কৈশোরের ফড়িং ধরা দিন-রাত পেরিয়ে সবেমাত্র যৌবনের সবুজে ওড়াউড়ি। মন খারাপ করা কোনো বিষণ্ন ঘোর সন্ধ্যায় একটা গান বুকের খুব গভীরে হাহাকারে জন্ম দিয়েছিল। সুবীর নন্দীর গাওয়া ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে একটি কথায় শুধু জেনেছি আমি, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই, প্রেম বলে কিছু নেই, কিছু নেই।’ সেই মনমরা ঘোর সন্ধ্যায় পুড়ে যাওয়া বুকের মধ্যে এক আজলা জলের সন্ধান দিয়েছিল সেই গান। দিন-রাত উজাড় করে গানটির কথা, সুর মনের মধ্যে বেজেছে। প্রথম পুড়ে যাওয়া মনের মধ্যে বৃষ্টির পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল। অনেক বছর পরে জেনেছি গানটি লিখেছিলেন নজরুল ইসলাম বাবু। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অনেক আগে। কিন্তু তার সৃষ্টি রায় গেছে। কাব্যসমৃদ্ধ অনেক শ্রোতাপ্রিয় গান লিখেছেন নজরুল ইসলাম বাবু। ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না।’ তাঁর অমর সৃষ্টি। যার সুর রচনা করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। আর ‘হাজার মনের কাছে’ গানটির সুর রচয়িতা শেখ সাদী খান। বাবু ভাই বেঁচে থাকলে তাকে প্রশ্ন করতাম, আপনি কি হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে সেই উত্তরটি পেয়েছিলেন?
তারুণ্যের মাতাল মাতাল উচ্ছল দিনগুলোতে মনের মধ্যে দোলা দিয়েছিল ‘শোন গো দখিন হাওয়া প্রেম করেছি আমি, জেগেছে চোখেতে নেশা, দিক ভুলেছি আমি।’ মীরা দেব বর্মণের লেখা, শচীন দেব বর্মণের সুরে গানটি ভাসিয়েছিল দারুণ তোড়ে। কী এক অদ্ভুত ভালোলাগা ছুঁয়েছিল দুচোখে কিংবা আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা সুবল দাসের সুরে মাহমুদুন্নবী ও সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘তুমি যে আমার কবিতা, আমার বাঁশির রাগিনী, আমার স্বপন আধো জাগরণ, চিরদিন তোমারে চিনি।’
গানটি কি কাঁপন জাগায়নি অসংখ্য তরুণের বুকের মধ্যিখানে। নীল খামের চিঠিতে কী প্রেমিক তুলে দেয়নি গানের পঙিক্তগুলো? সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই। কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা ও সুর করা ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো, দিও তোমার মালাখানি, বাউলের এই মনটারে... গানটি এক অচেনা যন্ত্রণায় কাতর করে দেয় বুকের প্রান্তর। নীল-নীল শূন্যতা ছড়িয়ে যায়। চোখঝাপসা হয়ে আসে। দুচোখে হাত রেখে বুঝতে পারি অনেক কেঁদেছি। মান্নাদের গাওয়া ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখনও কি আগের মতো আছো, নাকি অনেকখানি বদলে গেছ, খুব জানতে ইচ্ছে করে...’। গানটি বেদনায় আহত করে বুকের চারপাশ। হঠাত্ রাস্তায় এক ঝলক দেখা ভুলে যাওয়া প্রেমিকার মুখটা দেখে প্রশ্নগুলো কী নিজের মধ্যে উড়াউড়ি করে না? শচীন ভৌমিকের লেখা আর ডি বর্মণের সুরে ‘মনে পড়ে রুবি রায় কবিতায় তোমাকে, একদিন কত করে ডেকেছি। আজ হায় রুবি রায় ডেকে বলো বলো আমাকে তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি।’ গানটি বিষাদ ছড়িয়ে যায় বাতাসে। গুমোট মনের ভেতর দুঃখ এসে চুপ করে বসে থাকে। কত গান গুনগুন করে বুকের পাঁজরে। আলাউদ্দিন আলীর কথা ও সুরে মিতালী মুখার্জীর গাওয়া ‘হারানো দিনের মতো হারিয়ে গেছো তুমি, ফেরারি সুখের মতো পালিয়ে গেছো তুমি, জানি না কি দিয়ে কি নিয়ে গেছো তুমি।’ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি, এই চোখ দুটো মাটি খেয়োনা, আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ মিটবে না গো মিটবে না।’ জাহিদুল হকের লেখা, শেখ সাদী খানের সুরে সুবীর নন্দীর গাওয়া ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়, কখনো নদীর মতো তোমার পথের পানে বয়ে বয়ে যায়।’
মোহাম্মদ রফিক উজ্জামানের লেখা, আলাউদ্দিন আলীর সুরে মিতালী মুখার্জী, তপন চৌধুরীর গাওয়া ‘আকাশের সব তারা ঝরে যাবে, আমার চোখের তারা ঝরবে না, তোমাকে দেখার সাধ মরবে না’ সহ শত শত গানের সঙ্গী হয় এই মনটা। আহা গান! তুমি কোথায় থাকো গো। এত মায়া ছড়িয়ে যাও বুকের অতলে! আসো তোমাকে আদর করে বুকে জড়িয়ে রাখি। অভিমান, ভালোবাসা, মুগ্ধতা, মুহূর্ত ঘোর রচনা করি। গান তুমি বৃষ্টি হও কিংবা সুনীল আকাশ। এই মুগ্ধতা আচ্ছন্নতা থেকে বের হওয়া খুব সহজ নয়।
