকভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাদের নিজ বাড়িতে ঘুমাতে দিতে হবে, তাদের স্কুল-কলেজ ও মসজিদে যাওয়ার স্বাধীনতা থাকতে হবে। এখন এর কোনটাই গাজাবাসীর নেই। হামামকেও ইসরাইলের দিকে রকেট না ছুঁড়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। যদি সেটা না হয় তাহলে ইসরাইলের শিশুরা এবং ফিলিস্তিনের শিশুরা শান্তিতে থাকতে পারবে না।
বাড়ি যখন বাসা: গাজাবাসী তাদের বাড়িতে বসবাস করতে পারছেন না। তাদেরকে সংকেত দিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বলছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। বাড়ি থাকলে জীবন বাঁচবে, না থাকলে চিরতরে কেবল বাড়ি ছেড়ে নয়, পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাদের নিজ বাড়ি (স্থায়ী বাসস্থান) এখন বাসায় (অস্থায়ী) পরিণত হচ্ছে। অর্থাত্ নিজ গৃহেই পরবাসী তারা। জীবন বাঁচাতে তাদের ঘর ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে, আশ্রয় নিতে হচ্ছে শরনার্থী আশ্রয় কেন্দ্রে। অর্থাত্ নিজ শহরে তারা শরণার্থী। কেউ আবার পরিণত হচ্ছে যাযাবরে। তারা শহরের বাইরেও যেতে পারছেননা। কারণ গাজা থেকে বের হওয়ার প্রায় সব পথই বন্ধ। জাতিসংঘ জানিয়েছে, তারা ৩৪ টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে। এসব শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজন ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইল তাদের বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করছে। আর হামাস তাদের অস্ত্র রক্ষায় বেসামরিক নাগরিকদের ব্যবহার করছে। অর্থাত্ কোথাও বোমা মানুষকে নিরাপদ রাখছে এবং কোথাও মানুষ বোমাকে নিরাপদ রাখছে। হামাস বেসামরিক নাগরিকদের মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ তারা গাজা নিয়ন্ত্রণ করেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফও এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ইসরাইল হামাসের রকেট হামলা থেকে তার বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে ‘আইরোন ডোম মিসাইল’ ব্যবহার করছে।
শিগগিরই সংকট নিরসন হবে?: সংকট নিরসনে আজ সোমবার রাতে কায়রোতে বৈঠকে বসার কথা আরব লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের ক্রমাগত চাপের কারণে সহিংসতা বন্ধে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন এই নেতারা? অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার সঙ্গে বহির্বিশ্বের একমাত্র যোগাযোগের পথ রাফাহ ক্রসিং খুলে দেয়ার জন্য মিসরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত শুক্রবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। তিনি ইসরাইলের আত্মরক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে বেসামরিক নাগরিক হতাহত কমিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মিসর, তুরস্ক, জর্ডান, কাতার এর আগে মিসর দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বিশ্ব সমপ্রদায় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার বিষয়ে ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়েছেন। গত বুধবার তিনি ভারতের সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভিকে একটি সাক্ষাতাকারে এ কথা বলেন। তিনি একটি কার্যকর সংলাপে বসতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান। অস্ত্রবিরতির উদ্যোগ জোরদার করতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ওই মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন। ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস অস্ত্রবিরতি আলোচনার জন্য মিসর ও তুরস্ক সফর করেছেন। চলতি সপ্তাহে তার কাতার সফরের কথাও রয়েছে যেখানে হামাসের নেতা খালেদ মিশাল রয়েছেন। তবে তার সঙ্গে দেখা করবেন কিনা সেটি জানা যায়নি। মিসর যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব দিয়েছিল তা আর পরিবর্তন করবে বলে শনিবার জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মিসরের সরকার হামাসের বিরোধী। ফলে তারা সংকট নিরসনে তথা হামাসের পক্ষে যাবেন এমন আশা করা যায় না। ফ্রান্স চায় কাতার মধ্যস্থতা করুক। আর ইসরাইল চায় মিসর মধ্যস্ততা করুক। এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিতে খুব শিগগিরই সংকট সমাধানের লক্ষণ দেখছেন না আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
