শাওয়ালের ছয়টি সুন্নত রোজার মাহাত্ম্য

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৪, ২১:৩১
মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য। এ মহান সৃষ্টি দ্বারা তার আর কোন উদ্দেশ্য নেই। তিনি চান বান্দা যেন সর্বদা আমার-ই ইবাদত করে। আমাকেই তার আপনভাবে। এ মর্মে পবিত্র কুরআনে মহান প্রভু ইরশাদ করেছেন এবং আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য তৈরি করেছি (আল-কুরআন)। এই মানব জাতি যেন তাদের বাস্তব জীবনে একে অন্যকে আপন ভেবে একে অন্যের দ্বারা উপকৃত হতে পারে এজন্য দিয়ে দিয়েছেন জীবন বিধান। সামাজিক জীবনে তারা পরস্পরে যেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে সেজন্য কুরআন হাদিসে মানব সেবার অনেক ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। রসূলে কারীম (স.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ার বুকে কোন মুমিন ব্যক্তির পেরেশানী বিপদাপদ দূর করবে, আখেরাতের বুকে আল্লাহ পাক তার পেরেশানী বিপদাপদ দূর করে দেবেন, আর যে কোন মুসলমানের দোষত্রুটিকে গোপন রাখবে আল্লাহপাক ইহকাল ও পরকালে তার দোষ-ত্রুটিকে গোপন রাখবেন। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের সহযোগিতায় লিপ্ত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহপাক তাকে তার সহযোগিতা দ্বারা বেস্টন করে রাখবেন। আল-হাদিস উক্ত হাদিসে রসূল (স.) মানব সেবার ফযীলতকে বর্ণনা করেছেন। আর এ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল মানব সেবা অনেক ফযীলতের কাজ। অন্য এক হাদিসের মধ্যে রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন—যারা অন্যের ওপর দয়া করে মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন তাদের ওপর দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে তাদের প্রতি দয়া কর। আকাশের অধিবাসী (মহান প্রভু) তোমাদের ওপর দয়া করবেন (আল-হাদিস)। উক্ত হাদিসের মধ্যে ঐদিকে ইশারা করা হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো হূদয়ে সৃষ্টি জীবের প্রতি দয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সে ব্যক্তি তাকে মুসলমান বলে দাবি করার অধিকার রাখে না। একজন মুমিনের জীবন এই সমস্ত গুণে গুণান্বিত হওয়া উচিত। কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক এই জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, এবং আমি বনী আদমকে সম্মানিত করেছি (আল কুরআন)। আবার অন্যত্র আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, এরা হল চতুষ্পদ প্রাণীর ন্যায় বরং এর চেয়েও আরো নিকৃষ্ট (আল-কুরআন)। আল্লাহপাকের ভাষায়-ই মানব জাতি সম্মানিত। আবার এরাই তার ভাষায় চতুষ্পদ প্রাণীর চেয়েও নিকৃষ্ট। তাই তো মানব জাতি আল্লাহর নিকট প্রকৃত সম্মানিত ও প্রিয় পাত্র, হবে তখনই যখন তাদের জীবনের প্রতিটি কর্ম হবে একমাত্র তারই জন্য। সুখে-দুঃখে একমাত্র তার-ই ইবাদত করবে। তাকেই ভালোবাসবে। তারই নৈকট্য লাভের চেষ্টায় সর্বদা ব্যস্ত থাকবে। আর নফল রোজার দ্বারা আল্লাহ পাক অতি সহজেই বান্দাকে তার কাছে টেনে নেন। হাদিসে এসেছে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন রসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রভু বলেন, প্রত্যেক নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে নিয়ে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়ে থাকে। আর রোজা হল (এমন একটি ইবাদত) একমাত্র এ আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দিয়ে থাকি। আর রোজা হল জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ এবং রোজাদার ব্যক্তির মুখের র্গন্ধ আল্লাহপাকের নিকটে মেশক আম্বরের সুঘ্রাণের চেয়েও অধিক শ্রেষ্ঠতর (আল হাদিস)। অন্য হাদিসে এসেছে—হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, জান্নাতের মধ্যে একটি দরজা রয়েছে যার নাম হল ‘রাইয়্যান’ একমাত্র রোজাদারদেরকেই সেই দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে। সুতরাং রোজাদার-ই সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। অতএব সেথায় যে