ছয় বছর আগের কথা। ইউরো ফুটবলের লড়াই। অস্ট্রিয়া সুইজারল্যান্ডে সেবার দাপট দেখায় স্পেন। শৈল্পিক ফুটবলের প্রদর্শনীতে একের পর এক পরাশক্তিকে পরাজিত করে এগিয়ে চলে প্রতিভাবান দলটি। শিরোপাটাও চলে আসে তাদের হাতে।
১৯৬৪ সালের পর প্রথম বড় কোন ট্রফি জিতে স্পেন। দীর্ঘ সময়ের খরা ভূমিকা কাটাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন একজন। শুধু স্পেনই নয়, গোটা দুনিয়ার সামনেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন আইকন, একজন শিল্পী। তিনি হলেন—জাভি হার্নান্দেজ।
২০০০ সালে অভিষেকের পর থেকেই নিজেকে একটু একটু করে চেনাতে শুরু করেন কাতালান ক্লাব বার্সেলোনার ঘরের ছেলে জাভি। প্রথমবারের বাজিমাত করেছিলেন। অলিম্পিক খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। রূপা নিয়ে ফিরেছিলেন দেশে। ক্লাব ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবল—যাই হোক না কেন হয়ে উঠেছিলেন দলের মূল ভরসা।
সাফল্যও আসতে শুরু করে একটা সময়। ২০০৮ সালে ইউরো, ২০১০ সালের বিশ্বকাপ, ২০১২ সালে টানা দ্বিতীয় ইউরো, এর সাথে যুক্ত হয় বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক ট্রফি। সব মিলিয়ে বিশ্বসেরাদের কাতারে চলে গিয়েছিলেন জাভি। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কার্লোস পুয়োল, ডেভিড ভিয়াদের সাথে নিয়ে টিকিটাকাকে নিয়ে গিয়েছিলেন অমরত্বের পর্যায়ে।
কিন্তু, এলোমেলো করে দিয়ে গেল একটা বিশ্বকাপ। গত মাসে শেষ হওয়া বিশ্বকাপ থেকে প্রথম পর্বে বিদায়, বার্সেলোনায় জায়গা হারানোর শঙ্কা—এতোকিছুর ভিড়েই কিনা আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেয়ার ঘোষণা দিয়ে দিলেন এই তারকা।
গতকাল মঙ্গলবার স্পেনের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়ে দেন ৩৪ বছর বয়সী এই প্লে-মেকার। সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি বলেন, ‘আমি জাতীয় দল ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আজকের দিন থেকে আমি স্পেন ফুটবলের স্রেফ একজন সমর্থক। আমি এই দিনগুলোর জন্য সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। সময়টা আমার জন্য সত্যি অসাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। অনেকগুলো বছর, অনেক সাফল্য— মনে রাখার মত অনেক স্মৃতি নিয়ে আমি বাড়ি ফিরছি। যাওয়ার বেলায় সত্যি আমার অনেক গর্ব হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের মুহূর্তটা অবশ্য খুব সুখকর হয়নি জাভির। তিনটি ম্যাচের দুটিতে বাজে পরাজয়—স্পেনের মত জাভির জন্যও বিশ্বকাপটা ছিল হতাশার এক স্মৃতি।
ব্রাজিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের গ্লানি জাভির শেষ অধ্যায়টাকে ম্লানই করে দিয়েছে। হতাশাটা গোপনও করেননি তিনি। সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ঘোষণাটি দিয়ে তার কণ্ঠেও একই প্রসঙ্গ, ‘গত মৌসুমটা খুবই হতাশা নিয়ে কেটেছে। বার্সেলোনার জন্য বা জাতীয় দলের জন্য নিজেকে আর প্রয়োজনীয় বলে মনে করতে পারছি না। গত মৌসুমটি হয়ে থাকবে আমার জীবনের সবচেয়ে হতাশাগ্রস্ত সময়।’
গত মৌসুমের ব্যর্থতা জাভিকে কীভাবে কুঁড়ে খাচ্ছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে তার বার্সেলোনাকেও বিদায় বলা। মাঝখানে ন্যু ক্যাম্প ছাড়ার সব বন্দোবস্ত প্রায় পাকাই করে ফেলেছিলেন। নতুন গন্তব্যও ঠিক করেছিলেন মেজর লিগ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের লিগ শুরু হতে ঢের বাকি থাকায় আপাতত বার্সেলোনার জার্সি গায়ে জানুয়ারি পর্যন্ত থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। জানুয়ারিতে মধ্য মৌসুম দলবদলের সময় মেজর লিগের ব্যাপারটা নতুন করে ভাববেন তিনি।
বার্সেলোনার হয়েও ইউরোপিয়ান ফুটবলের গত মৌসুমে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি জাভি। এই হতাশা থেকেই হয়তো বিদায় বলেছিলেন বার্সেলোনাকেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোচ লুইস এনরিকের অনুরোধে আর একটি মৌসুম খেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও বার্সেলোনায় তার ভাগ্যে কি হতে যাচ্ছে সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে আগামী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত।
সে যাই হোক, ১৪ বছর বয়সের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। স্পেনের হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড। চারটি বিশ্বকাপ, তিনটি বড় শিরোপা জয়—বিশ্ব এতোকিছু অর্জনের জন্যই মনে রাখবে জাভিকে!
এক নজরে জাভি
জন্ম ২৫ জানুয়ারি, ১৯৮০
আন্তর্জাতিক অভিষেক ২০০০
মোট ম্যাচ ১৩৩
গোল ১৩
অর্জন বিশ্বকাপ (২০১০), ইউরো (২০০৮, ২০১২)
