দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০টি চ্যানেল, আর এসব চ্যানেল ঈদ উপলক্ষে সাজিয়েছে তাদের বিশেষ অনুষ্ঠানের ডালি,কিন্তু এইসব বিশেষ অনুষ্ঠান দেখে মনে হচ্ছে ‘বিশেষ’ শব্দটি যেন দিন দিন তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। কেউ ৫ দিন, কেউ ৬ দিন, কেউবা ৭/৮ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান মালা সাজিয়েছে। এ ক’দিনে এসব চ্যানেলে প্রায় সহস্রাধিক নাটক ছাড়াও নানান ধরনের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে যার মধ্যে বিষয় বৈচিত্র যেমন ছিলনা তেমনি ছিলনা কোন সৃজনশীলতা। আর এসব অনুষ্ঠান দেখানোর জন্য চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ চ্যানেলে প্রচার-প্রচারনার মাধ্যমেই দিনের অর্ধেক সময় পার করেছে। অনুষ্ঠান যাই হোক প্রচার প্রচারনায় কেউ পিছিয়ে ছিল না। অন্যান্য অনুষ্ঠানের কথা না হয় বাদই দিলাম নাটকের অবস্থা আরও করুন। এক সময় সিনেমার নাম নিয়ে আমরা সমালোচনা করতাম বাবা কেন চাকর,পালাবি কোথায়,গুন্ডা, ধরছি তোরে ,খাইছি তোরে ইত্যাদি। অনেকেই টিভিতে এসব ছবির ট্রেলার দেখেই আপত্তি জানাতেন। কারণ টিভি হচ্ছে ড্রয়িং রুম মিডিয়া। কিন্তু এখন এই ড্রয়িং রুম মিডিয়ায় যে সব বিকৃত রুচির নাটকের নাম যায় তা ছবির নামের চাইতেও খারাপ। গরুচোর, গুন্ডা ,বদমাস থেকে শুরু করে পাগল ছাগল কোন কিছুই বাদ যায়নি। এসব নাম যেমন রুচিহীন নাটক আরও কদার্য। বিনোদনের নামে এসব অনুষ্ঠানে ছিল স্থুল ভাঁড়ামি ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতি ঈদেই কিছু নির্দিষ্ট শিল্পীর ঈদের স্মৃতি এবং ছেলে বেলার ঈদের গল্প শুনতে শুনতে দর্শক ক্লান্ত। তাই এদের দিয়ে নুতন অনুষ্ঠান না করে পুরনো অনুষ্ঠান চালিয়ে দিলেই হয়। তাতে খরচও কম, ঝামেলাও কম। আর কিছু সংগীত শিল্পী এখন রান্না ঘরের শিল্পী হয়ে গেছেন। ঈদের বেশ কটি রান্নার অনুষ্ঠানে কিছু শিল্পীকে রান্নার আয়োজন করতে করতে গান গাইতে দেখা গেছে। সংগীত শিল্পীর চাইতে এদের রন্ধন শিল্পী বলাই শ্রেয়। এছাড়া কে যে কাকে তারকা, সুপারস্টার, বরেণ্য বলছেন। আনকোরা এই সব উপস্থাপক ও অনুষ্ঠান প্রযোজকদের এই মূর্খতা এবারেও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বিটিভির আনন্দমেলায় যথারীতি আনজাম মাসুদ অনেক চেষ্টা করেছেন তারুন্য নির্ভর মুগ্ধতা দেবার। কিন্তু আদতে পুরো অনুষ্ঠানের স্ক্রী্ব আরো মজবুত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। গানগুলো বাছাই ও পরিবেশনা ছিল প্রশংসনীয়। তবে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতায় প্রত্যাশাহীন হয়ে পড়েছিল আনন্দমেলা। সেখান থেকে আনজাম কিছুটা হলেও উের গেছেন বলা চলে।
এদিকে চ্যানেল টুয়েন্টিফোরে এবার ভিন্ন আঙ্গিকে মা এর স্মৃতি নিয়ে ঈদ অনুষ্ঠান সাজিয়েছে। এই একই কনসেপ্টে আরটিভি তাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। তবে কেন ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালায় অন্য চ্যানেলের নিয়মিত অনুষ্ঠানকেই নকল করা। এছাড়া শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অসামঞ্জ্যসতা লক্ষ্যনীয়। অর্থাত্ ১ গামলা দুধের মধ্যে ১ কেজি দই পড়লে যা হয় তাই হয়েছে। ভিন্নধর্মী আড্ডার অনুষ্ঠান ছিল সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ও মাহাবুবা চৌধুরীর উপস্থাপনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পারিবারিক আড্ডা। এর বাইরে অধিকাংশ চ্যানেলে বিনোদনের নামে কাতুকুতু দেয়ার প্রবনতা ছিল লক্ষনীয়। অদ্ভুত এসব বিনোদন প্রয়াস!
