এই ঢাকা জানা অজানার

বাঘ বেরোতো গেন্ডারিয়ায়

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৫
দেড় হাজার বছর আগে ছিল এক প্রহরা চৌকি। স্থানীয়রা তাকে বলত ঢক্কা। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল ‘বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি’র এক শহর। মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬১২ সালে সেই শহরকেই করলে তাঁর রাজধানী। সেই থেকে যাত্রা হল নগরী ঢাকার। এর পর কত ভাঙ্গা গড়া, কত হাসি কান্নার ইতিহাস এই ঢাকা ঘিরে ...... জ্বি, বাঘ বেরোতো। বর্তমানের গেন্ডারিয়ার ‘অট্টালিকা জঙ্গলে’ দাঁড়িয়ে সেদিনের ঢাকার কথা কল্পনাও করা দুঃসাধ্য। এখানে সত্যিকারের জঙ্গল ছিল এক সময়। উনিবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেও এলাকাটা জঙ্গলাকীর্ণ ছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। এর একটা অংশকে বাঘাবাড়িও বলা হতো। বাঘের সংখ্যাধিক্য থেকে এমন নাম দেয়া হয়ে থাকতে পারে। গেন্ডারিয়া—এই নামটি এসেছে আখ থেকে। স্থানীয় বাসিন্দারা আখকে বলে গেন্ডারি। সম্ভবত কিছু কিছু জঙ্গল সাফ করে সেখানে আখের চাষ হতো। ১৮৮৫ সাল থেকে এখানে ধীরে ধীরে লোকজন বসতি গড়ে তুলতে থাকে। তার আগে এখানে প্রচুর আখ চাষ হতো। রাস্তাঘাট তেমন ছিল না। আখ ক্ষেতের ভেতর দিয়েই ছিল সরু পায়েচলা পথ। সেই সরু পথ দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে চোখে-মুখে আখের পাতার খোঁচাতো লাগতই সঙ্গে ছিল জীব-জানোয়ারের ভয়। নানা ধরনের জীব-জন্তুর বাস ছিল এখানে। বর্তমানের গেন্ডারিয়ার সঙ্গে সেই আমলের গেন্ডারিয়ার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এসব মোটেও বানানো গল্প নয়, সেই সময়ে লেখা স্মৃতিকথাতেই এমন বর্ণনা আছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই এলাকায় অনেকটা জায়গা কিনে নেন দীননাথ সেন। তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গের ডেপুটি স্কুল ইন্সপেক্টর। অত্যন্ত দূরদর্শী এই ব্যক্তি বুঝতে পারেন, ভবিষ্যতে এলাকাটার গুরুত্ব কতটা বাড়বে। তিনি তার বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদেরও সেখানে জমি কিনতে উত্সাহ দিতেন। তিনি ১৮৯৫ সালের দিকে রজনীকুমার চৌধুরীর সহায়তায় গেন্ডারিয়ার জঙ্গল পরিষ্কার করান। মূলত দীননাথেরই উত্সাহে গেন্ডারিয়া আধুনিক রূপ নিতে শুরু করে। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, সতেরো বিঘা জমির ওপর নিজের বাড়ি তৈরি করেন দীননাথ। রেল স্টেশনে যাওয়ার রাস্তাও বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে শর্ত দিয়েছিলেন—“নিজ রচিত রাস্তার ধারে কেহ মাদকদ্রব্যের দোকান দিতে কিংবা পতিতার আড্ডা করিতে পারিবে না।” ১৮৬৩ সালে তিনি ঢাকা ব্রহ্ম স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নিজের বাড়িতে। ১৮৮২ সালের দিকে দীননাথ সেনের অনুরোধে গেন্ডারিয়ায় যত্রতত্র কবর দেয়া ও শবদাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সুত্রাপুর আর গেন্ডারিয়ার মাঝখানে ধোলাই খালের ওপর একটি পুল নির্মাণ করা হয়েছিল যাতায়াতের সুবিধার জন্য। সম্পূর্ণ লোহা দিয়ে বানানো বলে লোকে বলত লোহার পুল। ঢাকার হিতৈষী হিসাবে পরিচিত ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টার্স পুলটা বানিয়েছিলেন। সেই পুল ভেঙ্গে পড়ে তার জায়গায় আরেকটি পুল বানানো হয়েছিল, সেটাও ছিল লোহার। তবে সে পুলও এখন আর নেই। তবু লোকে এলাকাটাকে এখনো লোহার পুল নামে চেনে।