থলের বেড়াল নাকি পাবলিসিটি স্টান্ট!

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৫
হঠাত্ করে ভারতের রাজনীতিতে আলোচনার শীর্ষে সাবেক ইউপিএ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং। তিনি দাবি করেছেন এতদিন মানবতা দেখিয়ে চুপ করে ছিলেন। কিন্তু এখন প্রয়োজনের খাতিরে ‘থলের বেড়াল’ বের করেছেন। সোনিয়া গান্ধী কেন ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে মনমোহন সিংকে সেই পদে বসিয়েছিলেন সেই ‘রহস্য’ ফাঁস করে দিয়েছেন বলে দাবি নটবর সিংয়ের। কিন্তু কংগ্রেস দাবি করেছে, গোপন কথা ফাঁস নয়; এটা নটবরের পাবলিসিটি স্টান্ট। তিনি চাইছেন একটু আলোচনায় আসতে। তার আসল উদ্দেশ্য রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হয়ে কিছু সুবিধা আদায় করা। সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, তিনি নিজেই আত্মজীবনী লিখবেন। সেই গ্রন্থে তিনি সব সত্য প্রকাশ করবেন। কি বলেছেন নটবর সিং? আত্মজীবনী প্রকাশের আগে সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে নটবর জানিয়েছেন কি থাকছে তার এই গ্রন্থে। তিনি জানিয়েছেন, অন্তরাত্মার ডাকে নয়; ছেলে রাহুল গান্ধীর আপত্তিতেই নাকি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেননি সোনিয়া গান্ধী। কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হতে চলেছে নটবর সিংয়ের আত্মজীবনী ‘ওয়ান লাইফ ইজ নট এনাফ’। বই প্রকাশের আগেই এর ভেতরের তথ্যের বোমাটা ফাটিয়ে অনেকটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিলেন কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারকে। রাহুল কেন সোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানাতে যাবেন? মা প্রধানমন্ত্রী হলে তো ছেলের গর্ব। একই সাথে ক্ষমতার দাপট। নটবর জানিয়েছেন, রাহুলের ভয় ছিল প্রধানমন্ত্রী হলে বাবা ও দাদীমার মতোই আঁততায়ীর হাতে মরতে হবে তার মাকে। রাহুলের আপত্তি নিয়ে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব তড়িঘড়ি এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকও ডাকে। সুমন দুবে, মনমোহন সিং ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন নটবর সিং। নটবরের বলেছেন, ছেলে হিসেবে রাহুলকে পুরো নম্বর দেব। তিনি মায়ের ভালোর জন্য হয়তো এই ব্যাপারে রাজি হননি। তিনি আরো দাবি করেন, মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সব ফাইলই সোনিয়া গান্ধীর কাছে পাঠানো হতো। নটবর সিংয়ের যাবতীয় দাবি অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিজের বইয়ের কাটতি বাড়াতেই নটবর সিং এসব বলছেন। লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে গেলে একটু আলোচনায় আসতে হবে। তাই এই অগ্রহণযোগ্য কৌশল নিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে ইরাকে খাদ্যের বিনিময়ে তেল সংক্রান্ত দুর্নীতির জেরে নটবর সিংকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ হারাতে হয়েছিল। তখন থেকেই সোনিয়া গান্ধীর পরিবারের উপর ক্ষোভ জমে ছিল নটবরের মনে। অথচ তিনি একসময় গান্ধী পরিবারের ভীষণ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে টানাপোড়েনের জেরে নটবর ২০০৮ সালে দল থেকে সরে যাবার ঘোষণা দেন। বুধবার নটবর সিং দাবি করেছেন, তার বই থেকে নির্দিষ্ট কিছু অংশ বাদ দেয়ার অনুরোধ জানাতে গত ৭ মে তার সঙ্গে দেখা করেন সোনিয়া গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। কিন্তু সত্য যাতে সামনে আসে সে জন্য কোনও অবস্থাতেই পাণ্ডুলিপি পরিবর্তনে রাজি হননি বলে দাবি করেন তিনি। নটবর সোনিয়াকে বলেন, ‘কংগ্রেস দলে এবং সরকারে আপনাকে না জানিয়ে কিছুই হয় না।’ এসময় সোনিয়া ‘ক্ষমা’ চান বলে দাবি করেন নটবর। কিন্তু তারপরেও নাকি তিনি অবিচল ছিলেন। এ প্রসঙ্গে কংগ্রেস মুখপাত্র অজয় মাকেন বলেন, ‘এটা হাস্যকর। আজকাল কোনও বই প্রকাশ পাওয়ার আগেই তার বিষয়বস্তু নিয়ে সুড়সুড়ি দেয়া মন্তব্য করাটা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বইয়ের বিক্রি বাড়ানো ছাড়া নটবরের আর কোনও উদ্দেশ্য নেই।’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারু তার লেখা একটি বইতে সম্প্রতি দাবি করেন, মনমোহনকে সামনে রেখে সোনিয়াই আসলে সরকার চালাতেন। এই দাবিকেও সমর্থন জানিয়েছেন নটবরও। তিনি আরেকটি খোলাসা করে বলেন, সোনিয়া সরকারের কেউ না হলে কি হবে- গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সব ফাইল তার কাছে নিয়ে যেতেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (পিএমও) তত্কালীন কর্মকর্তা পুলক চ্যাটার্জি। এছাড়াও তার দাবি, ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে বসানোর জন্য কংগ্রেসের তত্কালীন সহ-সভাপতি শঙ্করদয়াল শর্মাই ছিলেন সোনিয়ার প্রথম পছন্দ। কিন্তু অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শর্মা বেঁকে বসেন। শেষ পর্যন্ত নিতান্ত নিমরাজি হয়েই পি ভি নরসিমা রাওকে প্রধানমন্ত্রী করতে বাধ্য হন কংগ্রেস সভানেত্রী। কিন্তু নরসিমার সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনওকালেই তেমন ভালো ছিল না। এদিকে নটবরের আত্মজীবনীর পাল্টা জবাব দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী। তিনি বলেছেন, মুখে বলে লাভ নেই। লিখেই জবাব দিবেন তিনি। সেখানেই সব সত্যি প্রকাশ পাবে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, আমি স্বামী ও শাশুড়ির হত্যাকাণ্ড দেখেছি। মর্মান্তিক ও ভয়ঙ্কর এই অভিজ্ঞতার পর নটবরের এসব ফালতু মন্তব্যে আমার কিছু যায় আসে না। তবে মনমোহন সিং সোনিয়াকে সমর্থন দিতে গিয়ে অগোচরে নটবরের দাবিকেই সমর্থন দিয়ে ফেলেছেন! প্রধানমন্ত্রী পদে রাহুলের আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এভাবে গোপন রাজনৈতিক বৈঠকের বক্তব্য সর্বসমক্ষে আনা নটবরের উচিত হয়নি। ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যেই নটবর এই কাজ করেছেন। তবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কোনও ফাইলই সোনিয়ার কাছে পাঠানো হয়নি। প্রথম ইউপিএ সরকার গঠনের সময় ‘অন্তরাত্মার ডাক’ এর কথা বলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন সোনিয়া। তার এই লোভ সম্বরের ক্ষমতা দেখে চারিদিকে ‘ধন্য ধন্য’ রব উঠেছিল। কিন্তু সোনিয়ার সেই ‘অন্তরাত্মার’ দাবিকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন নটবর। পাল্টা জবাব দিতে চেয়েছেন কংগ্রেস সভানেত্রী। কিন্তু তাতেও চটেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি টাইমস অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, সোনিয়ার প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে আমি যা বলেছি সব সত্য। তিনি মুষড়ে পড়েছেন। তাই অমন প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি সোনিয়ার ইতালিয়ান বংশ পরিচয় নিয়েও কটাক্ষ করেন। তিনি রাহুলকেও নিয়েও এদিন কঠোর ভাষায় কথা বলেন। তার দাবি রাহুল একরোখা ও কারো কথা মান্য করতে চান না। বিশ্লেষকদের মন্তব্য, যুদ্ধে নামার আগেই নটবর কিছুটা হলেও ঘায়েল করতে পেরেছেন সোনিয়াকে। সোনিয়া কত শক্তভাবে এর জবাব দিতে পারেন তা দেখার অপেক্ষায় সবাই।