হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ফল

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৪, ২২:১১
গাব খাবো না খাবো কি? গাবের মতো মিষ্ট কি? এমন ছড়া আর শোনা যায় না শিশু-কিশোরদের মুখে। গ্রামের এমন বাড়ি ছিল না, যে বাড়িতে গাব গাছ ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সুমিষ্ট পাকা গাব আর নেই। গাব গাছ কেটে সেখানে লাগানো হয় অফলদ গাছ। আশংকা করা হচ্ছে এভাবেই দেশি ফলের গাছগুলো একে একে নিশ্চিহ্ন হবে। শুধু গাব নয়, আমড়া, ডেউয়া, বেল, কদবেল, সফেদা, আলুবোখরা, নোনা ফল, পানিফল, জলপাই, খেজুর, আতা, তাল, গোলাপ জাম, খুদে জাম, আঁঁশফল বা পিচফল, ফলসা, লটকন, জামরুল, নাসপাতি, চালতা, শরিফা, কাউ, অরবরই, বকুল, চাপালিশা, তৈকর, সাতকরা, কামরাঙা, কাজু বাদাম ও কাঠবাদামসহ শতাধিক দেশীয় ফলের গাছ খুব একটা দেখা যায় না। অথচ ১০ বছর আগেও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই দেশীয় ফলের গাছ ছিল। এখন হাতে গোনা কিছু বাড়িতে দু-একটি ফলের গাছ দেখা যায়। সময়ের পবির্তনের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে দেশীয় ফলগাছগুলো। দেশি ফলের উত্পাদন, বিপণন ও সংরক্ষণে বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনা না থাকায় দেশীয় ফলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে - এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ঝালকাঠীর কানুদাশ কাঠী গ্রামের আব্দুল জলিল হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তার বাড়িতে দুই বছর আগেও ডেউয়া, কামরাঙা, বাতাবি লেবু, আতা, কাঠবাদাম গাছ ছিল। নতুন ঘর তোলার জন্য ডেউয়া ও আতা গাছ, নতুন রাস্তা তৈরির জন্য কাঠবাদাম গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এছাড়া বাতাবি লেবু ও কামরাঙা গাছ দুটি শুকিয়ে মারা গেছে। বাজার ঘুরেও ফলের চারাও পাওয়া যায়নি, তাই নতুন করে ওসব ফলের গাছ লাগানোও হয়নি। এখন বাড়িতে কয়েকটি দেশীয় গাব ছাড়া অন্য কোন দেশীয় ফলের গাছ নেই। কানুদাশ কাঠী গ্রাম ঘুরে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ছাড়া অন্যকোথাও দেশীয় ফলের গাছ পাওয়া যায়নি। গ্রামের মানুষগুলোও ভুলে যাচ্ছে দেশীয় ফলের স্মৃতি। এলাকার বায়োবৃদ্ধরা জানিয়েছেন, আগেকার সময়ে বর্ষা মৌসুমে কিংবা অন্য যে কোন মৌসুমে গ্রামের জনপদে এসব ফলের প্রচুর দেখা মিললেও গাছ কেটে ফেলার ফলে এসব রসালো ফলের গাছ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। এসব ফলদ গাছ কেটে ফেলে মানুষ লাগাচ্ছে মেহগনিসহ অফলদ গাছ। গ্রামের দোকানগুলোও বিদেশি কমলা, আপেল, মালটা, আঙ্গুর, নাসপাতি, স্ট্রবেরি, বেদানা, স্কোয়াসসহ চেনা-অচেনা বিভিন্ন ফলে সাজানো থাকে। সারা দেশের চিত্রই এমন। বাংলাদেশের অপ্রচলিত ফলের নতুন জাত উদ্ভাবন যেমন কম হচ্ছে, তেমনি কৃষকরা এসব ফল আবাদেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আশংকা করা হচ্ছে এক সময় হারিয়ে যাবে এসব অপ্রচলিত জাতের ফল। দেশীয় ফলের চারা সাধারণত মানুষ পরিকল্পিতভাবে রোপণ করেন না। বাড়ির কোণে কিংবা ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে মাঠে জন্মায়। বর্তমানে কয়েকটি বিদেশি ফলও বাংলাদেশে দেখা ও পাওয়া যাচ্ছে অপ্রচলিত ফল হিসেবে। এর মধ্যে প্যাশন ফল, স্ট্রবেরি, পার্সিমন, রুটিফল, জবাটিকা, পিচ, অ্যাভোকোড়া, রাম্বুটান ইত্যাদি। মানুষ বেশি পরিচিত বিদেশি স্ট্রবেরী, প্যাশন ফল, বাউকুল, আপেলকুলের সাথে। এসব ফলের উত্পাদন যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে চাহিদা বা জনপ্রিয়তা। অপ্রচলিত জাত নিয়ে গবেষণায় আগ্রহ কম: ফল নিয়ে গবেষণা করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ২৬ টি ফল ও ৬২টি ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। গ্রামের অপ্রচলিত ফল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৬ সালে মাত্র লেবুর তিনটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। এরপর আর কোন লেবুর জাত উদ্ভাবন করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ২০০৩ সালে ১টি নাসপাতি, ২০০৯ সালে ১টি তেঁতুলের নতুন জাত, ২০১৪ সালে জলপাইয়ের একটি, ২০০৯ সালে লটকনের ১টি, ২০১১ সাল পর্যন্ত আমড়ার ২টি, ২০১০ পর্যন্ত কামরাঙার ২টি, ২০০৯ সালে সফেদার দুটি জাত উদ্ভাবন করে।