ইরাকে ‘খলিফা’ শাসন শুরু!

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৪
একদা শান্ত মধ্যপ্রাচ্য আজ অশান্তির আগুনে পুড়ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া এই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। একদিকে ইসরাইলি বোমায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে গাজা, অন্যদিকে ইরাকে জাতিগত কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছে শিয়া, সুন্নিরা। আরব বসন্তের নামে লিবিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে তথাকথিত গণআন্দোলনের মাধ্যমে পতন ঘটানো হয়েছে ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু আসেনি শান্তি, সুশাসনও হয়নি প্রতিষ্ঠিত। আর এই অশান্তির চুল্লিতে জ্বালানি জুগিয়ে চলেছে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা। এরই মাঝে ইরাকে আবির্ভূত হয়েছেন আবু বকর আল-বাগদাদী নামে এক ব্যক্তি যিনি নিজেকে খলিফা (সারা বিশ্বের মুসলমানদের নেতা) হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি তার প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য এবং সম্মান করার জন্য মুসলমানদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার শাসনে জনগণ কোনো রকম কষ্ট পাবে না। সবাই সুখে থাকবে। কিন্তু বাগদাদী নিজেকে ‘সুখের ফেরিওয়ালা’ হিসেবে জাহির করলেও তাকে একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জঙ্গি নেতা হিসেবেই চিহ্নিত করছে পশ্চিমা বিশ্বসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো। মার্কিন সরকার ইতিমধ্যেই তার মাথার দাম ঘোষণা করেছে ১ কোটি ডলার। ইসলামি সশস্ত্র আন্দোলন সংগ্রামে আবু বকরের আবির্ভাব মোটেই আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। ২০১০ সালেই তাকে আল কায়েদার ইরাকভিত্তিক অঙ্গ সংগঠন আইএসআই (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক)-এর নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আইএসআই-এর তত্কালীন নেতা আবু ওমর আল বাগদাদী ইরাকি সামরিক বাহিনীর অভিযানে নিহত হওয়ার পর পরই আবু বকরকে সংগঠনটির নেতা করা হয়। আইএসআই-এর নেতৃত্ব পাবার পর থেকেই তার তত্পরতা বেড়ে যায়। মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাগদাদের দক্ষিণাঞ্চলে সংগঠিত অন্তত ২৩টি হামলার ঘটনা ঘটে। সবগুলো হামলারই দায়িত্ব স্বীকার করে আইএসআই। ২০১১ সালের ২রা মে পাকিস্তানের আবোতাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো হামলায় আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হবার পর আবু বকরের তরফ থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে লাদেনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। সে বছরের ৫ মে ইরাকের হিল্লা শহরে এক হামলার ঘটনায় নিহত হন ২৪ জন পুলিশ সদস্য, আহত হন ৭২ ব্যক্তি। ১৫ আগস্ট মসুল পর পর কয়েকটি আত্মঘাতি হামলায় মারা যান ৭০ জন মানুষ। আইএসআই তাদের ওয়েবসাইটে জানায়, লাদেনের মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে আরও শখানেক হামলা চালানো হবে। ২৮ আগস্ট বাগদাদের একটি মসজিদে আইএসআই-এর হামলায় নিহত হন বিশিষ্ট সুন্নি আইনপ্রণেতা খালিদ আল-ফাহদায়ি। একই বছর ২২ ডিসেম্বর বাগদাদে সিরিজ গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন কমপক্ষে ৬৩ জন, আহত হন ১৮০ জনেরও বেশি। এই সবগুলো হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে নেয় আইএসআই। আইএসআই-এর কর্মকাণ্ড কেবল ইরাকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিস্তৃত হয়েছে সিরিয়া পর্যন্ত এবং ২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল দেয়া এক রেডিও বার্তায় আবু বকর বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। আইএসআই-এরও নাম পাল্টে গিয়ে নতুন নামকরণ হয়— ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এন্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)। এর পর পরই সিরিয়াতেও জঙ্গি তত্পরতা পুরোদমে শুরু করে দেয় সংগঠনটি। যেটি মেনে নিতে পারেনি সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপ জাবহাত আল-নুসরা। তারা আইএসআইএস-এর ‘মাতবরি’ সহ্য করতে না পেরে আল কায়েদার শীর্ষ নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি’র কাছে বিচার দেয় এবং আইএসআইএসকে ইরাক প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেয়ার অনুরোধ জানায়। জাওয়াহিরিও আইএসআইএসকে ইরাক চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে সিরিয়ায় তারা তাদের তত্পরতা চালিয়ে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জাবহাত আল-নুসরা’র অধিকাংশ বিদেশি সৈনিকদের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইএসআইএস সিরিয়ার রাক্কা শহর থেকে জাবহাত আল-নুসরার বিরোধিতাকারীদের বিতাড়িত করে। একই মাসে সিরিয়ার অপর একটি শহরে উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে উভয়পক্ষের শত শত যোদ্ধা নিহত হয়, শহর থেকে পালায় হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক। ফেব্রুয়ারি মাসে আইএসআইএস-এর সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় আল কায়েদা। যার নেতৃত্বে ও নির্দেশে এতগুলো হামলার ঘটনা ঘটলো, মারা গেল এত মানুষ, সেই আবু বকর আল-বাগদাদী এতদিন ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। অবশেষে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল আইএসআই-এর তরফ থেকে একটি ভিডিও চিত্র প্রকাশ করা হয়, যাতে আবু বকর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে তার বক্তব্য পেশ করেন। এতে তিনি নিজেকে ইসলামের খেলাফত আন্দোলনের একজন সৈনিক এবং সারা বিশ্বের মুসলমানদের নেতা বা খলিফা হিসেবে দাবি করেন। আবু বকরের এই দাবি অবশ্য নতুন নয়। তার সমর্থকেরা অনেক আগে থেকেই তাকে খলিফা বলে আখ্যায়িত করে আসছে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে বাহরাইনের এক ইসলামি চিন্তাবিদ আবু বকরের আত্মজীবনী প্রকাশ করেন যাতে তিনি তাকে হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর কুরাইশ গোত্রের একজন বংশধর হিসেবে উল্লেখ করেন যেটি একজন খলিফা হওয়ার অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আত্মজীবনীতে এ বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। চলতি বছরের ২৯ জুন আইএসআইএস ইসলামি খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে এবং আবু বকর আল-বাগদাদীকে তাদের খলিফা ইব্রাহিম নামে অভিহিত করে। সেই সঙ্গে নিজেদের নাম পুনরায় পাল্টে নতুন নামকরণ করে— দ্য ইসলামিক স্টেট। এক অডিও বার্তায় বাগদাদী জানান, এরপর তারা ইউরোপ অভিযানে যাবে। তাদের প্রথম টার্গেট রোম ও স্পেন। আইএসআইএস এ সমস্ত তত্পরতার কঠোর সমালোচনা করে যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানগণ এবং একই সঙ্গে জিহাদি গ্রুপগুলোও। অনেক সুন্নি মুসলিম চিন্তাবিদ ও ইসলামি ইতিহাসবিদও বাগদাদীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কাতারের একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ইউসুফাল কারাদায়ি বলেছেন, ‘তাদের এই ঘোষণা শরিয়া আইন বিরোধী এবং ইরাকের সুন্নি মুসলমানদের জন্যও এটি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। সিরিয়ায় চলমান আন্দোলনেও এর অশুভ প্রভাব পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, খলিফা পদবিটি দিতে পারে কেবল পুরো মুসলমান জাতি, বিশেষ কোন সংগঠন নয়।