ঈদের ছুটিতে মানুষ ভিড় করেছে দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে মানুষ দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখেছে। রিপোর্ট ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
মুজিবনগরে আম্রকাননে পর্যটকদের ভিড়
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বিনোদনের জন্য ঐতিহাসিক মুজিবনগরে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামছে। মুজিবনগর কমপ্লেক্সে পর্যটকদের ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই থাকছে না বিশাল আম্রকাননে। ঈদোত্তর বিনোদনের জন্য মেহেরপুর জেলাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের ভিড় জমছে মুজিবনগরে কমপ্লেক্সে। এজন্য সংযোগ সড়কগুলোতে মানুষ ও পরিবহনের ভিড়ে দীর্ঘ যানজটেরও সৃষ্টি হচ্ছে। ঈদের পরদিনথেকে লোকজনের সমাগম চলছে। চলবে আরো ২/৩ দিন।
স্বাধীনতার সুতিকাগার মেহেরপুরের মুজিবনগর। বিনোদন পিয়াসীদের আকর্ষণের অন্যতম জায়গা ঐতিহাসিক মুজিবনগর কমপ্লেক্স। ভ্রমণ পিপাসু মানুষের ভিড়ে মুখরিত মুজিবনগর কমপ্লেক্স। মুজিবনগরে বিশাল আম্রকানন ও পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে গড়ে উঠা কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র, স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বিভিন্ন মূরাল, সরকারি শিশু পরিবার, ছয়স্তর বিশিষ্ট গোলাপ বাগান, শাপলা চত্ব্বরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে ঘুরে দেখছে দর্শনার্থীরা। সীমান্তে গিয়ে ভারতের কাঁটা তারের বেড়া দেখছেন তারা। শিশু কিশোররা দর্শন করছে বেসরকারিভাবে গড়ে উঠা মনোরমা পার্ক ও চিড়িয়া খানা। ঈদোত্তর বিনোদনে মুজিবনগরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ এখানে আগত পর্যটকরা।
সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজ মসজিদে পর্যটকের উপচে পড়া ভিড়
সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও হযরত খানহাজান আলী (রঃ) মাজারে পর্যটকের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে উত্সবের আমেজ সৃষ্টি হয় বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ ও খানজাহান আলীর মাজার এলাকায়। ঈদের দিন থেকে এই তিনটি স্পটে প্রায় লক্ষাধিক পর্যটকের আগমন ঘটে বলে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ ও ষাটগম্বুজে অবস্থিত প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে সুন্দরবন। এ সময় হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভিড় সামলাতে বনরক্ষীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। ভ্রমণ পিপাসু দর্শনার্থীরা মাতিয়ে তোলে সুন্দরবন পর্যটন কেন্দ্র করমজলসহ সাগর উপকূল।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের করমজল পর্যটন কেন্দ্রের ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রব জানান, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদের ছুটিতে গত বছরের তুলনায় এবার বেশি পর্যটকের আগমন ঘটে। এখানে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন। তবে পিতা-মাতার সাথে শিশুদের আগমন বেশি।
ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজষাটগম্বুজ মসজিদ ও হযরত খানজাহান আলী মাজারে এবারের ঈদের ছুটিতে ব্যাপক পর্যটকের আগমন ঘটে। এ দুটি স্পটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশের বহু সংখ্যক মানুষ ভ্রমণে আসেন। মাজারের দীঘিতে মিঠা পানির কুমির ছুয়ে আনন্দ উপভোগ করছেন দর্শানার্থীরা। তবে বেশি আনন্দ করছেন পিতা-মাতার সাথে আসা শিশুরা।
সৈয়দপুরের বিনোদন কেন্দ্রে উপচেপড়া ভিড়
দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী, রামসাগর, নীলফামারীর নীলসাগর ও তিস্তা ব্যারাজ, রংপুরের ভিন্নজগত্, মায়া ভূবন, চিড়িয়াখানায় শিশুদের পাশাপাশি তরুণ-তরুণীদের ভিড় রয়েছে। সৈয়দপুর সেনানিবাসে অবস্থিত মিনি চিড়িয়াখানায় উপচেপড়া ভিড় বিদ্যমান। ভিড় থাকবে সপ্তাহ ধরে।
