ধেয়ে আসছে এবোলা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৪, ২২:২৫
বোনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে এসে নিজেই চলে গেলেন পরপারে। দুর্ঘটনা হলেও না একটা কথা ছিল। কিন্তু এ যে প্রাণঘাতী এবোলা। যা কাউকে ধরার মানে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে বিভিন্ন দেশ। তবুও ঠেকানো যাচ্ছে না রোগের বিস্তারকে। মার্কিন নাগরিক প্যাট্রিক সয়ার লাইবেরিয়ায় বোনকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে নাইজেরিয়া গিয়ে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। এদিকে নাইজেরিয়ান অভিনেতা জিম লাইক নিজের ইনস্টাগ্রাম পেইজে এবোলা মাস্ক পরিহিত ছবি পোস্ট করে ভীতিকে আরো উস্কে দিয়েছেন। আর এ ছবিটি তোলা হয়েছিল লাইবেরিয়ার মনরোভিয়া এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে। এ ‘নলিউড’ অভিনেতা বাণিজ্যিক সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে ফেরত আসেন। এটিই তো স্বাভাবিক। এবোলায় আক্রান্ত হয়ে সেখানে এরইমধ্যে যে কমপক্ষে ৬০০ জন বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। এবোলা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও। ইউরোপ এবং এশিয়াতেও এলার্ট জারি করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে এবোলা ভাইরাস আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় এ রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত; কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার এখনকার পরিস্থিতিতে বলতে হয়, ভয়াবহ মহামারী। লাইবেরিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওন ও নাইজেরিয়াতে এখন পর্যন্ত এবোলা কেড়ে নিয়েছে ৬৭২টি প্রাণ; সংক্রামিত হয়েছে কমপক্ষে ১২০০ জন। এ বছর রোগটি প্রথম নির্নিত হয় ফেব্রুয়ারিতে। প্যাট্রিক সয়ার লাগোসে মারা যাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে নাইজেরিয়ার সরকার। ভাবছে সরাসরি তার সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের নিয়ে। আবার তাদের সংস্পর্শেও তো ইতিমধ্যে অনেকেই এসেছে। সে হিসেবে সয়ার সংশ্লিষ্টই অন্তত ৩ হাজার লোক এবোলার ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভাবছে, প্যাট্রিক সয়ার নিজ দেশে ফেরত গেলে কী হত, তা নিয়ে। তিনি লাইবেরিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক ছিলেন। হংকংয়ের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে এক বৃটিশ নাগরিক এবোলার মতো লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হলেও পরীক্ষায় নেগেটিভ প্রমাণিত হন। তিনি এসেছিলেন কেনিয়া থেকে। প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে লন্ডনেও। আসলে অনেক দেশেই এবোলা আতংক কাজ করছে। আর এ আতংক মোটেই অহেতুক নয়। বিশেষ করে প্যাট্রিক সয়ারের মৃত্যু উন্নত বিশ্বের বহু দেশকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ল্যাংকাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর ড্যারেক গ্যাদারার জানিয়েছেন, এবোলা জ্বরের মতোই সংক্রমণযোগ্য। সংক্রামিত লোক আরো অন্তত দু’জন লোকের শরীরে এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। রোগটি ছড়ায় বমি. ডায়রিয়া, লালা, থথু অধিকন্তু যৌন সংসর্গের মাধ্যমে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) পশ্চিম আফ্রিকার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ অ্যাখ্যা দিয়েছে। এর পরিচালক বার্ট ইয়ানসেন একটি ফরাসী দৈনিককে দেয়া সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবোলা প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে যা করছে, তা এক কথায় নগণ্য। এভাবে মহামারি ঠেকানো যায় না। খু্ব শীঘ্রই এটি আশপাশের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়বে এবং একটা সময়ে হয়তো এসে যাবে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকাতেও। সেটি ঘটবে আকাশপথের যাত্রীদের মাধ্যমে। এবোলায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। এবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জ্বরের পাশাপাশি মাথা, পেশি ও গলায় ব্যথা এবং শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ হয়। বমি ও ডায়রিয়াও হতে পারে। কিডনি ও লিভার ধীরে ধীরে অকেজো হতে শুরু করে। এবোলার ঔষধ বলতে গেলে কিছুই নেই। টেকমিরা ফার্মাসিউটিক্যালস টিকেএম-এবোলা নামক ঔষধ আবিষ্কার করলেও তা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন্স (এফডিএ)-এর অনুমোদন পায়নি। হেলথ কেমপেইনাররা দ্রুত অনুমতি দেয়ার দাবি জানাচ্ছেন। কারণ যত দ্রুত অনুমতি দেয়া হবে, তত বেশি প্রাণ বাঁচবে। এ পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে যাদের উপর এ ঔষধ প্রয়োগ করা হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এবোলা ধরা পড়ার পর প্যাট্রিক সয়ারকে ২১ মিলিয়ন লোকের শহর লাগোসের সবচে’ জনবহুল এলাকা ওবালেন্দের একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছিল বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। কিন্তু তার আগেই ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। বিমানের যাত্রী অবস্থা থেকে শুরু করে রোগ ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত তার সংস্পর্শে আসে ৫৯ জন লোক। এদের বেশিরভাগই ওই বিমানের যাত্রী। নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এদের সবার উপরই বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে বাকি ২৯,৯৪১ জন সম্পর্কেও। লাগোস বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হাসপাতালের অধ্যাপক সানডে অমিলাভুর অভিমত, এরা সবাই এবোলা ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের আক্রান্ত হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবোলার বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাহায্য করার জন্য আরো দুই মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ দিয়েছে। এখন মোট তহবিল দাঁড়িয়েছে ৩.৯ মিলিয়ন ইউরো। এর উদ্দেশ্য শুধু অন্যদের সাহায্যই নয়, নিজেরাও বিপদমুক্ত থাকার চেষ্টা করা। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এরইমধ্যে এবোলার ব্যাপারের সতর্কতা জারি করেছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংগঠন (আইসিএও) বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এ রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে। আর প্যান-আফ্রিকান এএসকেওয়াই এয়ারলাইনস লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিয়নের রাজধানীর সকল ফ্লাইট বাতিল করেছে। এবোলা ছড়ানোর সম্ভাবনা দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে সবচে’ কম। তবে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। আফ্রিকা থেকে আসা বিমানযাত্রীদের মাধ্যমে চলে আসতে পারে এ রোগ। আর একবার আসলে সংক্রামিত লোকের সংখ্যা বাড়বে জ্যামিতিক গতির চেয়েও বেশি গতিতে। এবোলায় আক্রান্ত হয়ে এক বছরে সর্বোচ্চ ২৪০ জন মারা গিয়েছিল। আর চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসেই এ সংখ্যাটা ৬৭২। শেষ পর্যন্ত এ ঘাতক ব্যাধি কত প্রাণ কেড়ে নেবে তা আন্দাজ করা মুশকিল। তবে বর্তমান গতি বহাল থাকলে নিঃসন্দেহে তা হাজার পেরোবে। এমনকি আরো অনেক বেশিও হতে পারে।