চ্যানেল আইতে অতি প্রচারিত সিরিয়াল ড্রামা ফরিদুর রেজা সাগর ও আফজাল হোসেনের ‘ছোট কাকু সিরিজ’ এবারে যেন কিশোর গোয়েন্দা সিরিজ হিসেবে দারুণ এক অবস্থান তৈরী করতে পেরেছে। মুগ্ধ করেছে শিল্পীদের সাবলীল অভিনয়। প্রশংসা অবশ্যই নির্মাতার প্রাপ্য। এছাড়া নাটকের ক্ষেত্রে এবারেও দর্শকমন কৌতুহলী করেছে বাংলাভিশনের সিকান্দার বক্স সিক্যুয়েল। যমুনা টিভির ব্যতিক্রমী আয়োজন ছিল বামবা কনসার্ট এর লাইভ সম্প্রচার। ব্যান্ড পাগল দর্শকদের জন্য এটা বাড়তি পাওনা ছিল। বিশেষ করে বোকা বাক্সে মধ্যরাত অবধি লাইভ স্টুডিও কনসার্টেওর বাইরে এটি ছিল অনবদ্য আইডিয়া।
তবে নির্মল ও অর্থপূর্ন বিনোদনের ক্ষেত্রে প্রতিবারের মত এবারও ইত্যাদি’ই ছিল সেরা। অনুষ্ঠানের প্রতিটি বিষয়ই যেমন ছিল অর্থপুর্ণ, তেমনি বিনোদনসমৃদ্ধ। এতগুলো চ্যানেল থাকা সত্বেও একটি চ্যানেলেও এত গোছানো অনুষ্ঠান দেখা যায়নি। টেলিভিশনের মূলমন্ত্র তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদন এর এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল এবারের ইত্যাদি। সমাজের ক্ষত নিরাময়ের জন্য ইত্যাদি যে একটি বড় অস্ত্র তা আবারও দেখালেন সঞ্চালক। বিষয় নির্বাচন, শিল্পী নির্বাচন এবং সেট নির্মান অনবদ্য। এবার ইত্যাদি দর্শকদের যেমন আনন্দ দিয়েছে তেমনি নিয়ে গেছে ভাবনার জগতে। এখানেই হানিফ সংকেতের মুন্সিয়ানা । প্রতি ঈদেই ‘ও মন রমজান এর এই রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’ গানটি থাকে ইত্যাদিতে। এছাড়া অন্যান্য সেগমেন্ট তো রয়েছেই। তবে শুধুমাত্র বিদেশী পর্বের অনবদ্য পারফর্মেন্সের জন্য হলেও ইত্যাদিকে সর্বাগ্রে রাখা যায়। সবকিছু মিলিয়ে,দেশ সেরা নির্মাতা হানিফ সংকেত এবার এক অসাধারন, বক্তব্যধর্মী, নির্মল বিনোদনে ভরপুর ঈদ ইত্যাদি উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। ধন্যবাদ হানিফ সংকেত।
এছাড়া গত কয়েকবছর ধরেই ঈদের অনুষ্ঠানমালায় বিদেশী শিল্পীকে এনে সবচেয়ে দামী সময়ে তার প্রচারের প্রতিবাদ বা সমালোচনা আমরা করেছি। এবারেও সেই কাজটিই করেছে দেশ টিভি। এর পাশাপাশি এশিয়ান টিভি অবশ্য দুই বাংলা’র মেলবন্ধন টাইটেলে একটি যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। তবে এশিয়ান টিভির অনুষ্ঠানে পশ্চিমবাংলার শিল্পীদের পাশাপাশি যুতসই শিল্পী বাছাইয়ে ছিল খুবই অনভিজ্ঞতার ছাপ। যা দুই একটি পর্বে বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আর বিদেশী শিল্পীদের দিয়ে ঈদে অনুষ্ঠান করা নিয়ে যথারীতি শিল্পীদেরও কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। শুধু বামবার সাবেক সভাপতি মাকসুদুল হক আক্ষেপ করেছেন। সম্মিলিত প্রতিবাদ এবারেও নেই। এভাবে চলতে থাকলে এটাই যেন রীতিতে দাঁড়িয়ে যাবে। আরটিভি দুর্ভাগ্যক্রমে মোনালি ঠাকুরকে না পাওয়ায় সেই শিডিউলে বেবী নাজনীনের একক লাইভ প্রচার করেছে। এবং একই সাথে প্রমান করেছে যে দেশী শিল্পীকে দিয়েই দর্শক মাতানো খুবই সম্ভব। সেক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যভুলের জন্য হলেও ধন্যবাদ আরটিভিকে। তবু যদি বোধদয় হয় সকলের।
বি: দ্র : প্রিয় পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনারা ঈদের গান, অনুষ্ঠান বা চলচ্চিত্র যে কোনো কিছু নিয়ে লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের ঠিকানায়। আমরা আপনাদের যৌক্তিক মতামত গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করতে চাই।
