টানা তিন অর্থবছর ধরে বিদেশি বিনিয়োগের নিবন্ধন কমছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার ফলে বিদেশি বিনিয়োগে উদ্যম হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে কমে গেছে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ। বিনিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন করা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছর হয়েছিল ২২ হাজার ৭২ কোটি টাকা। আর ২০১১-১২ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগের নিবন্ধন হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। অর্থাত্ গেল অর্থ বছরে বিদেশি বিনিয়োগের নিবন্ধন কমেছে ১৬ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে কমেছে ৩৫ শতাংশ। আর ২০১১-১২ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগের নিবন্ধন কমেছে ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে গ্যাস, বিদ্যুত্ ও ভূমি সঙ্কটের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমস্যা বিনিয়োগের জন্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। তবে গেল কয়েক বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের ভরসা পাচ্ছিলেন না। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের নিবন্ধন কমে গেছে। বিনিয়োগ বোর্ড সূত্রও বলছে একই কথা। বিনিয়োগ বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েও বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ বিনিয়োগের জন্য তারা যে ধরনের জমি চায় সে মোতাবেক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গঠনের পরিকল্পনা করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তাছাড়া গ্যাস, বিদ্যুতের সঙ্কটও রয়েছে। তার উপর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্যাস, বিদ্যুত্ ও জমির সঙ্কটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বিদেশিরা বিনিয়োগ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য। তারা তাদের বিনিয়োগ লাভজনক হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে। কিন্তু গেল বছরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। ফলে অনেকে অন্য দেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছেন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী জানান, বিদেশি উদ্যোক্তাদেরকে শুধু মুনাফা ফেরত নেয়ার সুযোগ দিলেই তারা বিনিয়োগে উত্সাহী হবে না। বরং বিনিয়োগের জন্য গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ ও নিষ্কণ্টক জমির ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার উপর। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগ বড় ধরনের বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা থাকলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে চাইবেন না।
এদিকে বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যে দেখা গেছে, গেল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে স্থানীয় ও বিদেশি নিবন্ধন মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের নিবন্ধন কিছুটা বেড়েছে। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের নিবন্ধন কমেছে ২৪ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে কমেছে ১০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গেল জানুয়ারিতে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক কিছুটা স্থিতিশীলতা আসায় স্থানীয় বিনিয়োগের নিবন্ধন বাড়তে শুরু করেছে। তাই মোটের উপর বিনিয়োগের নিবন্ধন কিছুটা বেড়েছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ এখনও আশানুরূপ বাড়ছে না। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার পাশাপাশি জমির সমস্যা দূর করতে হবে। এজন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