শহরের শিশু ও তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল এবং বাইরে থেকে ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসা শিশুদের কারণে ভিড় আরো বেড়েছে। নীলসাগরের বিশাল দীঘির চারদিকে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ- গাছালির সমাহার। পানি আর সবুজ মিলে সে এক অপরূপ দৃশ্য ছায়া ঘেরা দীঘির চারপাশ বাঁধানো। শান বাঁধানো দীঘির চারপ্রান্তে-রয়েছে সিঁড়ি। এসব সিঁড়ি গোসল করার ঘাট হিসাবে ব্যবহূত হয়। এছাড়া দীঘির পাড়ে পাকা রাস্তার কিছু দূর পর পর দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে সুদৃশ্য বিশ্রামাগার, ছাতা প্রকৃতির বসার স্থান। এখানে শিশুদের জন্য সীমিত আকারে দোলনা, নাগরদোলার ব্যবস্থা রয়েছে।
শুধু নীলফামারীই নয়, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর ও দিনাজপুরসহ আশেপাশের কয়েকটি জেলা থেকেও বিপুল সংখ্যক মানুষ এখানে বেড়াতে, আড্ডা দিতে আসেন। এখানে ছোট চিড়িয়াখানা রয়েছে। তবে তাতে কোন জীবজন্তু নেই।
কমলগঞ্জের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে উপচেপড়া ভিড়
ঈদের ছুটিতে চা বাগান, হামহাম ঝর্না ধারা, মাধবপুর লেক, মনিপুরী, খাসিয়াসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সমূহের জীবন প্রণালী পর্যটকদের কাছে বেশি সমাদৃত হলেও লাউয়াছড়া উদ্যানে ভিড় কোন অংশে কম নয়। ঈদের দিন থেকে প্রবেশ পথের সামনের সড়কের দু’দিকে যানবাহন আর কাউন্টারে টিকেট সংগ্রহে ছিল দীর্ঘ লাইন।যানবাহনে লাগানো মাইকের উচ্চৈঃস্বরে জাতীয় উদ্যানের শান্ত নিবিড় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। ঈদের দিন ও ঈদের পরদিন জাতীয় উদ্যান ঘুরে এ চিত্র পাওয়া যায়।
হাজী শরীয়তউল্লাহ ও পদ্মা সেতু আশ্রয়ণ প্রকল্পে মানুষের ঢল
শিবচরের সবচেয়ে নয়নাভিরাম আড়িয়াল খাঁ নদের উপর নির্মিত হাজী শরীয়তউল্লাহ সেতু এলাকায় ভিড় সবচেয়ে বেশি । মহাসড়কে যানবাহন রাখায় ও দোকান বসানোয় ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। নদীতে স্পীডবোটে ও ট্রলারে ঘুরছে অনেকে। নদী রক্ষা বাঁধে বসেছে অস্থায়ী মেলা। পাল তোলা নৌকার চলাচল, বালু মাটিতে পায়ে হেঁটে বেড়ানো সবকিছুই উপভোগ করছে দর্শনার্থীরা। ফরিদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের ঢল আরো এক সপ্তাহ থাকবে। এদিকে বিপুল জনসমাগম ঘটছে শিবচরের বাখরেরকান্দি পদ্মা সেতু পুনর্বাসন প্রকল্পে। পরিকল্পিত প্রকল্পে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছে শত শত ভ্রমণ পিপাসুরা। অপরূপ সব নির্মাণ শৈলী গোছালে পরিবেশে এসে মুগ্ধ হচ্ছে সবাই। কোলাহল মুক্ত পরিবেশ ও ঝক্কি ঝামেলা না থাকায় দিন দিন ভিড় বাড়ছে।
মির্জাপুরে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত মহেড়ার রাজবাড়ি
প্রতি বছরের মত ঈদে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মহেড়ার রাজবাাড়ি (জমিদার বাড়ি)। হাজার হাজার দর্শনার্থী রাজবাড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেছে মহেড়ার রাজবাড়ি (জমিদার) বাড়িতে।
প্রায় দুইশ বছর আগে এলাকার আনন্দ মোহন ও আশানন্দ নামের দুই ভাই বিশাল এলাকা নিয়ে মহেড়ার রাজবাড়ি তৈরি করেন। এখানে বসেই তারা জমিদারী পরিচালনা করতেন। এখানে রয়েছে বিশাকা সাগর, আনন্দ লজ, বিশাকা লজ, ছোট তরফ, বড় তরফ, কাচারি ঘর, মিনি চিড়িয়াখানা, রঙ্গ মঞ্চ, নাট্যশালা, মসজিদ, শিব মন্দিরসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা । ৪৭ এর দশকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এই জমিদারগণ মহেড়ার রাজবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এলাকার একটি মহল জমিদার বাড়িটি দখলের চেষ্টা করে। ১৯৭২ সালে সরকার রাজবাড়িটি দখলে নিয়ে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার স্কুল স্থাপন করে। এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য এখানে গড়ে তুলে স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানে দেশের দ্বিতীয় পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার গড়ে উঠায় এই রাজবাড়িটিকে সরকার নানা সাজে সজ্জিত করে তুলেছে । এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর হওয়ায় দর্শনার্থীদের কমতি নেই ।
