অস্তিত্ব সংকটে বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশে সুন্দরবনই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এই প্রাণী খুব সুন্দর এবং এর চামড়া খুব মূল্যবান। তাই চোরা শিকারিদের কারণে এই প্রাণী প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়া, খাবারের অভাব এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এই প্রাণী প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অতএব, প্রয়োজন অবৈধ শিকার বন্ধ করা ও প্রাণীদের সুরক্ষা ও সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা।
গত ২৯ জুলাই ছিল বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বাঘের বংশ বিস্তার ও সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী নানামুখী কর্মসূচি পালিত হয়ে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চোরা শিকারিরা বাঘের বাচ্চা ও বাঘ শিকার করে চামড়া পাচার করছে। বনদস্যুরাও এখন বাঘ ও হরিণের চামড়া, মাংস ও হাড় পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মৃত্যু হচ্ছে বাঘের। মাঝে মধ্যে খাদ্য সংকটে বিপাকে পড়ছে বাঘ। খাদ্যের অভাবে লোকালয়ে চলে আসা বাঘ গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করছে। এ ছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে ও লবণাক্ত পানি পান করে নানা রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে আমাদের জাতীয় সম্পদ রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনের জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করে বাঘ। যে বনে জীববৈচিত্র্য বেশি সেখানে বাঘের সংখ্যাও বেশি থাকে। সে কারণেই সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাদের আবাসভূমি রক্ষা ও উন্নয়ন, বনের জনবল বৃদ্ধি, অবৈধ শিকার বন্ধ করা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য আরো কঠোর আইন প্রণয়ন এবং বিলুপ্ত বন্যপ্রাণি সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন যেসব বসতি স্থাপিত হয়েছে তা উচ্ছেদ করা জরুরি।
সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্তির প্রধান কারণ হিসাবে ধরা হয় সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিদের তত্পরতা। দেশের প্রভাবশালী চক্র এবং আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের যোগাযোগ। কেননা বাঘের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত চড়া। সুতরাং চোরাকারবারিদের জন্য এ ব্যবসা অত্যন্ত লোভনীয়।
বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত ৮টি কারণে সুন্দরবনের বাঘের মৃত্যু হতে পারে। ১. বয়স্ক বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু, ২. পুরুষ বাঘ কর্তৃক বাচ্চা খেয়ে ফেলা, ৩. খাদ্যাভাব, ৪. লোনা পানি গ্রহণে লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে, ৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ৬. ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যা, ৭. লোকালয়ে প্রবেশ করার কারণে জনতার হাতে মৃত্যু এবং ৮. চোরাগোপ্তা শিকার।
সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার
সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার যেন এক অশরীরী। ভয়াল সুন্দর বলতে যা বোঝায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার যেন ঠিক তাই। তার ভয়ঙ্কর হিংস তার সামনে কেউ যেতে চায় না, কিন্তু তার ডোরাকাটা হলুদের সৌন্দর্যকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। সম্মোহনের মত টানে এই বাঘ।
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষ ও যারা জীবিকার প্রয়োজনে বনে প্রবেশ করে তারা কেউই বাঘের নাম উচ্চারণ করে না। কেউ কেউ বড় মামা, কেউ বড়মিয়া, গাজী, ঠাকুর প্রভৃতি নামে ডাকে।
সৌন্দর্য, মর্যাদা আর শক্তিমত্তায় অতুলনীয় এ বাঘের অন্যতম আদিনিবাস বাংলাদেশের সুন্দরবন। এছাড়া ভারত, মিয়ানমার, সাইবেরিয়া অঞ্চল, সুমাত্রা এবং জাভা, ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার। হিমালয়ের মতো সুউচ্চ ও হিমশীতল বৈরী পরিবেশেও এরা চমত্কারভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। বর্তমানে সারাবিশ্বে এই বাঘের সংখ্যা কমে ৩ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। শুধু এই বাঘই নয়, পৃথিবীর সব প্রজাতির বাঘই এখন আশংকাজনকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় পশু, বীরত্বের প্রতীক। সুন্দরবনেও ভয়ংকর সুন্দর এ প্রাণীটির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে পড়েছে নানা কারণে।
