‘বায়ান্ন বছরের মধ্যে এবার আমার পরিবারে ঈদ হবে না। গত বছর মাছের মৌসুমের এ সময়ে সাগর থেকে দুবার মাছ ধরতে পেরেছি। তাতে হাতে বেশ টাকা-পয়সা ছিলো। এবার সাগরে মাছ ধরতে পারিনি! হাতে কোন টাকা পয়সা নেই। ধার-দেনা করে কোনরকমে চলতে হচ্ছে।’ বৃহস্পতিবার সকালে নিজের করুন দশা তুলে ধরে এ কথাগুলো বলছিলেন শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামের জেলে সাহেব আলী।
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় শরণখোলার আড়াই হাজার জেলে বেকার সময় পার করছে। সামনে ঈদ। কিন্তু তাদের হাতে টাকা নেই। তাদের পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই! জেলে সাহেব আলী এ সময় আরও বলেন, ‘৫২ বছর ধরে মহাজনের ফিসিংবোট নিয়ে সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি।’ তার ২ ছেলে, ৩ মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে ৭ জনের তার পরিবার। তিনি কি দিয়ে ঈদ করবেন সে চিন্তায় দিশেহারা।
একই ধরনের কথা বলছিলেন, এফবি মাছরাঙ্গা বোটের জেলে শহীদ মিস্ত্রী, মোঃ সবুজ ও আবু হানিফ। গত বছর এ সময় শরণখোলা মৎস্যঘাট মাছ কেনাবেচায় সরগরম ছিলো। এখন সুনসান নীরবতা। ঘাটে সারি সারি ফিসিংবোট নোঙর করে বাধা। কয়েক হাজার জেলে বেকার।
২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় ৬৫ দিনের নিয়েধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। মৌসুমের শুরুতে ঈদকে সামনে রেখে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় জেলে মহাজনদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আলহাজ এম সাইফুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘সরকারের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞায় শরণখোলা অঞ্চলের প্রায় আড়াই হাজার জেলে বেকার হয়ে দারুন আর্থিক কষ্টে পড়েছেন। জেলেদের পরিবারে এবার ঈদ হবে না। এ ছাড়া ঋণের বোঝায় দেড় শতাধিক ফিসিংবোট মালিক দেউলিয়া হয়ে যাবে।’
শরণখোলা উপজেলা মৎসজীবী সমিতির সভাপতি মোঃ আবুল হোসেন বলেন, ‘একটি ট্রলার সাগরে মাছ ধরার উপযোগী করে পাঠানোর জন্য প্রত্যেক মহাজন ইতোমধ্যে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। সরকারের নিষেধাজ্ঞায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ট্রলার মালিক ও মহাজনরা। ইলিশ আহরণের মৌসুম হিসেবে ১৫ বৈশাখ থেকেই জেলেদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় বঙ্গোপসাগরে। কিন্তু এ বছর তাদের সেই আশা শঙ্কায় পরিণত হয়েছে। বুক ভরা হতাশা নিয়ে ফিসিংবোট ঘাটে অপেক্ষা করছেন হাজারো জেলে।’
বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আঃ মান্নান ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল মাস্টার জানান, ৬৫ দিন মাছধরা বন্ধ! এটি সরকারের একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। হঠাৎ এরকম সিদ্ধান্তে উপকূলের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।’
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা দিলেও পাশের দেশ ভারতের জেলেদের কিন্তু সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে না।’
আরও পড়ুন: সর্বাধুনিক প্রোটন থেরাপির ক্যান্সার হাসপাতাল হবে ঢাকায়
এ ব্যপারে শরণখোলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায় বলেন, ‘মৎস্য প্রজনন বৃদ্ধির জন্য সাগরে সরকার মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও জেলেদের খাদ্য সহায়তার চাল বিতরণ শুরু করা হয়েছে।'
ইত্তেফাক/নূহু
