ব্রায়ান লারা, শিবনারায়ণ চন্দরপল, ক্রিস গেইল, রামনরেশ সারওয়ানদের ভয়ানক ব্যাটিং লাইনআপ। টিনো বেস্ট, পেড্রো কলিন্স, জার্মেইন লসন, ফিদেল এডওয়ার্ডস; চার পেসারের ত্রাস বোলিং। এটুকু শুনলেই তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের ‘খায়েশ’ মিলিয়ে যাওয়ার কথা। তাও আবার আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে!
বাংলাদেশ দল তখন হস্তিতুল্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পিপীলিকার চেয়েও ক্ষুদ্র বুঝি। কিন্তু সেই বাংলাদেশই রুখে দাঁড়ালো। সেই বাংলাদেশই ক্যারিবীয় হাতিকে পাগল বানিয়ে ফেললো সেন্ট লুসিয়া টেস্টে। মোহাম্মদ রফিক ও খালেদ মাসুদের অবিশ্বাস্য দুই সেঞ্চুরি, আশরাফুল-রাজিনদের বুক চেতানো ব্যাটিংয়ে প্রবল প্রতাপশালী সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দেশের বাইরে প্রথম, কার্যত নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ড্র করে ফেললো বাংলাদেশ!
আপনি হয়তো খেয়াল করেননি, সেন্ট লুসিয়ার সেই ঐতিহাসিক ড্র টেস্টের আসল নায়কের নাম ওপরে বলা হয়নি। হ্যাঁ, তখনকার ‘ফিফটি ম্যান অব বাংলাদেশ’, নতুন বাংলাদেশের নেতা হাবিবুল বাশার।
সেই টেস্ট ইতিহাসের দশ বছর পর আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে বাংলাদেশ দল নিয়ে যাচ্ছেন সেই হাবিবুল বাশার। বলাই বাহুল্য যে, দুনিয়ার চিত্রটা এতোদিনে আমূল বদলে গেছে। সেই লারাও নেই, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজও নেই। বদলে গেছেন হাবিবুলও। এর মধ্যে জীবনের অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন, দেশের সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা অধিনায়ক হয়েছেন, অনেকটা অকালেই অবসরে গেছেন। তারপর নির্বাচক হয়েছেন হাবিবুল বাশার। তবে এবার অধিনায়ক নয়, নির্বাচক নয়; আরেকটি ক্যারিবীয় অভিযানে যাচ্ছেন হাবিবুল জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে। হাবিবুল বাশার ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ; এই দুই নিয়ে কাব্য করতে গেলে অবশ্য ২০০৪, নাকি ২০০৭; কোনটা আগে আসবে তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। ২০০৪ সালে যেমন বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো একটা সম্মানীয় দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন টেস্টে। তেমনই ২০০৭ সালে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই হাবিবুল।
গতকাল আরও একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠতে অকৃত্রিমভাবেই স্মৃতিকাতর হয়ে গেলেন হাবিবুল, ‘আহ! ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেই ২০০৭ সালের পর এই প্রথম যাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই পুরোনো কথা মনে পড়ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে আমার সুখস্মৃতিই বেশি। যখনই শুনেছি, ওখানে যেতে হবে ২০০৭ ও ২০০৪ সালের কথা মনে পড়ছে।’
হাবিবুল অবশ্য এই দুটোর মধ্যে তুলনায় ২০০৪ সালকেই এগিয়ে রাখলেন। ‘আউটসাইডার’ বাংলাদেশের ওই পারফরম্যান্সকে এগিয়ে রাখারও কথা। তবে ২০০৭ সালকেই বা ফেলে দেন কী করে, ‘সেন্ট লুসিয়া টেস্টের জন্য আমি একটু এগিয়ে রাখবো ২০০৪ সালকে। আমি নিজেও তখন ভালো পারফরম করেছিলাম। কিন্তু ২০০৭ও তো আমাদের ইতিহাসের অংশ। সম্ভবত এখনও পর্যন্ত আমাদের সেরা বিশ্বকাপ।’
‘সম্ভবত’ নয়, হাবিবুল। অবশ্যই বাংলাদেশের সেরা বিশ্বকাপ। প্রথম রাউন্ডে ভারতকে বলে কয়ে হারানো, মাশরাফির সেই নাটকীয় পারফরম্যান্স, মুশফিক-তামিম-সাকিবের উত্থান; সব মিলিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রাখা। এরপর আরও মহাকাব্যিক অর্জন—তখনকার এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকা বধ। সবমিলিয়ে এর চেয়ে সুখের সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটে কমই এসেছে। তবে আফসোসও আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অল্পের জন্য জয়টা মিস ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে অঘটনের শিকার না হলে কে জানে, বাংলাদেশ হয়তো সেরা চারেও পা রেখে ফেলতে পারতো! তবে হাবিবুলের জন্য আফসোসটা অন্যরকম। তার নেতৃত্বে, ডেভ হোয়াটমোরের সঙ্গে তার জুটিতে বাংলাদেশ তখন ওয়ানডেতে শক্তিশালী দল হয়ে উঠছে। কিন্তু এই বিশ্বকাপেই ফর্মটা হারিয়ে ফেললেন হাবিবুল। এই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দেখেই তার ক্যারিয়ারটা সংক্ষিপ্ত করে ফেলা হল।
সে আফসোস একটু হলেও টিকে আছে হাবিবুলের, ‘হ্যাঁ, ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য ব্যাপারটা হতাশার ছিল। দল এতো ভালো করছিল। কিন্তু আমি রান পাচ্ছিলাম না। সেজন্য ক্যারিয়ারটাও হঠাত্ শেষ হয়ে গেল। যাই হোক, সে তো অনেক পুরোনো কথা।’
হ্যাঁ, সেসব পুরোনো কথাকে পেছনে ফেলে এখন সামনে তাকানোর সময় ‘ম্যানেজার’ হাবিবুলের।
যদিও পদে তিনি নির্বাচক। তবুও এই সফরে বাড়তি হিসেবে ম্যানেজারের কাজটাও দেয়া হয়েছে। একটা সময় ক্রিকেটে অধিনায়কের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল ম্যানেজার। এখন কোচরা ফুটবলের মতো ক্ষমতাধর হয়ে উঠতে থাকায় এই পদের তাত্পর্য হারিয়েছে। তবে হাবিবুল ব্যাপারটা অন্যভাবে দেখেন, ‘এটা অনেক সম্মানের একটা ব্যাপার। আর টিমের পার্ট তো। ফলে খেলোয়াড়দের সঙ্গে অন্য কোনো ভূমিকার চেয়ে বেশি মেশার একটা সুযোগ। আমি একটু রোমাঞ্চিত। মনে হচ্ছে, খেলোয়াড় হিসেবেই যাচ্ছি।’ খেলোয়াড় হিসেবে গেলে তো হাবিবুলের সৌভাগ্যটাও বাংলাদেশের সঙ্গী হওয়ার কথা। তাই হোক তাহলে।