একটি পুরুষ বাঘের দৈর্ঘ্য মাথা থেকে লেজসহ সাড়ে ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর মধ্যে লেজের দৈর্ঘ্য ৮৫ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। গড় ওজন ২০০ থেকে ২৩৬ কেজি। তবে এ যাবত্ সবচেয়ে বড় বাঘের ওজন ৩৮৮ দশমিক ৭ কেজি পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। স্ত্রী বাঘ আকারে ছোট হয়। দৈর্ঘ্য ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। বাঘের পায়ের ছাপ গোলাকৃতির আর বাঘিনীর ছাপ লম্বাটে হয়। বাঘের সারা শরীর হলুদ-কমলা-বাদামি এবং সাদা-কালো লম্বাটে ডোরাকাটা ঢেউ খেলানো দাগ থাকে। প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং ভয়ংকর হিংস্র এই প্রাণীটি গভীর অরণ্যে নির্জনে থাকতে পছন্দ করে। এরা এক লাফে ৭ থেকে ৮ মিটার অতিক্রম করতে পারে এবং সাড়ে ৩ মিটার উঁচুতে উঠতে পারে। এরা ভালো সাঁতার কাটতে পারে এবং গাছে চড়ায়ও বেশ পারদর্শী। মাংসাশী এ প্রাণীটির খাদ্য তালিকায় রয়েছে হরিণ, শূকর, বনগরু, গয়াল, নীলগাই, হাতি বা গণ্ডারের বাচ্চা, মহিষ, কুমির, অজগর। এমনকি বাঘরা মাছও খায়। বাঘ প্রতি সপ্তাহে একবার শিকার করে। তবে শিকারের ওজন ৩০-৪০ কেজির কম হলে আবার শিকারের জন্য বের হতে হয়। প্রতিদিন এদের গড়ে ৭ কেজি খাদ্যের প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে এর খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে দরকার প্রতি বছর গড়ে ৩ হাজার ৬৫০ কেজি মাংস। যার ওজন ৭৩টি চিত্রা হরিণের সমপরিমাণ। বাঘের জীবনকাল ১৪ থেকে ২০ বছর হয়ে থাকে।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সুন্দরবন বন বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৭৫ সালে একজন ইউরোপীয় বাঘ বিশেষজ্ঞ মিস্টার হেন্ডরিস সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শুমারি করেন। ওই শুমারিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তখন সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যে জানা যায়, ১৯৯১ সালে একটি বিদেশি সংস্থা সুন্দরবনে জরিপ চালিয়ে বাঘের সংখ্যা ৪৫৯টি পায়। এরপর ১৯৯৩ সালে নেপালের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. কেএম তামাং সুন্দরবনে শুমারি পরিচালনা করেন। ওই শুমারিতে পাওয়া হিসাবে তখন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৬২টি। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ টিসা ম্যাকগ্রেগর জানান, বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে ২০০টির বেশি বাঘ নেই। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে বাঘশুমারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাগ মার্ক (পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতিতে) এর শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে সুন্দরবন অংশে ৪১৯টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ১২১টি এবং স্ত্রী ২৯৮টি। আর বাচ্চার সংখ্যা ২১টি। ভারত অংশে রয়েছে ২৭৪টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ। এর মধ্যে পুরুষ ২৪৯টি ও স্ত্রী ২৫টি। তবে বিশিষ্ট প্রাণীবিদ মনিরুল এইচ খানের মতে, ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিতে নতুন বাঘশুমারিতে বাংলাদেশে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা পাওয়া গেছে ২০০টি এবং ভারতীয় অংশে ১০০ থেকে ১৫০টি। পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে যে শুমারি করা হয় তাতে একই বাঘের একাধিক পায়ের ছাপ গণনায় চলে আসার আশংকা থাকে। তবে এ যাবত্ সুন্দরবনে কতগুলি বাঘের স্ব্বাভাবিক ও অস্ব্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এর কোন পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি।
চোরা শিকারিদের কবলে বাঘ
২০১২ সালে র্যাব সদস্যরা ঢাকার শ্যামলী এলাকার একটি বাড়ি থেকে তিনটি বাঘশাবক উদ্ধার করেন। বাঘের এ তিনটি বাচ্চা সুন্দরবনের শ্যামনগর এলাকা থেকে পাচার করা হয়েছিল। এ ছাড়া খুলনা অঞ্চলে গত দুই দশকে অন্তত দুই ডজন বাঘের চামড়া আটক হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে র্যাব সদস্যরা নগরীর ময়লাপোতা মোড় থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট বাঘের চামড়াসহ তিন যুবককে গ্রেফতার করে। ২০০৮ সালের ২১ মার্চ খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বলাবুনিয়া গ্রাম থেকে একটি বাঘের চামড়াসহ দুই পাচারকারী গ্রেফতার হয়।
গ্লোবাল টাইগার ফোরামের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, বিশ্বের ৪০টি দেশের কালোবাজারে বাঘের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবসা চলছে। পূর্ব এশিয়ায় বাঘের চামড়া, হাড়গোড়সহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবসা বেশ জমজমাট। চীনের হারবাল ওষুধশিল্পে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহুল ব্যবহার রয়েছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বড় বাজারেও এসব ওষুধ বিক্রি হয়ে থাকে। সেখানে এসব ওষুধ বেচাকেনা অবৈধ নয়। সুন্দরবনে চোরা শিকারিরা বিভিন্নভাবে বাঘ হত্যা করে চলেছে। গুলি করে, ফাঁদে আটকে বাঘ শিকার করে। গরু, ছাগল, হরিণ মেরে সেগুলির শরীরে বিষ মেখে বাঘের খাবার হিসাবে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়। বাঘ এসব বিষমাখা মৃত প্রাণী খেয়ে বিষক্রিয়ায় মারা যায় কিংবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।
