বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজার নবজাতক শিশুর জন্ম হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার শিশুর ওজন ১.৫ কেজি বা তার চেয়ে কম। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম গ্রহণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্মগ্রহণকারী অপরিণত নবজাতক শিশুরা সাধারণত রেটিনোপ্যাথি অফ প্রিম্যাচুরিটি রোগে ভোগে। যা জন্মগত অসম্পূর্ণ গঠনের কারণে হয়। জন্মের ৩০ দিনের মধ্যে চিকিত্সা না হলে এ ধরনের অপরিণত নবজাতক শিশু ৬ মাস বয়সের পূর্বেই অন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেয়া শিশুর চোখ পরীক্ষা, বাবা-মা ও প্রসূতি এবং শিশু চিকিত্সকের সচেতনতা এবং নবজাতকের চোখের চিকিত্সা সেবার ওপর জোর দেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা। তারা মনে করেন নির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও এই কারণে অন্ধত্বে সংখ্যা নিতান্তই কম না। এই বিষয় শুধু বাবা-মা নন, চিকিত্সকদের মধ্যে অজ্ঞতা আছে। তাই বিষয় প্রচারণাও হ্রাস করতে পারে অনেক শিশুর অন্ধত্ব।
বর্তমান বিশ্বে এক কোটি ৯০ লাখ শিশু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, তার মধ্যে ১৪ লাখ শিশু অন্ধ। তাদের মধ্যে ৬০ ভাগ শিশু ৫ বছর পূর্ণ হবার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বে প্রতি মিনিটে একজন শিশু অন্ধত্ব বরণ করছে। অরবিস ইন্টারন্যাশনালের এক পরিসংখ্যানে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
চিকিত্সা সেবার উন্নয়নের ফলে দেশে নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেয়া অপরিণত নবজাতকরা এখন মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের চোখের রেটিনা সুগঠিত না হওয়ায় অনেকেই অন্ধত্বের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাই তাকে অবশ্যই অন্যান্য চিকিত্সার সাথে চোখ স্ক্যানিং বা চক্ষু পরীক্ষার পরামর্শ দেন অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ কান্ট্রি ডাইরেক্টর ডাঃ মুনির আহমেদ।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম গ্রহণকারী শিশুদের সেবা প্রদানের জন্য হাতে গোনা কিছু চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান আছে। যা শুধুই বড় শহর কিংবা ঢাকা কেন্দ্রিক। তার মধ্যে শিশুর চক্ষু স্ক্যানিং এর ব্যবস্থা আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বার্ডেম ও ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনষ্টিটিউট এন্ড হাসপাতালসহ নিতান্তই কম প্রতিষ্ঠানে। যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। অনেকে আবার এ সম্পর্কে জানেও না। তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যগত জটিলতা, পুষ্টি-হীনতা ও অনেক সময় রোগাক্রান্তের কারণে শিশু নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মে। এরকম শিশুর শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না।
চিকিত্সা বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে এখন অনেক শিশুই বেঁচে যায়। এই বিষয়ে ঢাক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের চিকিত্সক অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ইত্তেফাককে বলেন, ৩৫ সপ্তাহের যত আগে শিশু জন্ম গ্রহণ করবে তাদের মধ্যে চোখের সমস্যা তত বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আবার ৩৬ সপ্তাহের যত পরে শিশু জন্ম নেবে তাদের মধ্যে সমস্যার আশঙ্কাও কমে যাবে। তবে রেটিনোপ্যাথি অফ প্রিম্যাচুরিটি রোগ মানেই অন্ধত্ব নয়। সময় মতো চিকিত্সা নিলে তা ভাল হয়। ২০-৩০ সপ্তাহের মধ্যে চোখ স্ক্যানিংসহ চিকিত্সার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে প্রথমবারের মত এ ধরনের শিশুদের চিহ্নিত করে চিকিত্সা সেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে নবজাতক শিশুদের এই চিকিত্সা সেবা অরবিস ইন্টারন্যাশনালের কারিগরি ও ঢাকাস্থ ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনষ্টিটিউট এন্ড হাসপাতালের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল প্রদান করা হবে। ডাঃ মুনির আহমেদ আরও বলেন, এখনও আমাদের দেশের ৭৫- থেকে ৮০ শতাংশ মা বাড়িতে সন্তান জন্ম দেন। বাড়িতে জন্ম দেয়া মা বুঝতে পারেন না তার শিশুর রেটিনাগত সমস্যা আছে। তাই ডাক্তার, নার্সসহ যারা বাড়িতে সন্তান প্রসব করান সেসব ধাত্রীদের নির্দিষ্ট সময়ের আগে অপরিণত জন্মদানের চোখের সমস্যা বিষয়ে সচেতন করতে হবে। আমাদের এই বিষয় অধিক প্রচারণা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