প্রবেশ করে ফেলবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না (আল হাদিস)। অন্য হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে—হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেছেন! রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে একটি হল যখন সে ইফতার করে। আর অপরটি হল যখন সে তার মহান প্রভুর সাথে সাক্ষাত্ করবে (আল হাদিস)। মুসলমান ব্যক্তি যাতে শুধু রমজানের রোজা রেখে থেমে না যায় বরং সে কি করে সহজেই পূর্ণ বছরটা মহান প্রভুর ভালবাসার পাত্র হয়ে থাকতে পারে এবং কি করে জান্নাতের স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারে। কেয়ামতের ভয়াবহ দিবসেও সে কি করে হাসতে পারে। থাকতে পারে আনন্দের সাথে। রসূল (স.) উম্মতের সামনে এই পথটি স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। হাদিস শরীফে এসেছে—হযরত আবু আইয়ূব (রা.) সূত্রে বর্ণিত রসূল (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল অতঃপর তার সাথে সাথে শওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল সে যেন পূর্ণবছরই রোজা রাখল (আল হাদিস)। অর্থাত্, একজন ব্যক্তি যখন রমজান মাসের রোজা রেখে তার সাথে সাথে শাওয়াল মাসেও ছয়টি রোজা রাখল সে এই রোজার কারণে আল্লাহ পাকের দরবারে পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব পেয়ে গেল। একটু ভেবে দেখুন রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের মধ্যে ছয়টি রোজা রাখার এই আমলটা কতইনা সহজ কিন্তু তার ফযীলত কতই না মহান। কার পক্ষে সহজেই সম্ভব এক বছর লাগাতার রোজা রাখা। অথচ এই আমলটা এই ফযীলত সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তা সাধারণ মানুষের পক্ষেও সম্ভব। শুধু মনের সত্ নিয়মই যথেষ্ট। বান্দা যখন প্রকৃতভাবে আল্লাহকেই ভালবাসে তখন তার জন্য একদম কঠিন থেকে কঠিনতম আমল ও সহজ হয়ে দাঁড়ায়। বান্দা যখন আল্লাহ পাকের দিকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে অগ্রসর হয় আল্লাহ পাকের রহমত তার দিকে দৌড়িয়ে অগ্রসর হয়। বান্দা যখন আল্লাহ পাকের প্রেমে বিভোর হয়ে তার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সামান্যতম আমল তার দরবারে পেশ করে আল্লাহ পাক বান্দার এই আমলকে দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ পাকের এই দয়া ও অনুগ্রহ বান্দা তখনই লাভ করবে যখন বান্দা আমল করবে। কেননা আল্লাহ পাকের রহমত লাভের জন্য একটি উছিলা আবশ্যক। আর তা হল আমল। তাই তো বান্দা যেন আল্লাহ পাকের রহমতকে হাত ছাড়া না করে। বরং অল্প আমলের বিনিময়েই যেন সে আল্লাহর কল্পনাহীন দয়া ও অনুগ্রহের অধিকারী হয়ে যায়। এমন অনেক রাস্তাই আল্লাহপাক বান্দার জন্য খোলা রেখেছেন এবং রসূল (স.) উম্মতের সামনে তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। আর অল্প আমলের বিনিময়ে আল্লাহপাকের অসীম দয়া ও অনুগ্রহের পাত্র হওয়ার জন্য রসূল (স.) কর্তৃক বর্ণিত সহজ পন্থাসমূহ থেকে একটি অতি সহজ পন্থা হল শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা। বান্দা যখন আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্যে এই ছয়টি রোজা রাখবে তখন আল্লাহ তাকে পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সওয়াব দিয়ে দিবেন। অন্য একটি হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে রসূল (স.)কে সারা বছর রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে তোমার ওপর তোমার পরিবার-পরিজনের হক বা অধিকার রয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন, রমজানের এবং তার পরবর্তী দিনগুলোরও প্রত্যেক বুধবার ও বৃহস্পতিবারে রোজা রাখ। সুতরাং যখন তুমি এই রোজাগুলো রাখবে তখন যেন তুমি সারাটা বছরই রোজা রাখলে। এই সমস্ত আরো অনেক হাদিস রয়েছে যার দ্বারা শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখার ফযীলত প্রমাণিত হয়। সুতরাং আসুন আমরা এই মহান ফযীলত ও বরকতময় আমলটি নিজ জীবনে বাস্তবায়িত করি। তাহলেই সফল হবে আমাদের ইহকাল ও পরকাল। আল্লাহপাক আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।