নতুন ক্রিকেটারটি দলে এসেই পারফরম করেছে; মিডিয়ার সামনে কিভাবে কথা বলবে? কিংবা দলে ডাক পাওয়ার দ্বিতীয় দিনেই পার্টিতে যেতে হবে; টাইটা কিভাবে বাঁধতে হয়?
বিশ্বাস করুন, এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের নয়; সারা পৃথিবীর ক্রিকেটারদের এসব সমস্যায় ভুগতে হয়। যারা বয়সভিত্তিক দল বা কোনো ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে আসেন, তাদের কথা আলাদা। নইলে এসব রীতি, কেতা নিয়ে নবাগত ক্রিকেটার মাত্রই একই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। সেই সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসে বেসিক ক্রিকেট নিয়ে সমস্যা তো আছেই।
আর এসব সমস্যা সমাধানের জন্য নিজেদের পারিবারিক ক্রিকেট অনুশীলনের ভবনে পূর্ণাঙ্গ একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমির যাত্রা শুরু করলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। লক্ষ্য তার, তরুণ ক্রিকেটারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দূরত্বটা কমিয়ে আনা। এই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী একটা লক্ষ্যের কথাও ক্লার্ক জানিয়ে দিলেন অ্যাকাডেমি উদ্বোধনের এই সংবাদ সম্মেলনে—টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর জায়গাটা ফিরে পেতে চান আবার।
একসময় টেস্ট র্যাংকিংয়ের এক নম্বর জায়গাটার স্থায়ী দখল ছিল অস্ট্রেলিয়ার। সেদিন অনেক আগেই গত হয়েছে। মাছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য টেস্ট র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থান দখল করেছিল ক্লার্কের দল। কিন্তু সম্প্রতি শ্রীলংকাকে তাদের নিজ মাঠে ১-০ ম্যাচে টেস্ট সিরিজ হারিয়ে আবার শীর্ষে চলে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। আর সেই জায়গাটাই ছিনিয়ে নিতে চান ক্লার্ক।
এই মাঠের চাওয়া তো আছেই, তবে ক্লার্কের মাথা জুড়ে এখন তার নতুন শুরু করা ‘মাইকেল ক্লার্ক অ্যাকাডেমি’ই কাজ করছে। নিউ সাউথ ওয়েলসের বেরিমাতে নিজেদের জায়গায় এই অ্যাকাডেমির কিছু অবকাঠামো ক্লার্কের বাবাই দাঁড় করিয়েছিলেন। সেটাকেই আধুনিক করে গড়ে তুলছেন তিনি। তবে সেই খামারবাড়িতে এখনও কার্যক্রম শুরু হয়নি; সেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত সিডনিতেই একটি প্রাইভেট স্কুলে চলবে আবাসিক ছাত্রদের কার্যক্রম।
এখানে ক্রিকেট যথেষ্টই শেখানো হবে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কোচেরা সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে শেখাবেন। এর মধ্যে ক্লার্কের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত কোচরা অংশ নেবেন এই অ্যাকাডেমিতে। ক্লার্ক নিজে শেখাবেন। যতক্ষণ শহরে থাকবেন, রোজই তিনি নিজে আসবেন এখানে। শহরের বাইরে যেতে হলেও সমস্যা নেই; ছাত্ররা প্রতিদিনই তাকে স্কাইপিতে পাবে।
তবে ক্লার্ক মনে করেন, ক্রিকেটের চেয়েও একজন পেশাদার ক্রিকেটারকে এই পর্যায়ে জীবনযাপন নিয়ে বেশি শেখানোর আছে। একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের সফলতার মাত্র ৪০ শতাংশ নির্ভর করে মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর; বাকিটা জীবনযাপন ও নিয়ম-কানুনে শৃঙ্খলার ব্যাপার। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক বলেছেন, ‘এসব কারণে আমি সারাজীবন তিন ধাপ এগিয়েছি আর পাঁচ ধাপ পিছিয়েছি। অনেকবার এরকম সব পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, সঠিক আচরণ করতে পারিনি। পরে বার বার আফসোস হয়েছে, আমি যদি আগে থেকে ব্যাপারটা বুঝতাম!’
এমনকি সামান্য টাই বাঁধাটাও যে ব্যাপার হতে পারে, সেটাও এই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থেকে বুঝতে পেরেছেন ক্লার্ক, ‘আমি ভাগ্যক্রমে এমন একটা স্কুলে পড়তাম, যেখানে আমাদের টাই পরে যেতে হত। কিন্তু দলে আমি অনেককেই দেখেছি, যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার আগে টাইটা বাঁধতে পারতো না। এখন এই ছেলেরা প্রথম দিনেই দলে এসে কার কাছে যাবে টাই বাঁধা শিখতে?’
আবার সাংবাদিকদের সামলানোটাও যে একটা চ্যালেঞ্জ, সেটাও ক্লার্ক দল থেকে বাদ পড়ে তবে শিখেছিলেন, ‘আমি যখন দল থেকে বাদ পড়লাম, তখন বুঝতে পারছিলাম আমি আসলে জানিই না যে, কী বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে। জীবনে অগ্রাধিকারটা ঠিক করতে অনেক সময় চলে গেছে।’
আর এসব বাঁকে এসে বার বার ক্লার্ক এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তার পাশে একজন শেনওয়ার্ন ছিলেন। কিন্তু সবার পাশে এমন বন্ধু থাকে না বলেই এই পেশাদার ক্রিকেটারদের বন্ধু সংস্থা হয়ে উঠতে চায় মাইকেল ক্লার্ক অ্যাকাডেমি, ‘আমি প্রত্যেকটা সমস্যার সময় ভেবেছি, এখন কোনো একটা প্রতিষ্ঠান থাকতো, যেখানে আমি ফিরে গিয়ে বলতে পারি—কী করবো? এসব সময় আমাকে সহযোগিতা করেছে ওয়ার্নি। কিন্তু সবাই ওই সহযোগিতাটা পায় না। সেটাই আমরা করতে চাই।’
