দেড় হাজার বছর আগে ছিল এক প্রহরা চৌকি। স্থানীয়রা তাকে বলত ঢক্কা। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল ‘বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি’র এক শহর। মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬১২ সালে সেই শহরকেই করলেন তাঁর রাজধানী।
সেই থেকে যাত্রা হল নগরী ঢাকার। এর পর কত
ভাঙ্গা গড়া, কত হাসি-কান্নার
ইতিহাস এই ঢাকা ঘিরে ......
তখনো মানুষ আকাশে উড়তে শেখেনি। রাইট ভাইয়েরা বিমান নিয়ে প্রথম আকাশে ওড়েন ১৯০৩ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। এর আগে মানুষ হট এয়ার বেলুন-টেলুন নিয়ে বাতাসে কিছুক্ষণ ভেসে থাকার চেষ্টা করত মাত্র। ঢাকাবাসীরও কানে পৌঁছেছিল সেই আশ্চার্য বেলুনের কথা, যা দিয়ে আকাশে ভেসে বেড়ানো যায়। কিন্তু সে বস্তু চোখে দেখার সৌভাগ্য তেমন কারো হয়নি। সেই অভাবনীয় সুযোগটা করে দিলেন ঢাকার জন দরদি নবাব আহসানউল্লাহ। সেটা ১৮৯২ সালের কথা। তিনি আমেরিকা থেকে জেনেট ভ্যান টাসেল নামে এক ‘বেলুনওয়ালিকে’ ভাড়া করে নিয়ে এলেন ঢাকাবাসীকে আনন্দ দেয়ার জন্য। দুই তিন দিন ধরে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সে কথা প্রচার করা হল সারা শহরে। জেনেটের পবিরারের প্রায় সবাই বেলুনিস্ট। তিনি ঢাকায় এলেন তার মা জেনি রুমেরি ভ্যান টাসেলের সঙ্গে। জেনেট একে সুন্দরি, বিদেশিনী তার ওপর বেলুনিস্ট। তামাসা দেখতে দলেদলে লোক ছুটল আহসান মঞ্জিলের দিকে। এ ঘটনার একটা চমত্কার বর্ণনা পাওয়া যায় সিলেটের জমিদার ও মরমী কবি হাছন রাজার পুত্র দেওয়ান গনিউর রাজার লেখায়। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, গনিউর রাজা মন খারাপ হলে ঢাকায় আসতেন একটু আধটু ফুর্তি টুর্তি করতে। সেবার তিনি ঢাকায় এসে দেখেন হৈহৈ কাণ্ড। কি ব্যাপার! না, নবাব আহসানউল্লাহ ইংল্যান্ড থেকে এক ‘ইউরোপিয়ান লেডি’ এনেছেন দশ হাজার টাকা খরচ করে। তিনি বেলুনে চড়ে ঢাকার বাসিন্দাদের তামাসা দেখাবেন। তারিখটা ছিল ১৮৯২ সালের ১৬ই মার্চ। বুড়িগঙ্গার ধার লোকে লোকারণ্য। জিঞ্জিরার দিক থেকে জেনেট বেলুনে চড়ে বুড়িগঙ্গা পার হবেন, এমনই কথা। কিন্তু তাতে নবাব পরিবারের পর্দানসিন মহিলাদের সে তামাসা দেখবার বিশেষ সুবিধা হয় না। আহসানউল্লাহ চাইলেন, জেনেট বেলুনে চড়ে একেবারে আহসানমঞ্জিলে এসে নামুন। তাতে নবাব বাড়ির সবাই তা ভালোভাবে দেখতে পারবে। কিন্তু এতে বেঁকে বসলেন জেনেটের মা জেনি রুমেরি। কারণ, সেদিন দক্ষিণের বাতাস বেশ বেগেই বইছিল। ঠিকমত ছাদে নামা কঠিন এবং তাতে তার কন্যার বিপদেরও আশঙ্কা আছে। শেষে চুক্তির চেয়ে আরো পাঁচ হাজার টাকা বেশি দিয়ে রাজি করানো হল তাকে। ঘড়ির কাঁটায় ৬টা ২০ মিনিটে জেনেট বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীর থেকে বেলুনে চড়ে বসলেন। কিন্তু নবাবের ইচ্ছাটা পূরণ হল না। প্রবল বাতাস বেলুনটাকে ঠেলে নিয়ে গেল অন্যদিকে। শেষে আহসান মঞ্জিল থেকে আড়াই-তিন মাইলদূরে ‘রমনা বাগিচার’ এক উঁচু ঝাউগাছে গিয়ে আটকে গেল সেটা। সে ঘটনার বিবরণ গনিউর রাজা দিয়েছেন এভাবে—“তখন রাত্রি হইয়াছে। আকাশে মেঘ থাকায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়াছিল। তখন অনুমান ৭টা বাজিয়াছিল। পুলিশের সাহেব তাহার সহচর কনস্টেবল ইত্যাদিকে বলিল, ‘জলদি বাম্বু লাও।’ তখন তাহারা বাঁশ আনিয়া ঐ গাছে লাগাইয়া দিল এবং সাহেব ঐ উড়নেওয়ালী মিসকে বলিতে লাগিল, ‘মেম সাহেব, ঐ বাম্বু অবলম্বন করিয়া গাছ হইতে নামিয়া পড়।’ কিন্তু মিস বলিল, ‘আমার মাকে আনাও, রশি লেন্টন আনাও, নতুবা আমি নামিতে পারিব না।’ কিন্তু পলিম সাহেব তাহাকে ধমকাইয়া জোর গলায় বলিতে লাগিল, ‘বাম্বু মজবুত হ্যায়। কুচ পরওয়া নেই, উতার যাও, হাম লোক নিচে হ্যায়।’ তখন এই উড়নেওয়ালী মিস বাঁশ অবলম্বন করিয়া নামিতে আরম্ভ করিল। অর্ধেক বাম্বু নামিলে পর বাম্বু ভাঙ্গিয়া গেলও মিস পাক্কা ভূমিতে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিল।”
এঘটনার পর নবাব আহসানুল্লাহ আরো কিছু টাকা কড়ি খরচ করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। গনিউর রাজা ‘উড়নেওয়ালী মিসকে’ ইউরোপিয়ান লেডি বলে উল্লেখ করলেও মেয়েটি ইউরোপিয়ান ছিলেন না। তিনি আমেরিকার এবং তার নাম জেনেট ভ্যান টাসেল। তিনি এভাবে মারা যাওয়ার পর নারিন্দায় খ্রিস্টান কবরস্থানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
নবাব আহসানউল্লাহ জনহিতৈষী তো ছিলেনই ঢাকাবাসীর মনোরঞ্জনের দিকেও তার যথেষ্ট নজর ছিল। নিজে সেতার বাজাতেন, বেহালা বাজাতেন। শাহবাগে ছিল তাঁর শখের চিড়িয়াখানা। ষাড়ের লড়াই, মোষের লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো—এসবের আয়োজন করতেন তিনি ঢাকাবাসীর নির্মল বিনোদনের জন্য। একবার মোষের লড়াই নিয়ে বেশ একটা ঝামেলা হয়েছিল। কলকাতার পশু অধিকার রক্ষা সংগঠনের সদস্যরা ঢাকায় মোষের লড়াইয়ের খবর পেয়ে এক একজন ইউরোপীয় এজেন্টকে পাঠিয়ে ছিল যাতে পশুর ওপর নির্যাতন না হয়, তা দেখার জন্য। এরপর থেকে আহসানউল্লাহ সব ধরনের পশুর লড়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
